হঠাৎ দেখা
আমেনা বেগম
ট্রেন চলছে সর্পিল গতিতে।চলন্ত ট্রেনের গর্ভে চেনা-অচেনা কত মানুষের আনাগোনা। কেউ হাসির আড্ডায় ব্যস্ত, কেউ বা আবার আনমনে প্রকৃতি উপভোগ করছে কিংবা কেউ একাগ্রচিত্তে বই পড়ছে।কারো হাতে মোবাইল আর কানে হেডফোন। নিশ্চয়ই গান কিংবা মুভি দেখা হচ্ছে। আমিও নিমীলিতলোচনে বইয়ের উপর নিবিষ্ট মনে পৃষ্ঠের পর পৃষ্ঠা উল্টিয়ে যাচ্ছি। বাপরে,উফ! কি বিরক্ত। মনে হচ্ছে ট্রেনটা তার বাপের সম্পত্তি আর যাত্রীরা তার বাবার ভাড়াটে।একবার দেখি তো এমন করে কে কথা বলছে।এই বলে মুখ তুলে পাশ ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখি একটা সুদর্শন পুরুষ একগাল অট্টহাসি দিয়ে তার সঙ্গীটার সাথে খুনসুটিতে মেতে আছে। কী ভাবছেন আপনারা? সঙ্গীটা হয়তো কোন মেয়ে হবে এমনই কিছু? না,আপনাদের ভাবনা ভুল।সঙ্গীটা একটা শান্ত হাবাগোবা স্বভাবের ছেলে। হয়তো চঞ্চল টাইপের ঐ ছেলেটির বন্ধু হবে নির্ঘাত। আমি রাগতমুখে তাকিয়ে আছি অট্টহাসি করা ছেলেটির দিকে। হয়তো ভাবছেন কিংবা ব্যঙ্গ করছেন রাগের মধ্যে আপনার চোখ পড়ল কীভাবে যে মানুষটি সুদর্শন? আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। এত ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই।ছেলেটির চোখ দুইটি প্রথম অবলোকন করছি, ভারী সুন্দর। তার উপর চশমা পড়ছে।গায়ের বর্ণ গৌর কিছুটা। তাছাড়া যে অট্টহাসি দিয়েছে তার অল্পখানিক পরে তার মুখে মৃদু হাসি খেলে গেল।দেখতে অনেকটা মার্জিত লাগছে।দেখে মনে হচ্ছে সোনালি চিক চিক রোদের মিষ্টি আভাতে রাঙিয়ে দিয়েছে মুখটি।আমি কিছুটা অবাক চিত্তে সেই মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আপনারা কেন সুদর্শন বলেছি। তার পাশের মানুষটিকে ও দেখলাম এবার অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। ভাবছি শান্ত স্বভাবের। এখন দেখছি পুরো উল্টো। হঠাৎ করে ঘড়ির দিকে তাকালাম কয়টা বাজল দেখার জন্য। দেখলাম চারটা ত্রিশ মিনিট।ওহ! আপনাদের তো বলা হয়নি আমি কে?
আমি রাত্রি।এবার অনার্স চতুর্থ বর্ষে পড়ছি।আমার বাড়ি দিনাজপুর। যাচ্ছি চট্টগ্রাম। এখন তো গ্রীষ্মকাল। কয়েকদিনের জন্য গরমের ছুটি পড়ে গেছিল।ফলে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকার কারণে দীর্ঘদিন বাড়িতে সময় কাটিয়ে আবার পাহাড়ি ঘেরা সবুজ প্রকৃতির স্নিগ্ধ মায়াময় স্বপ্নপুরির উদেশ্যে পাড়ি জমালাম।খুব তড়িঘড়ি করে বাসা থেকে বের হয়েছি।মা অনেক ব্যস্ততার মধ্যে ও আমাকে বারবার বলেছে যেন কয়েকদিন পর আবার ফিরে আসি।আমি ম্লান হাসি দিয়ে বলেছিলাম, আসবো মা,ফিরে আসবো।এই তো কয়েকটা দিন।তারপর দেখবে তোমার মানিক তোমার কাছে ফিরে আসছে।শুধু আশীর্বাদ করো আমার অভীষ্ট লক্ষ্য যেন পূরণ হয়।
ট্রেনের মধ্যে মা'র কথাগুলো কানে বাজতে ছিলো অনেকক্ষণ। সেজন্য মন দিলাম বইয়ে যাতে মন খারাপের বাতাসটা অন্য দিকে প্রবাহিত হয়।কিন্তু, এই পাশের সিটের মানুষটার অট্টহাসিতে কী আর উপন্যাস পড়বো!ইচ্ছে করছে অন্য কোন সিটে গিয়ে বসি আর না হয় ছেলেটাকে কিছু কটু কথা শুনিয়ে দিই।কিন্তু 'শেষের কবিতা' উপন্যাসের অমিতের মত মানুষটির বৈশিষ্ট্য দেখে আমি কিছুক্ষণ লাবণ্য হয়ে গেলাম। মনমাঝারে বয়ে যাচ্ছে ঠান্ডা হিমেল পরশ। কী এক অজানা অনুভূতিতে হৃদয়ের বরফ গলে পড়ছে। কিন্তু ছেলেটা ভ্রুক্ষেপহীন। অনেকক্ষণ পর ছেলেটি আড়চোখে একবার তাকালো আমার দিকে।আমি ততক্ষণে উপন্যাসের ক্লাইমেক্সে পৌঁছে গেছি।এরপর প্রায় আরো আধা ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পর আমি কিছুটা ক্লান্তি -শ্রান্তি কাটানোর পর জানালার বাহিরে মুখ বাড়ালাম। গ্রীষ্মের প্রচন্ড তাপদাহে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা আসলে প্রকৃতি কিছুটা শান্ত হয়ে যায়। তেমনি শান্ত হয়ে গেছে ঝক ঝক ঝক ট্রেন চলার শব্দ।
মুখ ঘুরিয়ে দেখি আমরা গৌরিপুর জংশনে এসে পৌঁছেছি। পরক্ষণেই দেখলাম ছেলেটা ও তার পাশের বন্ধুটা বাহিরে গেল। আমি ততক্ষণে ব্যাগ থেকে পানি বের করে খেলাম।ব্যাগের ভিতর দেখছি পুলি পিঠা কয়েকটা। আমি ভীষণ পছন্দ করি এই পিঠা। আমি রাতে ও সকালে অনেকগুলো পিঠা খেয়েছি।কিন্তু মা যে আরো কিছু আমার জন্য উপরি রেখে দিবেন ভাবতে পারিনি। আমি পিঠা দেখে খুশি হয়েছি।এমনিতে অনেকক্ষণ ধরে উদরে লেলিহান শিখা জ্বলে ক্ষিধার ছুটে। পিঠাগুলো পেয়ে পেটকে শান্ত করা যাবে। আমি পিঠা খাওয়া শুরু করলাম। এমন সময় তারা দু'জন ট্রেনে এসে প্রবেশ করল। আমার পাশে আরো অনেকে আছে।একটা ছোট বাচ্চাকে পিঠা দিলাম দেখি পিঠা পেয়ে সে আমার কাছে চলে আসল। কয়েক মিনিট পর তার মা তাকে নিয়ে নিল।এতবড় এই পৃথিবী। তার মধ্যে ছোট্ট এই বাংলাদেশে প্রায় ১৮ কোটি লোকের বাস।প্রতিদিন কত প্রয়োজনে মানুষের পদচিহ্ন পড়ে কত জায়গায়। কে তার খবর রাখে। 'শেষের কবিতা' উপন্যাসের এক জায়গায় রবী ঠাকুর বলেছেন-
"ভালোবাসা ভালোবেসে শুধুই তাকে ভালোবেসে ভালোবাসায় বেঁধে যে রাখে।"
এত কঠিন তত্ত্ব কথা বুঝা আমার সাধ্য নয়।তবুও আমি বিষণ্ন মনে বলতে লাগলাম কতজনকে বেঁধে রাখবো আমরা।পৃথিবী, সময় ঘণ্টার কাঁটা কি আমাদের কথা শোনে? শোনে না। সবকিছু নিজের গতিতে চলে। এই জংশন থেকে অন্য জংশনে কত মানুষ আসে যায়।কত মায়া সৃষ্টি করে।কে তার হিসাব রাখে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'পোস্টমাস্টার ' গল্পে বলেছিলেন,
"ফিরিয়া ফল কী!
পৃথিবীতে কে কাহার?"
সত্যি তো কে কার জন্য অপেক্ষা করে।আমার ভাবনার অলিগলিতে কতশত জিনিস উঁকি মারে তার ইয়ত্তা কে রাখে। সবই কি পূরণ হবে।
এই যে শুনন,কিছু না মনে করলে একটা প্রশ্ন করবো? আমি কে বলে পাশ ফিরিয়ে দেখি সেই অট্টহাসি দেওয়া ছেলেটা। আমি কিছুক্ষণ ইতঃস্তত বোধ করে পরক্ষণে উত্তর দিলাম,শিউর।ছেলেটি বলল,আপনি কি আমার জোর শব্দে কিংবা হাসিতে তখন বিরক্তিবোধ করেছেন?
যাক,বাবা! এ আবার বুঝলো কীভাবে আমার মনের কথা।হয়তো আড়চোখে তাকিয়ে ছিলো যে তখন বুঝতে পেরেছে। কিন্তু তখন তো দিব্যি আড্ডায় মেতে ছিল।এছাড়া লাগিয়েছে চার চোখ। এখন তো দেখছি পিছনেও দুটো চোখ আছে মনে হচ্ছে। আমি নিজেকে লুকিয়ে কনফিডেন্স নিয়ে বললাম,কই না তো! বিরক্ত হবো কেন?
না, আসলে আমার বন্ধু আমাকে বললো আপনি আমার জোরে কথা বলার সময় ডিস্টার্ব অনুভব করেছেন। আপনার তাকানো দেখে সে বুঝে ফেলেছে। ওরে শালা! দেখলাম তাকিয়ে এই আর অনুভব করেছে তার সৈন্য। এই দেখছি শান্ত স্বভাবের আড়ালে মিছকা শয়তান একটা।আমি বিড়বিড় করতেছি।
কিছু বলছেন মনে হচ্ছে,সে বলে উঠল। না,না,কি বলবো।আমি হেসে উত্তর দিলাম।আমি তাড়াতাড়ি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ফেলেছি।আচ্ছা শুনন আমি আকাশ।আমি একটু এমনিই। কিছু মনে করবেন না। আমার বাড়ি রাজশাহী। আপনি চায়লে আমরা পরিচিত হতে পারি।
আমি কি বলবো বুঝতে পারছি না।আচ্ছা, ধন্যবাদ আপনাকে। এই বলে আবার অন্য দিকে তাকানো শুরু করলাম। শুধুই ধন্যবাদ? আর কিছু বলেন।আমার মনে হচ্ছে আপনি যেমন ভান করছেন মোটেই সেরকম না আপনি।কোন সংকোচ না করে কথা বলতে পারেন।
কিরে? তুই কি শুরু করলি। আকাশের বন্ধু বলতে লাগল।
আমি চেয়েছিলাম একটু হেসে দিতে ওর বন্ধুর কথা শোনে। কিন্তু গম্ভীর ভাবে উচ্চারণ করলাম,আমি রাত্রি।
ওহ! আচ্ছা, আপনার নাম তাহলে রাত্রি। আমিতো ভাবছি আরো অন্য কিছু।মানে! সাপ যেমন ফোঁস করে ফণা তুলে আমিও তেমনই আচরণ করতে চাইলাম। কিন্তু তিনি বলতে লাগলেন,এত জ্বলে উঠার কিছু নেই।দিবসের জ্বলকানো পরিবেশে পশ্চিমা অস্তগামী সূর্য ডুবে গিয়ে তিমিরে চেয়ে যাচ্ছে এই শহর। আর সেই লগ্নে আপনার নাম শুনে মনে হচ্ছে সোনায় সোহাগা কিংবা মনি কাঞ্চন যুগ।
আপনি দেখছি কাব্যিক ভাষায় কথা বলেন।এই বলে আমি মনে মনে বলতেছি ছেলেটার নাম তখন অমিত বলে তাহলে ভুল করিনি।
অত বেশি জানি না। তবে মাঝে মাঝে তাল খুঁজে পাই।তাই মুখ ফসকে বের হয়ে যায়। এরপর ছেলেটা আবার মৃদু হেসে দিল। পরস্পরের আর কোন কথা নেই।অতঃপর সন্ধ্যা হয়ে গেছে।আমার উপন্যাসের আর কিছুটা বাকী আছে। কথা প্রসঙ্গে পিঠা খেয়ে পানি খেতে ভুলে গেছি। উনাদেরকে পিঠা খাবে কি না জিজ্ঞেস করতে চেয়েও বেশি আধিখ্যেতা দেখালাম না।
পানি খেয়ে আবার মন দিলাম পড়ায়। হঠাৎ দেখা এই আকাশের প্রতিচ্ছবি বার বার চোখের পর্দায় ভেসে উঠছে। দুর ছাই! এসব কি হচ্ছে মনের মধ্যে। আচ্ছা আকাশের ও কি সেইম ভাবনা কাজ করছে এখন। আবার মনোযোগ সরে যাচ্ছে। পড়ায় কনসেনট্রেশান করো রাত্রি। নিজেকে নিজে বলতে শুরু করছি।
কখন যে পড়তে পড়তে এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে গেছি টের পাইনি। চোখ মেলে দেখি আমার গন্তব্যে চলে আসছি তখন রাত নয়টা। অবশ্যই ট্রেনের হুইশেলে ঘুম ভেঙে গেছে।আমার পাশে যারা ছিল তাদের দেখতে পারছি না।মনে হচ্ছে আমি ঘুমিয়ে গেছি বলে না জাগিয়ে তাদের গন্তব্যে নেমে গেছে।উফ! ঘুমটা নির্দিষ্ট সময়ে এসে ভেঙেছে। তা না হলে আজ স্টেশন মিস করতাম।মুখ ফিরিয়ে দেখি তারা দু'জন মোবাইলে গেইম খেলছে।আমি ব্যাগ পত্র নিয়ে নেমে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। এমন সময়ে দেখছি আকাশ আমার গতিবিধি লক্ষ্য করছে।আমি কিছু বলার আগে সে বলে উঠল,চলে যাচ্ছেন? আপনার গন্তব্যে বুঝি চলে আসছেন?
আমি শুধু 'জ্বি'।এই ছোট শব্দটি জবাব দিয়ে ট্রেন থেকে নেমে পড়বো এমন মুহূর্তে দু'জনের চার চোখ মিলে গেল। মনের ভিতর প্রেমের দোল খেয়ে গেল।আর সর্ব শরীরে বসন্তের শিহরণ জাগিয়ে দিল।কিন্তু কিছু বলতে পারেনি।আকাশও সম্ভবত কিছু একটা বলবে মনে হচ্ছে। বলে উঠার আগেই আমি ট্রেন থেকে নেমে গেলাম। সে ট্রেনের দরজায় এসে দাঁড়াল।আমি নিশ্চিত তার এসব কাণ্ড দেখে তার বন্ধু হয়তো অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমার কি আর!
আমি ট্রেন থেকে নেমে স্টেশনের ব্যস্ততার মিছিল দেখতে ছিলাম ব্যাগ রেখে। আর এই দিকে লক্ষ্য করছি আকাশ, রাত্রি বলে কিছু একটা বলতে গেল,আর অপর পাশ থেকে ট্রেনের হুইশেল বেজে উঠল।ট্রেন চলা শুরু করল আপন গতিতে। আকাশ মেঘবর্ণ ধারণ করে তাকিয়ে আছে।আমি মনে মনে,
'হে বন্ধু বিদায়'
এই উক্তি স্মরণ করে হাঁটা দিলাম উত্তর দিকে।
No comments:
Post a Comment
আপনার মতামত প্রদান করুন....