Sunday, January 15, 2023

সম্পাদকীয়

সাহিত্যের অঙ্গনে !! January 2023

সাহিত্যর অঙ্গনে

সাহিত্যের অঙ্গনে জানুয়ারি 2023 সংখ্যা

সূচী পত্র

সম্পাদকীয়

কবিতা














গুচ্ছ কবিতা




গল্প



অনুগল্প




সম্পাদকীয়

প্রতি নিয়ত লড়াই করে বেঁচে থাকাটা যেনো স্বাভাবিক জীবন শৈলী হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও তার মধ্যেই আমাদের ভালোবাসা গুলো টুকরো টুকরো ভাবে উপভোগ করে নিতে হয় , না হলে সব কিছু যান্ত্রিক পর্যায়ে পরিণত হবে।যারা লেখক এবং পাঠক আছেন তাদের আনন্দের  জন্য এই ওয়েব মাধ্যমটি।
সকলের ভালোবাসায় জানুয়ারি 2023 এর সংখ্যাটি প্রকাশ পাচ্ছে । এভাবেই আগামী দিন ও সকলের ভালোবাসা আশাকরে পত্রিকাটি।
সাহিত্যের অঙ্গনে ।





উপবাস পৃথা চট্টোপাধ্যায়

সাহিত্যের অঙ্গনে !! January 2023


উপবাস
পৃথা চট্টোপাধ্যায় 

ঘাসের শিশির ঝেড়ে মুখ তোলে হেমন্তের ভোর, 
মুক্তোমালা গাঁথা নারীর বিষাদ ঘোর, শীতলতা
অসুখ সংসার ; কখন যে রূপান্তর ঘটে যায় 
গূঢ় ! পাক খায় সুখ-দুঃখ অলাত চক্রের বাঁকে
তার ছবি আঁকে কেউ, হারিয়েছে চিত্রকূট মন
স্পর্শহীন দাহ, ভেঙে ফেলে ঘরের আগল কাঠ
নবাঙ্কুর জাগে, এমন তুুুমুল ঢেউ মাটির গভীরে
নিভৃত যোনির! উপবাসী সন্ন্যাসিনী চোখ মেলে 

কাকে খোঁজে কুয়াশা আচ্ছন্ন এই মদির সকাল?
ঈশ্বর পুরুষ থাকে অন্তরালে মানুষের ভীড়ে

সময়ান্তর শুকদেব দে

সাহিত্যের অঙ্গনে !! January 2023


সময়ান্তর
শুকদেব দে 

ধূপকাঠির ধোঁয়া যেন কলের চিমনি
মানুষের চেয়ে যন্ত্র প্রিয় হয়৷
প্রতিদিন এম্বুলেন্স ধুঁকে ট্র্যাফিক জ্যামে,
পরে পরে অনুভব করি সব
সম্মান আসে মৃত্যুর পরে... 

গিরগিটির মতো খাবার তাড়া করে
চুপিসারে ফেরে পায়ের ছাপ ৷
সময় দেখে এসেছি, ঘড়ি দেখেই যাব আবার;
তবু সময়কে চাইলেই থামাতে পারি আমি
কলমের অব্যর্থ নিশানায়৷

শীতকাল সঞ্জিত কুমার বর্মন

সাহিত্যের অঙ্গনে !! January 2023


শীতকাল
সঞ্জিত কুমার বর্মন 

কনকনে শীতে মানুষ লুকায় লেপে
বিধাতার সৃষ্টি প্রাণী যেন হারায় দিশে।
হাড় কাঁপানো শীতে দিনমজুর যায় পিষে
একাকার হয়ে যায় ধনী গরীব সব মিশে।
মা বোনেরা রান্নায় ব্যস্ত শীতে কেঁপে কেঁপে 
সবার তরে জলের দরে নিজেকে দেয় সঁপে।
শীতের সাথে পাল্লা দিয়ে কৃষক হারায় কাজে
সোনালি ফসল পুরষ্কার দিতে চাষীকে খুঁজে। 
তীব্র শীতে শিশুর হাসি বেজায় হিংসে
চাঁদনী রাতে মনের মাঝে তা ভীষণ বাজে।
কুয়াশার সকালে হেমন্তের আভাষ খেজুর রসে
শিশুটির সারা শরীর কাঁপে এক গ্লাস রস চষে।
যে পথিক পথের ধারে শীত বস্ত্রহীনে থাকে বসে
তাদের প্রতি মানবতা জাগুক সবার মানসে।
ঝিরঝির কুয়াশায় প্রকৃতি বিরহিণী সাজে
অপরুপা ধরণী তলে সর্বমঙ্গলের মাঝে। 

রোদ পোহানোর কথা অনিন্দ্যকেতন গোস্বামী

সাহিত্যের অঙ্গনে !! January 2023



রোদ পোহানোর কথা
অনিন্দ্যকেতন গোস্বামী 


শীত কামড়ে জাগ্রত হই এক ভিখারি দিনে।
মনের মধ্যে পরত পরত উড়ছে রক্ত তুলো,
পায়ের কথা ডুকরে ওঠে সিড়িটার সংলাপে
তুমিই কেবল চোখের তারায় অলক্ত দাগ দাগাও। 

স্টেশনে ঘুরতে থাকে এক আকাশের খিদে,
জীবন মাপা থার্মোমিটার উষ্ণতা পায় যদি
তবেই কিছু রোদ পোহাবো শালিক আঁকা লনে।
এসব দৃশ্য আমার পালক মনবে তুমি তা কি? 

আমি যে রোজ পাকান পিঠে শীতের কামড় খেয়ে
ব্যাস্ত হয়ে শরীর থেকে নামিয়ে রাখি মন।
কখন যেন ট্রেন উড়ে যায় ভিখারি, খঞ্জনী...
এসব গানই ভাঁজতে থাকে মেঘের চিলেকোঠা।

বিদায়ের কথা জাফর মোল্লা

সাহিত্যের অঙ্গনে !! January 2023


বিদায়ের কথা
জাফর মোল্লা

আসব না ফিরে আবার ওরে
মরণ হলে মোর।
বিদায়ের কথা বলার যা, তা 
বলে গেলাম তোর।। 

চোখের পানি একটু ও ঝরাস নি
আমার জন্য তুই।
সময় হলে যেতে হবে চলে
এ কথাটা তো সত্য ই।। 

মোর জীবন ধরায় কিছুক্ষণ
আমি তো মেহমান।
প্রভু ডাকলে যেতে হবে চলে
করতে হবে প্রস্থান।। 

যেতে হবে দূরে সবাই কে ছেড়ে
যে ঠিকানা অন্তহীন।
হবে না দেখা ওগো সাখা
আর কখনো কোন দিন।। 

সবার ফেলে যাব চলে
পড়ে রবে সবি।
তোর হৃদয়ে যত্ন করে
রাখিস আমার ছবি।। 

আর হবে না দেখা সাথী
এ শেষ বাক্য মোর।
বিদায়ের কথা বলার যা, তা
বলে গেলাম তোর।।

হতাশা অভিজিৎ দত্ত

সাহিত্যের অঙ্গনে !! January 2023


হতাশা
অভিজিৎ দত্ত 


সূর্য পশ্চিম আকাশে অস্ত যায় 
সত্যিই কী তাই?
নাকি পৃথিবীর আর্বতন গতির জন্য 
এমনটি মনে হয়? 

অনেক ঘটনাই আছে 
সূর্য অস্ত যাওয়ার মতো 
ভুল এরকম অনেকেরই হয় 
কজনই বা নিজেদের সংশোধন করে?
গতানুগতিকতার স্রোতে
আমরা ভেসে যায়।
সত্যিকারের বীরেরা লড়াই করে 
কজন শহীদের মর্যাদা পায়? 

রাজনীতি আর কূটনীতির প্যাঁচে পড়ে
বোকা মানুষগুলি শুধু মরে।
স্বজনপোষণ, দূর্নীতি আজ লাগামছাড়া 
সত্যিকারের শিক্ষিত যুবকেরা 
আজ দিশেহারা।
বাইরে ঝাঁ চকচকে ইমারত 
ভেতরে অসহায় মানুষের কান্না 
এইজন্যই কী দেশকে স্বাধীন করেছিল
ভারতমাতার বীর সন্তানেরা? 

শিক্ষা আর স্বাস্থ্য, দুই যেন বিপর্যস্ত 
উন্নয়নের জায়গাই, ভোট ব্যাংক হয়েছে
নেতাদের হাতের অস্ত্র ।
মহাপুরুষদের বাণী এযুগে 
কয়জন আমরা মানি?
সাধারণ মানুষ ও শিক্ষিত বেকাররা 
আজ গভীর হতাশায় নিমজ্জিত 
সুস্থ সংস্কৃতির জায়গাই, অপসংস্কৃতিতে 
ধীরে,ধীরে হচ্ছি আমরা অভ্যস্ত। 
নতুন সূর্যের আলো
আবার দেখতে পাবো তো?

শীত-বসন্ত তপন মাইতি

সাহিত্যের অঙ্গনে !! January 2023


শীত-বসন্ত
তপন মাইতি 

হঠাৎ ঘিরে ফেললে ঘোর কুয়াশা 
ঝাপসা হয় ট্রেন লাইন, ফুটপাত, বস্তি 
তুমুল ঠাণ্ডায় হয়তো বলবে মস্তি 
'একটু রোদে গিয়ে বসো দেখি 
একটু শীত উপভোগ করে দেখ 
জীবনে এক আধটা শীত প্রয়োজন 
বলব 'ওতে কাজ নেই, আছো তুমি...
শাক-সব্জির মাঠ, সোহাগী রোদের আজ 
গায়ে হলুদ, মনে বাজছে সানাই 
একমুখ অভিমান নিয়ে গেল রোদ 
জ্যোৎস্নায় ভিজে যাচ্ছে প্রেমের শহর 
এক নাগরিক প্রশ্রয় দিয়ে বলি 
তুমি পাশে থাকলে এই জীবনে
শীতের উষ্ণ আবেদনে চলে 
আসবে এক বাগান বসন্ত। 

দৃষ্টি অজিত কুমার জানা

সাহিত্যের অঙ্গনে !! January 2023

দৃষ্টি 
অজিত কুমার জানা 

দৃষ্টি এক তীক্ষ্ণ তীর, 
যে ছুঁড়ে সে জানে না, 
যাকে বিঁধে সে জানে। 
মাটির গভীরে নেমে, 
উপড়ে দেয় মূল। 
সূচনা আর বর্ণনা, 
পাশাপাশি বসে অনন্ত সময়।
জলভর্তি হাতল ভাঙা বালতি, 
কল্পনার জাল বুনে। 
স্বপ্ন মাদুর পেতে বসে, 
দৃষ্টি টগবগিয়ে চলে। 
মাটি ক্ষয়ে যায়, 
লাল সিগন্যাল জ্বলতে থাকে। 
মুন্ডু আর ধড় পৃথক হয়, 
ছটফট করে দুটি অঙ্গ। 
দৃষ্টি তুই ভুলিয়ে দে সব। 

মহামানব রহিত ঘোষাল

সাহিত্যের অঙ্গনে !! January 2023


মহামানব
রহিত ঘোষাল 

মহামানব পদক্ষেপে পদক্ষেপে
নতুন আদর্শের দৃষ্টান্ত আইনের ছাঁচে ঢেলে                
পথে পথে  লেপে পরিবেশন করে গেছেন।
তুমি তোমার ফেটে যাওয়া ঠোঁট নিয়ে             
নিঃস্পৃহ থাকতে থাকতে আচমকা চমকে
ফুটো থেকে ফুটোতে অনুপ্রবেশ করে                             
শানিত রক্তিম খয়রি লোভ নিয়ে      
  ঘুমাও শুষ্ক মাটিতে ।   
ভিন্ন ভিন্ন জন্মের পর হুট করে অযাচিত মাদক,
হাঁটুর নিচ থেকে পা অব্দি দুই হাতের মুঠোতে।
মহামানব এখন হঠাৎ  সমুদ্রের পথে দিশা হারায়েছে,
সে ধ্বংস দেখবে আজীবন ,
ছাইদানের কারুকার্যে অন্ধকার  লাবণ্যময়।।

শীতের আমন্ত্রণ সায়ন্তন রায়

সাহিত্যের অঙ্গনে !! January 2023


শীতের আমন্ত্রণ
সায়ন্তন রায়

তুমি প্রবেশ করেছো,
আমার হৃদয়ে।
উৎসাহী আমি যাযাবর হতে।
বাতাসের মতো ধেয়ে যাবো,
তোমার সনে।
প্রকৃতির রূপ ও মধু পানে।
সে যে ডাকে আমায়,
ব্যাকুল কন্ঠে।
এবং দিচ্ছে আমায় হাতছানি।
ওহে শীত ঋতু নাও তোমার সনে,
নিয়ে চলো আমায়।
সুন্দর প্রকৃতির আঁখির গোচরে।
তোমার পরশে হয় আমি,
প্রকৃতির অতিথি।
শুধু তুমি ধ্বংস করো আমার একাকী।

প্রতি বছর হোক এমন করে,
তোমার আগমন।
আমি রোইবো অপেক্ষা করে।


জীবন নদী তসলিমা লস্কর ‌

সাহিত্যের অঙ্গনে !! January 2023


জীবন নদী
তসলিমা লস্কর ‌ 
  
এই জীবন শুধু চলছে বয়ে
স্রোত হীন এক নদীর মতো।
উঠছে চূড়া ,জমছে পলি 
এমনি করে অবিরত।
আসবে কি আর স্রোত কোনদিন-
ছাপ করতে বুকের ক্ষত?
এমনি বলো আর কতদিন 
চলবে জীবন নদীর মতো? 

হয়তো নদীর চলতে মানা 
হারিয়ে গেছে তার ঠিকানা 
চলন্ত এক স্রোতে ।
তাইতো নদীর মনটা খারাপ 
তীব্র আগুন বুকে। 
জলের সাথে জল মেশে না 
অন্য সব নদীর মতো।
তেমন করে স্রোত বহেনা 
আপন করে মনের মতো।
আসবে কি আর স্রোত কোনদিন -
ছাপ করতে বুকের ক্ষত?
এমনি বল আর কতোদিন 
চলবে জীবন নদীর মতো? 

হয়তো কারো হাতছানিতে 
চলবে আবার তীব্র বেগে ।
বুকের পাথর সরবে তখন 
নতুন করে উঠবে জেগে।
সাগরের আলিঙ্গনে --
দূর হবে সব মনের ক্ষত। 
বইবে তখন জীবন নদী
খরস্রোতা নদীর মতো।

অমোঘ মেঘ কৃষ্ণেন্দু নস্কর

সাহিত্যের অঙ্গনে !! January 2023


অমোঘ মেঘ
কৃষ্ণেন্দু নস্কর 

আমি ভেবে হই দিশেহারা; 
তোমার বিরহের সুর ধরেছি,
                একতারা মন প্রেমের রাগের ছড়ায়,
         তীব্র গন্ধে পাগলপারা নেশার আকুল হয়ে ,
       সে বোঝেনা কাব্যকথা সোহাগ মাখার দ্রোহে।
রোজ রজনী সাক্ষী রেখে যাকে দিলাম মন,
         স্বপ্ন আশার গুড়ে বালি বৃথাই আয়োজন,
তবে কেন বোঝেনা প্রেমিক সত্যি ভালোবাসা,
  বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরা আদরবাসার শেষে।
ছাদ বাগানের আলতা রাঙা ছিটায় সূর্য যখন ঢলে,
  সুখ পাখিটা সুরে মাতাল সন্ধাপ্রদিপ জ্বলে।
সূর্য রাঙ্গা সিঁদুর ছিটায় নীল আকাশের বেড়া,
  মুক্ত আকাশ রাতজাগা মন স্মৃতির কাঁটায় ঘেরা। 

মন পাখিটা খেয়াল স্রোতে ছুটছে নীড়ের মায়ায়,
অনু-বাক্য আঁকড়ে বাঁচিয়ে রাখা কৃষ্ণচূড়ার ছায়ায়,
" কিছু পাখি যাচ্ছে ফিরে ঝাঁকে,
        নিড়ের মায়া চোখের কোনে আঁকে,
কিছু পাখির দিন ফুরায় না কভু,
      অতীত নিয়ে একলা পড়ে থাকে। 
সুর ধরেছি প্রেমরাগে অকারণে মায়ায় জড়াই খুব,
কালসিটে মুছে আদর দাগি তৃষ্ণা কাতর মন
 জুড়াতে দিই সাগরে ডুব । 

তোমারি ছুড়ে মারার অবহেলায় কি অদ্ভুত তাইনা!!
               জানতে চাও কতটা গিয়েছি দূরে,
                সামনে নয় তাকাও পিছন ঘুরে।
চোখের শ্রাবণে অন্ধকার আকাশের ঘনঘটায়,
 ফিরে তাকালে অনিক গগনে ঝরতো অঝোর ধারায়,
তোমার ভালবাসার ছিটেফোঁটায়, জানালার সুগন্ধীতে আর মনে মাখা হয়ে ওঠেনা কোন আক্ষেপে অনুযোগের সন্ধিতে। 

বোকা পাগলামির জলফড়িংয়ের বুক চিরে,
সৃষ্টি করে ভয়াবহ মানসিক যন্ত্রণা আলিঙ্গনের ভিড়ে।
লুকানো গল্পের নেপথ্য উঠবেনা কষ্টের আসল সত্য,
সংগোপনে আমিটা কলুর বলদের মত,
 হদ্যবোকা আত্মপ্রেমি মন,
আমিত্বের অস্তিত্বের মুঠো ছাইয়ে;
নিঃশব্দে কষ্টগুলো ঝেড়ে খোঁজ নাও কি প্রতিরোজ,
  অবিরত নিজেকেই ঠকিয়ে চলি ভুল পাত্রে ঢেলে,
আমি জানি তবু যে বুঝতে দিই না তোমাকে
 প্রেমময়ে আজ অন্ধকার কবরের গভীরে নিখোঁজ,
তীব্র গন্ধের পাগলপারা নেশায় আকুল হয়ে,
 তবুও ছুটি কিট ও কাটার সব যাতনা শয়ে। 

কাঁটার ঘায়ে রক্ত রাঙে বুকের ভিতর ক্ষরণ,
  কিট গুলো খায় কুরে কুরে হয় না তবুও মরণ।
লুকোচুরি নয়ন মেলায় খেলাতে করলে বাজিমাত,
  বিশ্বাসটা ভেঙে চুরে স্মিত হাস্যে করলে ধুলিস্যাৎ,
ঘৃণায় ভরা চোখ দুটো মোর ব্যথায় ভরা বুক,
  ঘৃণার মাঝে খুঁজে ফিরি ভালোবাসার সুখ। 

কবির ভালোবাসায়
রঙ বেরঙের হৃদয়ের ঊষর জমিন; 
যতই দীপ্ত গভীর হোক,
হৃদয় মনের সংগোপনে যতই আপন হোক, 
অপাত্রে প্রেম ঢেলেকবি বাড়াই শুধু শোক। 

     ছাদ বাগানের গোলাপ বলে,
কবে তুমি আমার হবে,নেবে আমার ভার।
      ময়না তখন ক্লান্ত সুরে কয়, 
কবে পাবো স্বপ্নেদেখা রূপকথার সংসার।
যুদ্ধ শেষে ক্লান্ত দেহ এলিয়ে যখন রাত বিছানায় -
 ছড়িয়ে আছে নষ্ট আলো টুকরো শোক,
নিঃস্ব মেয়ের গল্প জুড়ে যাচ্ছে একি কোন ঠিকানায়,
না হয় ভালবাসার বৃষ্টি হোক । 

হে আমার অভিমানী ভাসিয়ে নৈসর্গিক আবেদন,
   তোমার বুঝি শুধু ভাবা খিদে নিশীথ রাতের,
তুই আমার একাকিত্বের হৃদয় হরণকারী,
   বিনে পয়সায় শরীর বিকয় সস্তা প্রতীত জাতের।
বহমান হিংস্র ঢেউয়ে আমার ভাসিয়ে এসোনা তুমি,
       অভিমানী সাগরের দ্বার রুদ্ধদ্বারে,
জ্বলন্ত হৃদয়ের তপ্ত লাভায় একাকিত্বের সোভা ফুটছে,
      বাঁচবো কিভাবে নিজেকে ব্যসা ভাবার দ্রহে।
এক সমুদ্র ভালোবেসেও সম্মান যে আমি পাই নি,
ভালবাসার কাঙ্গাল আমি এমন প্রেম তো আমি চাইনি।
এমন জ্বালায় জ্বলবো আমি তোমায় ভালবেসে,
    হয়তো ছিল বিধির বিধান ঘটল পরিশেষে ।।



হাহাকার সোমনাথ ঘোষ

সাহিত্যের অঙ্গনে !! January 2023

 

হাহাকার
সোমনাথ ঘোষ



আজ আছো তুমি কত দূরে
রাতের আকাশে এক উজ্জ্বল
তারা হয়ে।
আজ‌ও কি আছ সেই আগের মতই 
হাসিখুশি আর উচ্ছল।

আজ‌ও কি মনে পড়ে প্রিয়া
যখন ধরে ছিলে হাত এসেছিলে
আমার অগোছালো ছোট্ট কুটিরে
নিজের হাতে সাজিয়েছিলে 
মনের মত করে।

হাতে হাত রেখে দিয়েছিলে কথা 
সুখে দুঃখে ভুলিব একে অপরের ব্যাথা,
কি জানি কোন অভিমানে চলে
গেলে একাকী রেখে আমারে
আজি হতে চার দশক পরেও
ভুলিতে পারিনি প্রিয়া তোমারে।

কারো প্রতি নেই কোন অভিযোগ
এ বিলাপ বেদনা একান্ত নিজস্ব মোর
আজি তোমার এই রেখে যাওয়া 
সংসারে ফুটেছে অনেক কুসুম 
বাহ্যিক নেই কোন সুখের অভাব
তবুও আমার মনে সদাই হাহাকার।

আজিকে আমি হয়েছি বৃদ্ধ
নুব্জ স্থলিত চর্ম কেশরাশি পক্ক
তবুও ইচ্ছে মিলিবারে সর্বক্ষণ
করিবে কি প্রিয়া মোরে আলীঙ্গন



গুচ্ছ কবিতা সঞ্জীব চক্রবর্তী

সাহিত্যের অঙ্গনে !! January 2023



গুচ্ছ কবিতা
সঞ্জীব চক্রবর্তী 

চৈতন্য 

মাটির ভিতরে জল
জলের গভীরে মাটি
তারপর আগুন
আগুনের জিভে
মহালয় 
তারপর তারপর
আমি অগ্নুৎপাতের
আশায় আশায়
কত রাত ঘুমোতে পারিনা

---------

সাদা পৃষ্ঠা ও আমি

সাদা পৃষ্ঠার সামনে
দাঁড়িয়ে রয়েছি আমি
কেউ বাহবা দিচ্ছে 
কেউ বলছে কিছুই হয়নি ভাই
একমাত্র আমি জানি আর সাদা পৃষ্ঠা জানে
কী চলছিল এতক্ষণ ধরে 
সে এক হনন-পর্ব
একটা হননপক্ষ থেকে অপর হননপক্ষে
চলে যাওয়া
ঠোঁটের কশ বেয়ে গড়িয়ে পড়া
রক্ত মুছে নিয়ে 

বৃষ্টির গন্ধ গৌরাঙ্গ শ্রীবাল

সাহিত্যের অঙ্গনে !! January 2023


বৃষ্টির গন্ধ 

গৌরাঙ্গ শ্রীবাল 



অনেক দিন হল সুদীপ্ত মারা গেছে। 

      সুদীপ্ত যে মারা গেছে তা মনেই হয় না মন্দিরার। কারণ মন্দিরার হৃদয়ে থেকে গেছে সুদীপ্তর অনেক কথা। কথা আছে যখন, মানুষ আছে। কলেজে যেদিন মন্দিরার সঙ্গে সুদীপ্তর প্রথম কথা হয়েছিল, সেদিন সুদীপ্ত মন্দিরাকে বলেছিল, ‘মন্দিরা, তুমি যেন শ্রাবণের মেঘ।’ 

      সুদীপ্তর কথায় খুশি হয়েছিল মন্দিরা। সে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুমি জানলে কী করে?’ 

      ‘তোমার সারা গায়ে বৃষ্টির গন্ধ।’ উত্তর দিয়েছিল সুদীপ্ত। 

      খিল খিল করে হেসে উঠেছিল মন্দিরা। তার হাসি দেখে সুদীপ্ত বলেছিল, ‘তুমি যে এইভাবে হাসছ না, আমি যেন দেখতে পাছি চারদিকে বৃষ্টির ধারা ঝরে পড়ছে।’ 

      ‘ভিজে যাবে তো তাহলে।’ 

      ‘ভালোবাসার বৃষ্টিতে ভিজতে ক্ষতি নেই।’ 

      না সুদীপ্ত মন্দিরার বৃষ্টিতে ভিজেনি। বরং যখনই এই কথাগুলি ভাবে তখনই মন্দিরা তার নিজের চোখের জলে ভিজে যায়। এ চোখের জল তার যতখানি না সুদীপ্তর দুঃখে তার থেকে বেশি আনন্দে। কারণ সমস্ত দুঃখকষ্টের মাঝেও থেকে গেছে এইটুকু ভালোবাসার গন্ধ। 

      সুদীপ্ত থার্ড ইয়ার ইংরেজি অনার্স। মন্দিরা প্রথম বর্ষ জুলজি অনার্স। সুদীপ্ত ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য। নবাগত ছাত্রছাত্রীদের ভর্তির সময় সহযোগিতা করতে গিয়ে মন্দিরার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় সুদীপ্তর। 

      তার পর দেখাশোনার পথে হল আরও ঘন পরিচয়। পরিচয় গড়ায় ভালোবাসায়। তাদের ভালোবাসা বেশ জমে উঠেছিল। সে ভালোবাসা গড়িয়ে গিয়েছিল অনেক দূর পর্যন্ত। 

      সুদীপ্ত ইংরেজি অনার্স পাশ করে কলেজ থেকে বেরিয়ে মাস্টার ডিগ্রি করতে ভর্তি হল ইউনিভার্সিটিতে। তার বছর দুই পরে মন্দিরাও জুলজি পাশ করে বেরিয়ে গেল। সেও মাস্টার ডিগ্রিতে ভর্তি হল। 

      তবে সুদীপ্ত ও মন্দিরার ছাড়াছাড়ি হয়নি। তাদের ভালোবাসা ছিল গভীর। 

      কিন্তু সব গভীরতার একটা তল থাকে। সেই তল স্পর্শ করাটা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। মন্দিরা ও সুদীপ্তর ভালোবাসার গভীরতার তল যদি স্পর্শ করে মৃত্যু? তার কাছে অসম্ভব কিছু নেই। 

      একদিন ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট হস্টেলে সুদীপ্তকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার মৃত্যুর তদন্ত চলছে। তদন্তের কাজে মন্দিরাকেও ঝামেলা পোহাতে হল।
এই ঝামেলা থেকে পাস কাটাতে শুরু হল মন্দিরার পাত্র খোঁজার পালা। 

      দুজনের ভালোবাসার কথা কেউ বাড়িতে জানানোর সময়টুকু পেল না। হঠাৎ মৃত্যু এসে সব এলোমেলো করে দিল। 

      মন্দিরাকে বাবা-মা-র সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হল। মাস্টার ডিগ্রিতে পড়তে পড়তে ভাঙা ঘরে চাঁদের আলোর মতো সুদীপ্তর কথাগুলিকে বুকে মুঠো করে রেখে মন্দিরা বিয়ের পিঁড়িতে বসল। মন্দিরার স্বামী ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট অফিসের ক্লার্ক। প্রচুর চাপ। 

      মন্দিরারও চাপ কম নয়। নিজের পড়াশুনা, স্বামীর অফিস যাওয়ার তাড়া, তারই মাঝে গোপনে গোপনে আবার সুদীপ্তর স্মৃতি রোমন্থন করে আবেগে আপ্লুত হওয়া। 

এইভাবে দেখতে দেখতে বছর সাত-আটেক কেটে গেল। মন্দিরা অনেক চেষ্টা করেছে, চাকরিবাকরি পায়নি। এখন সে মেয়েকে নিয়ে পড়েছে। তার একটি বছর ছয়েকের মেয়ে সুদীপা। নামটা সে সুদীপ্তর নামের সঙ্গে মিলিয়ে রেখেছে। মেয়ের এই নাম রাখার পিছনের ভাবার্থ মন্দিরার স্বামী জানে না। 

      মন্দিরা জানে। 

মন্দিরা জানে বলে তার মাঝে মাঝে ভয় করে। কারণ সে সুদীপার মধ্যে যেন সুদীপ্তর ছায়া দেখতে পায়। মাঝেমধ্যে হঠাৎ করে মন্দিরাকে তার মেয়ে সুদীপা জিজ্ঞেস করে ফেলে, ‘মা তুমি কি বৃষ্টিতে ভিজেছ?’ 

‘কেন বল তো সোনা?’ মন্দিরাও পালটা প্রশ্ন করে ফেলে। 

‘তোমার সারা গায়ে বৃষ্টির গন্ধ।’ 

মন্দিরা নাক দিয়ে নিজের গায়ের গন্ধ শুঁকে বলল, ‘কই না তো। এখন বৃষ্টি কোথায়?’ 

‘হ্যাঁ মা, আমি তোমার সারা গায়ে বৃষ্টির গন্ধ পাচ্ছি।’ 

মন্দিরা কথা ও সুদীপার মনটাকে ঘোরানোর জন্য বলল, ‘কী যে বলিস না, মন দিয়ে ছবিটা আঁক।’ 

মন্দিরা সুদীপাকে ছবি আঁকায় মন দিতে বললেও তার মনে অন্য কথা চলতে লাগল। সে মেয়ের কাছে থেকে সরে এল। ভাবতে লাগল কেন মাঝে মাঝে সুদীপা এমন কথা বলে? ওর মধ্যে কি তবে…। না ও এমনিই বলছে? না এটা কোনো মানসিক রোগ? 

মন্দিরা কিছু বুঝে উঠতে পারে না। সুদীপ্তর রেখে যাওয়া কোনোকিছু তো মন্দিরার কাছে নেই, যা সুদীপা দেখে ফেলতে পারে। যা আছে তার বুকের ভিতরে জমানো কথা। সে কথা তো কারও কাছে কোনোদিন বলেনি। 

তবে?
তবে সুদীপা জানল কী করে? ভাবতে ভাবতে মন্দিরার বুকটা ভারী হয়ে উঠল। টল টল করে উঠল দু-চোখ, গড়াতে লাগল গাল বেয়ে। 

ঠিক এই সময় সুদীপা এসে তার মাকে জড়িয়ে ধরল। মন্দিরা তাড়াতারি চোখে জল মুছে বলল, ‘কী হল সোনা তুমি চলে এলে কেন?’ 

‘চল মা, দেখবে চল, আমি তোমার একটা ছবি এঁকেছি।’ 

‘তাই! চল দেখি চল।’ মন্দিরা বলল। 

‘আর তোমার সেই ছবি থেকেও না বৃষ্টির গন্ধ বেরোচ্ছে।’ 

      ‘সোনা! এ তুই কী বলছিস?’ 

      ‘জানি না মা। আমি তোমার মধ্যে শুধু বৃষ্টির গন্ধ পাই।’ 

      ‘না সোনা। আমার মধ্যে কোনো বৃষ্টির গন্ধ নেই।’ বলেই মন্দিরা তার মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁদতে লাগল। 

      ‘কাঁদছ কেন মা?’ সুদীপা বলল। 

      মন্দিরা মেয়ের মনের ভাব কিছুটা আন্দাজ করতে পারল। সে সুদীপার কথায় সায় দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁরে সোনা। আমি শ্রাবণের মেঘ। আমার সারা গায়ে বৃষ্টির গন্ধ।’ 

‘কেন এমন হয় মা?’ 

‘জানি না। তবে এরকম মাঝেমধ্যে হয়।’ 

‘আচ্ছা মা তুমিও আমার গায় কোনো গন্ধ পাও’ 

‘হ্যাঁ।’ 

‘মিষ্টি গন্ধ।’ 

‘হল না, হল না।’ 

‘কী হল না।’ 

‘আমার দেহের গন্ধের সঙ্গে তোমার আন্দাজ মিলছে না।’ 

‘তবে?’ 

‘আমিও ঠিক বুঝতে পারছি না।’ 

‘আমি বুঝতে পারছি।’ 

‘কী?’ 

‘আমার শরীর বৃষ্টির শরীর। সেই শরীর থেকে তোমার জন্ম। তোমার শরীরেও সেই একই বৃষ্টির গন্ধ।’ 

সুদিপা আনমনা হয়ে বলল, ‘হয়তো তাই।’ 

মন্দিরা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে খুব করে আদর করতে লাগল। সুদীপার সারা গালে মুখে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিতে লাগল। এবং বলতে লাগল, ‘আমরা দুজনে বৃষ্টির মেয়ে। আমাদের গায়ে শুধু বৃষ্টির গন্ধ।’ 

      বলতে বলতে মন্দিরা আদরে সোহাগে সুদীপাকে কাতুকুতু দিতে লাগল। সেই শিহরনে সুদীপা ‘হি-হি-হি’ হাসতে লাগল।

ও ঘরের কথা মনোরঞ্জন ঘোষাল

সাহিত্যের অঙ্গনে !! January 2023


ও ঘরের কথা
মনোরঞ্জন ঘোষাল

আনেক কষ্ট করে মাধ্যমিক পাশ করেছে বিকাশ। তার পর কলেজে ভর্তি হল। লেখাপড়ার খরচ চালানোর সামর্থ নেই তাদের, হাভাতের সংসার। কটা টিউশনি করে কোন রকমে নিজের পড়ার খরচ চালাচ্ছে, এমন সময় মা মারে গেল। 
ছেলে বড় হয়ে গেছে, বাবা ‘প্রকাশ’ আর বিয়ের পিঁড়িতে বসতে রাজি হল না। মনে ভেবে রাখল দু’একটা বছর অপেক্ষা করে ছেলেকে বিয়ে দিয়ে দেবেন। মানুষ স্বপ্ন নিয়েই বাঁচে, আর এমন হাভাতেদের স্বপ্ন ছাড়াই বা আছে কী? 
মা ‘জানকী’ মারা গেলে বাবা প্রকাশ হাত পা পুড়িয়ে রান্না করে, ঘর গৃহস্থালির সব কাজ করে। ছেলে বিকাশকে এতটুকু কাজের বোঝা চাপতে দেয় না। প্রকাশ তো লেখাপড়া জানে না, তাই ভাবে ছেলে ঐ লেখাপড়া শিখে ভাল কিছু চাকরি করবে, অন্তত দু’বেলা দু’মুঠো ভাত তাদের পেটে পড়বে। 
বাস্তব যে কত দূর তার জানা ছিল না। বিকাশ উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিল কিন্তু পাশ করতে পারল না। তার এই ফলের জন‍্য পরিবেশ পরিস্থিতি দায়ী হলেও তা বুঝবে কে? সে কথা কেউ বুঝল না। 
লেখাপড়ায় ইতি দিয়ে কাজের খোঁজে লেগে পড়ল বিকাশ। চাকরি পাওয়ার থেকে ভগবানের দেখা পাওয়া যে অনেক সহজ সে জানতো না! নানান জায়গাতে ছুটে বেড়াল কোথাও কেউ তাকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিল না। সে তো জানে না যে লোকে তেলা মাথাতেই তেল দেয়। জলে জল দাঁড়ায়! নিজের লোক বা অপর, সকলে তাকে আশা দিয়ে তাদের কিছু কাজ গুছিয়ে নিতে লাগল। আর ও বেচারা আশায় বুক বেঁধে খোঁটায় বাঁধা গরুর মত তার চারিদিকে ঘুরতে লাগল। যখন সে বুঝতে পারল যে, তারা ওর কোন কাজেই লাগবে না, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। জীবনের অনেকটা কাজের সময় পেরিয়ে গেছে তার। তবু সব ভাল যার শেষ ভাল হয়। কিন্তু যার ভাল হবার নয়, তার শুরু বা শেষ সবটুকুই সমান তালে চলে।  সে একটা দোকানে কাজে লাগল। অল্প মাইনে দেয় সেখানে। দোকান তাই আলাদা কিছু করার সময় পায় না। কোন রকমে সেই অল্প টাকায় তাদের সংসার চলছে। এদিকে বাবার বয়স বেড়ে চলেছে। কাজ আর আগের মত করতে পারে না। ছেলেকে একটা বিয়ে করার জন‍্য বলে। সে বলে তার অল্প রোজগার নিজেদেরই ঠিক মত চলে না, তায় আবার বৌ আনলে কী হবে?
বুড়োদের একটা কথা আছে, তাঁরা প্রায়শই এই কথা বলে থাকেন যে, পাঁচ জনের সংসারে এক জনের একটু টেনেটুনে চলে যাবে। সেটা চলে যায় তবে তা যে আসবে তার গুণে। এই খানেই একটা কথা একেবারে যুক্তিযুক্ত তা হল “ সংসার সুখি হয় রমণীর গুণে”। সেটি বাছাই করার লোক তার নেই। সাধারণত ঘরের গৃহিণী তার মা জানকী বেঁচে থাকলে তার সংসারের মঙ্গলের উপযুক্ত কনেকে পছন্দ করে বৌমা করে আনতেন, এদের তা করবে কে?
বিয়েতে রাজি না থাকলেও বাবার চাপে তাকে একরকম জোর করে বিকাশকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হল। অভাবের সংসার তাই এক গরিবের মেয়ে ‘কাজল’কে পছন্দ করে বিয়ে করল। মনে ভাবল কাজল গরীব তো তাই অভাবটা বুঝে মানিয়ে নিয়ে সংসার  চালাবে। আচার অনুষ্ঠান করে বিয়ে মিটল। বৌ বাড়িতে এসেই তাদের চাল চুলো হীন সংসারের চেহারা দেখে মনে খুব গোঁসা ভরে রাখল। মনে ভেতরে কে কার ঢুকবে? তাই বৌয়ের গোঁসা সে বুঝতে পারল না। আমাদের এই একটা দোষ! আমরা আমাদের নিজের অবস্থাকে কখনও তুলনা করতে চাই না। আমি কী ছিলাম আর কী হলাম? তা কখনো ভেবে দেখি না। আর ভাবলেও মিথ‍্যের জাল বুনে আসল সত‍্যকে আড়াল করে মিথ্যেটাকেই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে সকলের সামনে তুলে ধরি। জাহির করতে চাই যে আগে আরো ভাল ছিলাম। অনেকে তার মিথ্যে ধরে ফেলে, অনেকে ধরতে পারেনা। বিশেষ করে মহিলারা, সেই মিথ্যে শুনে মন গরম করে তাদের নিজেদের সংসারে অশান্তি শুরু করে। স্বামীর ওপর একের পর এক আবদারের বোঝা চাপাতে থাকে, আর সে সেই আবদার মেটানোর জন‍্য ঘোড়ার মত দৌড়াতে থাকে।
কেউ কেউ তাদের স্ত্রীর ঐ সব আবদার মেটাতে সক্ষম হলেও সকলে সক্ষম হয় না। তাদের স্ত্রীদের কেউ কেউ আবার অন‍্য পথে নিজের সখ পূরণ করতে আগ্রহ দেখায়। সে পথ নানান রকম হয়। অনেকে সংসারে থেকেই তা পূরণ করে, আবার অনেকে সংসার ত্যাগ করে। এখানেও তেমন ঘটল।
স্ত্রীর আকাশ ছোঁয়া সাধ বিকাশ পূরণ করতে পারছে না। তার বৌ কাজল কোন কথা তাকে আর জানাল না। একদিন তার থাকা যাবতীয় গয়না আর গচ্ছিত টাকা গুলো নিয়ে গেল বাপের বাড়ি। বিকাশ তা বুঝতে পেরে গেল। সে বৌকে ফিরিয়ে আনলেও সেই গয়না আর টাকা ফেরত আনতে পারল না। খুব সাধারণ সরল মনের ছেলে সে, অহেতুক ঝামেলা না বাড়িয়ে শ্বশুর বাড়িতেই সেগুলো থাক বলে তাকে বুঝিয়েছে কাজল, আর সে তা মেনে নিলো। একবার ভেবে দেখল না যে, তার বৌ এ কাজ কেন করল?
বেশ কিছুদিন কেটে গেল, কাজলের বাপের বাড়ি যাবার মন হল। দু’জনে একসঙ্গে গেল, কিন্তু কাজল আর ফিরতে চাইল না। বিকাশ তাকে ঘরে ফিরে আসার কথা বললে, তার কপালে জুটল গাল মন্দ আর মার। তাকে মারধোর করে তাড়িয়ে দিল। সে বুঝতে পারল না যে, এমন ঘটনা কেন ঘটল? সাদা মাটা সংসারি ছেলে, সে চায় সংসার করতে। সংসারটা দু’জনের, সে একা চাইলেই সংসার হবে কী? তাই হল না। শ্বশুর বাড়ির লোকেও কেউ মেয়েকে সংসার করানোয় আগ্রহ দেখাল না। মেয়ে যে তাদের কী বোঝাল তা সে ঈশ্বরই জানেন। তাই বলে তো আর বিয়ে করা স্ত্রীকে সে হুট বলতে ছেড়ে দিতে পারে না! বেশ কয়েকবার সে নিজে গিয়ে মীমাংসা করবে বলেও ফিরে এসেছে। স্ত্রীর ব‍্যবহার তাকে সেখানে যেতে পাপ বোধ করায়।  সে ভীত হয়ে পড়ল। 
ভাল ছেলেদের এই এক জ্বালা, তারা কোন ঘটনাকে তুচ্ছ বলে উড়িয়ে দিতে পারে না। সব সময় তার মাথায় ঐ ঘটনা ঘুরে বাড়াতে থাকল। সে খুঁজে বেড়াতে থাকল তার অপরাধ! সে যে বনের সুন্দর ঘাস ফুল ভেবে বিষের আধার তুলে এনেছে তা বুঝতে পারল না। এমন চলতে চলতে কাজল একদিন শ্বশুর বাড়ির পাড়ার এক ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গেল। গয়না আর টাকা যে সেখানে নিয়ে গিয়ে কেন রেখেছিল সে এখন বুঝতে পারল। নিজের ভূল বুঝতে পেরে সে অনুশোচনায় ভেঙে পড়ল। অসহ্য মানসিক চাপ নিয়ে একদিন সে রাতে বিছানায় ঘুমাতে গেল আর তার ঘুম ভাঙল না। সেধে সেধে সে মৃত্যুকে বেছে নিলো। এটাকে নিয়তি বলবে না অপরিনাম দর্শিতা?  

নবম কন্যা অধীর সিনহা

সাহিত্যের অঙ্গনে !! January 2023



নবম কন্যা
  অধীর সিনহা                                                               

‘বাবা, এক সপ্তাহ হয়নি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছ।কোন সকালে ট্যাবলেট দিয়ে গেলাম,খাওনি কেন? কবে ভালো হয়ে প্রতিমা তৈরি করবে?’ গৌরী রাগত স্বরেই বলল। 

‘বড় তেতো ওষুধ মা, মিষ্টি কিছু খেতে ইচ্ছে করছে।’ 

‘সব পাবে-ওষুধ খেয়ে আগে সেরে ওঠো। কুমারটুলির সব ঠাকুরের মাটি সুরু হয়ে গেছে। তুমি খড় বেঁধেই অসুস্থ হয়ে পড়লে।এখন হাত চালিয়ে কাজ করতে হবে। ’ 

‘আমি এখন অনেক সুস্থ হয়ে গেছি।এক কাজ কর, আমার লাল খাতার লিস্ট দেখে তাড়াতাড়ি ৯ জায়গা থেকে ৯ কন্যার মাটি জোগাড় কর। এই মাটি দিয়েই মায়ের কাজ সুরু হয় প্রতিবার। এবারে আমি বাইরে সব জায়গায় যেতে পারব না, শক্তি নেই। অবশ্য সব জাগায় তুইও যেতে পারবি না-তবু যতটা পারিস কাজ এগিয়ে রাখ।’ 

‘খাতা কোথায় বাবা?’ 

‘ওই বাইরের ঘরে রাখা আছে।খুঁজে নিতে পারবি না মা?’ 

গৌরী লাল খাতা খুঁজতে বাইরের লাগোয়া ঘরে ঢুকল। এটাই বাবার অফিস,গুদাম, একসাথে-খড়ের বিচালি ছড়িয়ে চারিদিকে। লাল খাতা চোখে দেখলেও কোনদিন পড়ে দেখেনি।অন্ধকারে হাতড়ে লাল খাতা পেয়ে গেল গৌরী।আঁচল দিয়ে ধুলো ঝেড়ে খাতা খুলল। এই ত মাটির লিস্ট; প্রথমে নর্তকী, তারপর কাপালিক, ধোপানী, নাপিতানী, ব্রাম্ভণী, শূদ্রাণী, গোয়ালিনী, মালিনী,শেষে বেশ্যা বাড়ি। 

গৌরী খেয়াল করল তার আঁচল কাঁধ থেকে সরে যাচ্ছে,চমকে পেছনে তাকাল, ‘একি স্বপনদা? এখানে? পায়ে পড়ি, ছাড় আমাকে,বাবা টের পাবে।’ গৌরীর কাতর আর্তনাদ। 

‘ওষুধের জন্য অনেক টাকা নিয়েছিস,তখন শোধ দেবার কথা বলেছিলি? চিন্তা নেই ফেরত দিতে হবে না।’ 

‘সব টাকা আমি শোধ করে দেব,আমায় ছেড়ে দাও,’গৌরী শেষ চেষ্টা করল। 

‘কোন দরকার নেই শোধ করার, খালি মাঝে মাঝে...,’ স্বপনদার শ্বাপদ থাবার মধ্যে গৌরীর লাজ লজ্জা একাকার গেল।  

‘ছাড়ো আমাকে,বুকে লাগছে।আমি সব টাকা মিটিয়ে দেব...।’ 

আসুরিক শক্তির কাছে এক মাটি হয়ে গেল গৌরী-কানে এলো বাবার ডাক।পেঁচান হাতে দাঁত বসিয়ে দিল গৌরি। শাড়ি তুলে গৌরী ঘর থেকে বেরতে গিয়ে দেখে বাবা বাইরে দাঁড়িয়ে, 

‘শাড়িটা পড়েনে মা, তারপর গঙ্গায় চান করে-এক ঘটি জল নিয়ে আয়।’ 

গৌরী বাবাকে দাওয়ায় বসিয়ে, গঙ্গায় ডুব দিয়ে ভিজে কাপড়ে এক ঘটি জল নিয়ে এলো। রুদ্ধ স্বরে বাবা বললেন, 

‘এবারে চৌকাঠের নীচে থেকে এক চিমটে মাটি তুলে নে। ন কন্যার লিস্টের শেষ পুণ্যবতী কন্যা তুই। অন্য কোথাও যাবার দরকার নেই।’



নিরূদ্দেশ অনুপম দাস

সাহিত্যের অঙ্গনে !! January 2023



নিরূদ্দেশ
অনুপম দাস

ঝুপুস বৃষ্টি নামলে ঘরে চুপটি করে বসে না থেকে অর্কর। নিরূদ্দেশ হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। এই বৃষ্টিভেজা দিন গুলোতে তাই সুযোগ পেলেই ট্রেনে চড়ে অর্ক শহরবা শহরতলি ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় কোন নাম না জানা স্টেশনে। তিন বছর ধরে সমাজের তথাকথিত নিচু তলার মানুষদের নিয়ে গবেষণা করছে অর্ক, জন্মসূত্রে আপাদমস্তক শহুরে হলেও,  উদাস করা এক রাখালিয়া মেঠো সুরে ওর মন অনুরণিত হয়। তাই মাঝে-মাঝেই কংক্রিটের জঙ্গল থেকে মুক্তি নিয়ে অর্ক পৌঁছে যায় শাল-পিয়ালের জঙ্গলে। মহামারীর আবহে যখন ট্রেনের চাকা স্তব্ধ হয়ে যায় তখন অর্ক হাঁপিয়ে ওঠে। আজ এই বৃষ্টি ভেজা দিনে ব্যালকনিতে একলা দাঁড়িয়ে এমনই এক দিনের স্মৃতি অর্কর মনে আরো এক পরত বিষন্নতার প্রলেপ লাগিয়ে দিল।

গতবছর মার্চ মাসে গবেষণার কাজে অর্ক গিয়েছিল পুরুলিয়ার আদিবাসী অধ্যুষিত বরন্তি গ্রামে। সকাল থেকে পায়ে হেঁটে বেশ কয়েকটা গ্রামে ঘুরেছিল। গ্রামের মানুষদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করে দুপুরে ক্লান্ত হয়ে সে একটা বুড়ো বট গাছের তলায় বসে পরেছিল। 

"তুমি কে ? কোথা থেকে আসছ? বছর দশেকের একটি বাচ্চা মেয়ে সাঁওতালি ভাষায় অর্ক কে জিজ্ঞেস করল।  গাছের  ছায়ায় বসে অর্কর একটু তন্দ্রা এসে গিয়েছিল হঠাৎ মেয়েটির কথা শুনে চমকে উঠল। আদিবাসীদের নিয়ে গবেষণা করবে বলে অর্ক সাঁওতালি সহ আরো কয়েকটা অস্ট্রিক ভাষা শিখে নিয়েছিল। তাই মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে ওর কোন অসুবিধা হয়নি। অর্ক খুব বাচ্চা ভালোবাসে, তাই মেয়েটির সঙ্গে ও সহজেই ভাব জমিয়ে নিল। অর্কর প্রচন্ড জল তেষ্টা



 পেয়েছিল। সেকথা মেয়েটিকে বলতেই ও দু কিলোমিটার দূর থেকে অর্ক কে জল এনে দিয়েছিল। জল খেয়ে তৃপ্ত হলেও এই একরত্তি  মেয়েটা ওর জন্য এতটা কষ্ট করছে দেখে অর্কর খুব লজ্জা করেছিল । মেয়েটির নাম গুঞ্জা। এই নামটাও অর্কর খুব মিষ্টি লেগেছিল। মাত্র ঘন্টা দুয়েকের আলাপে গুঞ্জা অর্ককে আপন করে নিয়েছিল।

ট্রেনে ফেরার সময় গুঞ্জার বড় বড় দুটো চোখ বারবার অর্কর চোখে ভেসে উঠেছিল। সেই চোখের দৃষ্টিতে গ্রামীণ সরলতা যেমন ছিল তেমন যে একটা দৃঢ় প্রত্যয় ছিল তা ওর  নজর এড়ায়নি। গুঞ্জা বলেছিল ওর বাবা নেই, এতোটুকু বয়সে  বাবা না থাকার যন্ত্রণা নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করতে পারে অর্ক।

তারপর নাগরিক জীবনের ব্যাস্ততায় গুঞ্জার কথা অর্কর আর তেমন করে মনে রইল না। গত বছর ডিসেম্বর মাসে গবেষণার কাজে পুরুলিয়া গিয়েছিল অর্ক । সেদিন ও সকাল থেকে  ঝুপুস বৃষ্টি হচ্ছিল। তাই অর্ক ঠিক করেছিল কাজ মিটিয়ে সোজা হাওড়ার ট্রেন ধরবে। পুরুলিয়ায় গিয়েই অর্কর হঠাৎ গুঞ্জার কথা মনে পড়ে গেল। তাই কাজ মিটতেই বৃষ্টি মাথায় করে অর্ক বেরিয়ে পরল। বিকেল তিনটে নাগাদ ও বরন্তি গ্রামে পৌঁছল। ততক্ষণে বৃষ্টি থেমে রোদ্দুর উঠেছে। আদিবাসীরা রাস্তায় এসে পরন্ত বিকেলের মিঠে রোদ পোহাচ্ছে। তাদের গুঞ্জার নাম বলতেই ওরা চুপ করে গেল। ওরা নিজেদের মধ্যে চোখে চোখে কি যেন কথা বলল, তারপর অর্ক আবার যখন গুঞ্জার প্রসঙ্গ তুলল, তখন ওরা কথা না বলে শুধু একটা ঘৃণার দৃষ্টি


ছুঁড়ে দিল। না, এই গুগুল যুগেও গুঞ্জা সম্পর্কে আর কোনতথ্য জোগাড় করতে পারে নি অর্ক।




নবতম প্রকাশিত সংখ্যা

অপূর্ণ স্বপ্ন

অপূর্ণ স্বপ্ন  বিপ্লব মাহাতো পূর্ণিমা রাতে চাঁদের এ কী মেলা, ও সুন্দরী, ভালো লাগে না আর লুকোচুরি খেলা। ভেবেছিলাম তোমাকে নিয়ে যাবো দূরদেশে, ...

আরও পড়ুন