মুকুর অনলাইন
হারানো ঠিকানায়
তসলিমা লস্কর
“ওরা আমাকে খুব মেরেছে দীর্ঘ তিন বছর ধরে । দেখুন , সেই সব আঘাতের চিহ্ন । রক্ত জমে আছে কালো হয়ে ।” বলতে বলতে সরিফান গভীর শোকে প্রায় বাগরুদ্ধ হয়ে দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে বেদনার নোনা জল ।
আহ্বায়ক বললেন – “এখানে আপনার কান্নাটা অপ্রাসঙ্গিক নয় । আমাদের এই “আপন ঠিকানা” অনুষ্ঠানে আপনার মত প্রায় ৮ শতাধিক মানুষ কেঁদেছে । কেউবা হারানোর বেদনায় , কেউবা ফিরে পাওয়ার আনন্দে । বলুন মন খুলে শুনবো আপনার সব কথা ।”
“আমার বাবা ভাঙ্গারির ব্যবসা করতে করতে অনেক টাকা দেনা হয় । দেনা পরিশোধ করতে গিয়ে বাবা আমাদের ছোট্ট বাড়িটা বিক্রি করে দেয় । তারপর থেকে আমরা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতাম । দেনা মিটিয়ে বাবা বাড়িওয়ালির কাছ থেকে মোটা টাকা ধার নিয়ে আবার ব্যবসা শুরু করে । কিন্তু দ্বিতীয় বারও বাবার আরো বেশি টাকা লোকসান হয় । গ্রামের পাঁচ কাঠা জমি বিক্রি করে বাড়িওয়ালির দেনা শোধ করে দেবে বলে বাবা আমাদের দুই ভাই বোনকে রেখে দেশের বাড়িতে চলে আসে । সপ্তাহখানেক পর বাবা ফোন করে বলে – “ আমি কাল টাকা নিয়ে যাচ্ছি ।” পরদিন সকাল দশটার পর আমার চাচার ফোন থেকে কল আসে । খরব শুনি বাবা হঠাৎ সকালে হার্ট অ্যাটাক করে এন্তেকাল করেছে । আমি আর দাদা কেঁদে বুক ভাসাই । কিন্তু বাড়িওয়ালি তবুও আমাদের ছাড়ে না । দু একদিন পর বাড়িওয়ালি দাদাকে ছাড়লো কিন্তু আমাকে ছাড়লো না । দাদা বাড়িওয়ালির কাছে প্রতিশ্রুতি দেয় আমি যে করে হোক এক মাসের মধ্যে টাকা পরিশোধ করে আমার বোনকে নিয়ে যাব । কথামতো দাদা এক মাসের ভিতরে টাকা জোগাড় করে নিয়ে আসে । কিন্তু ওরা টাকা কেড়ে নিয়ে দাদাকে মারধর করে তাড়িয়ে দেয় , আমাকে যেতে দেয় না । দাদা যাবার সময় কাঁদতে কাঁদতে বলে – “চিন্তা করিস না বোন গ্রামের সবাইকে জানিয়ে আমি এক-দু দিনের মধ্যে তোকে নিয়ে যাব । পরদিন হয়তো লোকজন নিয়ে আমার দাদা এসেছিল । কিন্তু বাড়িওয়ালি রাতারাতি বাড়ি বদল করে আমাকে নিয়ে অনেক দূরে কোন অজানা ঠিকানায় চলে যায় ।
তারপর থেকে আমার উপর অমানবিক অত্যাচার করতে শুরু করে । আমি প্রায় তিন বছর অত্যাচার সহ্য করতে বাধ্য হয়েছি । তারপর আমি একদিন অনেক কৌশলে ওই বাড়ি থেকে পালিয়ে আসি । তখন আমার বয়স ১১ বছর । কোথায় যাব কি করব কিছু বুঝতে পারছিলাম না । একটা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলাম । এক ভদ্রলোক বর্তমানে যিনি আমার বাবা , কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করে । আমি ওনাকে সব কথা বলি উনি আমাকে ওনার বাড়িতে নিয়ে যায় । সেই থেকে ওনাদের মেয়ের পরিচয় আমি বড় হই । ওনারা আমাকে লেখাপড়া শিখিয়ে বিয়ে দিয়েছেন । ওনারা না থাকলে হয়তো আমি ভেসে যেতাম । ওনারা আমাকে নিজের বাবা মা’র মতো ভালবাসেন । কিন্তু তবুও আমার জন্মদাতা মা , আর দাদার জন্য আমার মন বড় কাঁদে ।” বলতে বলতে বেদনায় সরিফানের দু’চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে ।
আহ্বায়ক বললেন – “ চিন্তা করবেন না আপনার আপনজনদের ফিরে পেতে আমরা সর্বতোভাবে সাহায্য করবো ইনশাল্লাহ ।”
যথাসম্ভব সরিফানের কাছ থেকে সংগৃহীত ঠিকানা আহ্বায়ক “আপন ঠিকানা” অনুষ্ঠানে প্রচার করেন ।
১৫ -১৬ দিন পর একদিন রাত ১১ টা নাগাদ সরিফানের ফোনে একটা নতুন নাম্বারে কল আসে । ফোন আলাপের পর বুঝতে পারে সেটা তার দাদা । সরিফানের আনন্দে হৃদয়টা উচ্চশিত হয়ে ওঠে । তার দাদা শামীম নিজের পরিচয় দিয়ে দু’-চার কথা বলে ,বলে – “মা সারাক্ষণ শুধু তোর কথা বলে । মা এখন ভীষণ অসুস্থ তাই তোর কোন খবর এখনো মাকে জানানো হয়নি । আগে মার সঙ্গে কথা বল ।”
পরিচয়ের পর সরিফানের মা ফরিদা বলে – “মারে তোর জন্য আমার জীবনটা হুহু করে । তোর একবার দেখা পেলে শান্তিতে মরতে পারবো । কখন আসবি তুই ?
সরিফান – “কাল আমরা যাচ্ছি কেঁদোনা মা , আল্লাহ সব ভালো করে দেবে ।”
এই ২৫-২৬ বছর ,সাহানাজ নিজের মা দাদার আদর সোহাগ থেকে বঞ্চিত । এত বছর পর হারানো আপনজনদের ফিরে পাওয়া যে কি আনন্দের তা একমাত্র আল্লাহ জানেন । আনন্দে যেন সারারাত ভালো করে ঘুম এলোনা ।
পরদিন খুব সকালে বের হয়ে তারা সপরিবারে পৌঁছে যায় তার মা দাদার কাছে । পুনর্মিলনের আনন্দে তারা পরস্পর কেঁদে বুক ভাষায় । মা ফরিদা বানুর শারীরিক অবস্থা ভালো নয় । বাঁচার আশা নেই বলে ডাক্তার ফিরিয়ে দিয়েছেন , গায়ে প্রচন্ড জ্বর বইছে । হারানো মেয়েকে ফিরে পেয়ে এক নিমিষে সম্পূর্ণ সুস্থ অনুভব করে ফরিদা বানু । মেয়ের সঙ্গে মন খুলে প্রায় মধ্য রাত পর্যন্ত গল্প করে ।
ফরিদা বানু বলে – “মা তোর পেয়ে যে আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছি দেখ । কত জ্বর ছিল আমার গায়ে সব সেরে গেছে । এখন গরম
লাগছে আমার মাথার কাছে জানালাটা খুলে দিয়ে তোরা গিয়ে সব শুয়ে পড় , রাত প্রায় একটা বাজে । সরিফান জানালা খুলে পাশের তক্তাপসে মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে । ফজরের আজান শুনে ঘুম ভাঙ্গে । মা ..মা…বলে সরিফান ডাক দেয় মা আর সাড়া দেয় না ।
কাছে গিয়ে দেখে , মাথার কাছে উন্মুক্ত জানালা থেকে ওপাশের ফুটন্ত বকুল ফুল গুলো উড়ে এসে ছড়িয়ে পড়েছে মার সারা দেহে । মনে হয় কেউ ছড়িয়ে দিয়ে গেছে তার দেহের উপর । জানালা থেকে মিঠে রোদের আলো এসে স্পর্শ করেছে মার মুখ । ভোরের শান্ত স্নিগ্ধ বাতাসের ছোঁয়ায় এলোমেলো চুল গুলো উড়ছে প্রশান্তির বাতাসে । যেন পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে মার স্পন্দনহীন দেহ… ।