Friday, May 27, 2022

তৃতীয় সংখ্যা,27May2022












সে আসছে মোহাম্মদ আতিকুল ইসলাম

 সে আসছে
মোহাম্মদ আতিকুল ইসলাম


“১”
কতক্ষণ জ্ঞান ছিলো না, আমার জানা নেই।
কেউ আমাকে রাস্তার পাশে বুনো জঙ্গলে ফেলে রেখে গেছে। জায়গাটা স্যাঁতস্যাঁতে, বুনো ঘাস ও বুনো ফুলের ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে আসছে। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শোনা যাচ্ছে ঝিঁঝিঁ পোকার বিরামবিহীন ডাক।
যতদূর মনে পরে, প্রতিদিনের মতো সেদিনও কলেজ শেষ করে টিউশনি করতে যাই। ছাত্রী পড়িয়ে বের হতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। কয়েকদিন পর ছাত্রীর ফাইনাল পরীক্ষা। আর এ কারনে এখন কিছুটা বেশী সময় দেয়ার চেষ্টা করি। আমার বাড়ি গ্রামে। শহর থেকে একটু দুরেই। প্রথমে বাসে করে প্রায় ৬ কিলোমটার গিয়ে নামতে হয় নতুনগঞ্জ বাস স্ট্যান্ডে। সেই বাস স্ট্যান্ড থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার ভিতরে আমাদের বাড়ি, রিক্সায় যেতে হয়। আজ পৌঁছাতে রাত আটটা বেঁজে যাবে নিশ্চিত।এমনটা হলে আম্মুকে ফোন করে জানিয়ে দেই, না হলে বড্ড দুশ্চিন্তা করে আম্মু। এবং বাড়িতে না ফেরা পর্যন্ত তা চলতেই থাকবে সেই দুশ্চিন্তা।
বলে নেয়া ভাল, আমি আবার একটু সিরিয়াস টাইপের মেয়ে। অবশ্য সিরিয়াস না বলে একটু বেশীমাত্রায় দায়িত্বশীল বলাটাই শ্রেয়তর। অবশ্য দুষ্টুজনেরা সিরিয়াস তকমাটা লাগিয়ে দিয়েছে। কেউ আরো দুই এক ডিগ্রি সরেস, তারা বলে আমি নাকি রোবোটিক।
বলতে থাক তোরা। আমার কিছু যায় আসে না। আব্বু বেঁচে নেই। আম্মু প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা। বাসায় বুড়ী দাদী রয়েছে। আমি সবার বড়। আমার ছোট আরো দুজন ভাই বোন আছে। তাই আম্মুকে কিছুটা সাহায্য করি। যতোটা পারি নিজের খরচ, নিজেই আয় করে চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করি।
যা বলছিলাম, আমাকে রোবোটিক বললেও আমি খুব একটা মাইন্ড করি না। কারণ জানি আমি যথেষ্ট জলি মাইণ্ডের, সাথে সেন্স অফ হিউমারও বেশ ভাল আর সেই সাথে খুবই মিশুক। বন্ধু মহলে ও বাড়িতে হি হা হু হু করেই সময় পার করে দেই। তাই ওদের গুজবে কান দেই না। কারণ ওরা পাত্তা না পেয়েই এমনটা করে থাকে।
আমি শুধু জলি মনের মেয়ে নই, যথেষ্ট সুন্দরীও বটে।
কি ভাবছেন, গাল গপ্পো করছি? শুধু সুন্দরী বললেও ভুল হবে, বলা উচিত আগুন ঝরা সুন্দরী। আপনারা যাকে স্ট্যাটিসটিক্স বলেন, কি লজ্জা পেলেন- ওটাও বেশ পারফেক্ট। আর আমি জানি কোন পোশাকে এটা আরো ভালো দেখায়। বলতে পারেন, গ্রামে থাকলেও এদিকে যথেষ্ট স্মার্ট।
থাক এ কথা। এটা না হয় অন্য আরেকদিন বলা যাবে। বর্তমান কথা হচ্ছে আমার খুব ক্ষুধা লেগেছে। জানি না কতক্ষণ এখানে পড়ে ছিলাম। শরীরে প্রচন্ড ব্যাথা। আমার মাথাটা.........!!!
কিন্তু এ কী? আমার মাথা কই? আমি মাথা খুঁজে পাচ্ছি না। হাত দিতেই, মাথার ওই জায়গায় থিকথিকে কিছুর স্পর্ষ পেলাম, রক্ত নাকি? ধাতস্ত হতে সময় লাগবে একটু। মনে হচ্ছে আমি এখন স্কন্ধ কাটা। ছোট বেলা থেকে এদের গল্প অনেক শুনেছি। অতিপ্রাকৃত চরিত্র হিসেবেই এদের মেনে নিয়েছি। কখন বিশ্বাস করি নি। অতিপ্রাকৃত ঘটনাতেই কখনো বিশ্বাস ছিল না। কিন্তু নিজেই এখন অতিপ্রাকৃত চরিত্র, বুঝতে পারছি না। কি করা উচিত? আমার ক্ষুধা লেগেছে প্রচন্ড, সুতরাঙ তত্ব র্চচা করে লাভ নেই।
“কিন্তু কী খাব?”
“তার থেকেও মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন কিভাবে খাব?”
“কোথায় খাবার পাব? কী পরিমাণে পাব এবং কখন কিভাবে পাব?”
“খাবার কি কিনতে হবে? বিনিময় মুদ্রা কী? কিনেই যদি খেতে হয়, তাহলে আর্থিক অবস্থাটাই বা কী ?” অনেক কিছু জানতে হবে। আমারতো মুখও নেই। কিযে ব্যারা চ্যারা অবস্থা। হঠাৎই একটু আলোর দিশা পেলাম। একটু গুগলিং করলেই পাওয়া যাবে।সো নো চিন্তা ডু ফুর্তি। দেখা যেতে পারে ফুড পান্ডাকে বললে হোম ডেলিভারি দিতেও পারে।
“কিন্তু ঠিকানা কী দিব?”
সে পরেও ভাবা যাবে। আগে জানতে হবে কী খেতে হবে? আর কিভাবে খেতে হবে? মোবাইলটা বের করি। ব্যাগেইতো রেখেছিলাম। কিন্তু ব্যাগ কই। মোবাইলইবা গেলো কই। আর আমি এখানেই বা কেন?
“আমি কি ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছিলাম?”
“নাকি অন্য কিছু?”
সারা শরীরে ব্যাথা, বিশেষ করে দুই উরুর সন্ধিস্থলে প্রচন্ড ব্যাথা। পরনের জামাটিও ছিড়ে গ্যাছে অনেক জায়গায়। ওড়নাটি খুঁজে পাচ্ছি না।
গাড় অন্ধকার, কিছুদূরের হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি চলে যাচ্ছে।গাড়িগুলির হেডলাইটের আলো যেনো আধিভৌতিকই করে ফেলেছে।
“কী অদ্ভূত, আলোটাকেই কেন ভৌতিক মনে হচ্ছে?”
মাথা নেই, চোখ নেই। “তবে আমি ভাবছি কী করে?” লম্বা মানুষের নাকি হাঁটুতে বুদ্ধি থাকে। হতেও পারে। আমার হাইট পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি ছিল। বাঙ্গালী মেয়ে হিসেবে যথেষ্টই লম্বা, “কি বলেন?” হাঁটুতে ছটাক খানেক বুদ্ধি থাকলেও থাকতে পারে।
“কিন্তু কিভাবে দেখছি?”
ওমা!!! আপনারা, সত্যিই বিশ্বাস করছেন, আমার হাঁটুতে বুদ্ধি। কি বোকা আপনারা!!! অতৃপ্ত আত্মাদের আপনাদের জৈবিক আকার দিয়ে ভুল ব্যাখ্যা করতে যাবেন না। আমাদের কাছে এই আকারের খুব একটা মূল্য নেই।
জায়গাটা বিশ্রী, শরীরের অনেক স্থানে চুলকাচ্ছে। এখান থেকে উঠা যাক। রাতটাও গভীর হয়েছে। চারদিকে শুনসান নিরবতা। অবশ্য হাইওয়ে দিয়ে চলে যাওয়া গাড়ি অবশ্য থেকে থেমে সেই নিরবতা ভেঙ্গে দিচ্ছে। গ্রামে বিদ্যুৎ থাকলেও রাস্তায় শহরের মতো স্ট্রিট লাইটিং নেই। সে অর্থে আমার চলাফেরার জন্য চমৎকার পরিবেশ আছে।ভুতুরে বৈদ্যুতিক আলোর ছড়াছড়ি নেই।
“আচ্ছা এখন কি জিজ্ঞেস করার জন্য কি কাউকেই পাওয়া যাবে?” গ্রামের অনেকেই অতিপ্রাকৃত বিষয়ে বেশ ধারণা রাখে। দেখা যাক না জিজ্ঞেস করে,
“আমার খানা কী?”
“কিভাবে খাব? কোথায় গেলে খানা পাব?”
কবি সুকান্তের ভাষায়,“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়,পূর্ণিমার চাঁদ যেনো ঝলসানো রুটি।”
আমার চিন্তা ভাবনাটা পুরোটাই ক্ষুধা কেন্দ্রিক। অন্য সবকিছুই এখন মূল্যহীন মনে হচ্ছে।
কিন্তু আমার কাছে পূর্ণিমার সৌন্দর্যের কোন মূল্য নেই। অমাবস্যাকেই বেশী মোহনীয় মনে হচ্ছে আমার কাছে। স্কন্ধকাটা আর মনুষ্য প্রভেদ বের করতে আমাকেতো রীতিমতো থিসিস করতে হবে।
উফফ, স্কন্ধ জীবনেও পড়ালেখা!!!
“এদের সিলেবাসটা কী?”
“কিভাবে মানুষকে ভয় দেখাতে হয়?”
“মানুষ ভক্ষণের রীতিনীতি, এরকম কিছু?”
“এদের মাঝেও কী ডাক্তার, প্রকৌশলী, লেখক, গায়ক, অভিনেতা, চিত্রকর আছে?” কিন্তু আমাদের মাথাইতো নেই।
দুষ্টু মাথা থাকার চেয়ে না থাকাটাই শ্রেয়তর।
“কি বলেন?”
“এরা মাথা খাটায় কী করে?”
ধুর, আমিই তো বলেছিলাম, অতিপ্রাকৃত চরিত্রকে জৈবিক আকার দিয়ে বিশ্লেষণ করাটা বোকামি। আমি স্কন্ধ কাটা হিসেবে এখনো পুরোপুরি মানিয়ে উঠতে পারি নি। সেই মিষ্টি মেয়েটিই রয়ে গেছি যেন।যে কি না আম্মুর বুকে মাথা রেখে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী প্রশান্তি পেয়ে থাকে।
জায়গাটা আমি চিনতে পেরেছি। ক্যানাল, আমার এক বন্ধুর বাসা এদিকে। আমার আজকের গল্পটা ওকে বলেছিলাম। ওইতো গল্পটা লিখছে। ক্যানাল যেটাকে বলা হয়, তাকে বঙ্গানুবাদ করে খাল করতে যাবেন না। এটা আদতে উঁচু একটা বাঁধ,বন্যার প্রকোপ থেকে রক্ষার জন্যে পাকিস্থান আমলে বাঁধটি নির্মান করা হয়েছিল। তবে এই অদ্ভুত নামটি কেন হলো গ্রামের লোক সেটা বলতে পারে না।
ক্যানালের এদিকটায় খুব একটা বসতি নেই। দুপাশ ঘনগাছে ছাওয়া। আমার কাছে মনে হচ্ছে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে অজস্র প্রহরী। আমার ভয় যে কোথায় দৌড়ে পালালো, ঠিক বুঝতে পারলাম না। এর থেকেও বড় কথা, আমার মধ্য ভয় নামক কোন বস্তুর অস্তিত্ব আছে কি?
অবশ্য আমি কিছুটা ভীতু ছিলাম, আম্মুকে ছাড়া কখনো রাতে একা বের হয়নি। খুব কষ্ট হচ্ছে, আম্মুটা একা কী করছে, কে জানে? আমাকে না পেয়ে তারতো পাগলপ্রায় হয়ে যাবার কথা। কিন্তু এভাবে আম্মুর সামনে দাঁড়াই কী করে?একটা দীর্ঘস্বাস বের হয়ে আসে নিজের অজান্তেই।
হাঁটতে হাঁটতে চৌরাস্তার মোড়ে পৌঁছে গিয়েছি।এর একটা রাস্তা পাশের দুটি গ্রামকে সংযুক্ত করেছে। আর উত্তরের রাস্তাটি গিয়েছে বাস্টপের দিকে। এখানে কিছু দোকান পাট থাকলেও সবগুলিই এখন বন্ধ। রাতটা আসলেই অনেক গভীর। কোন জনমানব নেই। হঠাৎ একটা শব্দ শুনতেই ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেলাম। বাহ বেশতো। আমি সহজেই ঘুরিয়ে ফেলতে পারি শরীরকে। কোন ভাঁজও পরে নি। জয়তু স্কন্ধ জীবন। আর আমি যে এতোক্ষণ পিছনের দিকে হেঁটে আসছিলাম, খেয়ালই করি নি।একটা কালো বিড়াল আমাকে দেখে দৌড়ে পালিয়ে গেল। ভয় পেয়েছে। পাশার দান উল্টে গেছে দেখছি। কাল্লু বিড়ালও আমায় দেখে ভয়ে পালায়!!!! হা হা আনমনেই হেসে উঠলাম।
“পুরো উলটোদিকে ঘুরে যাওয়ায় এখন কি আমাকে বড্ড বিশ্রী লাগছে?”
“কিম্বা বেশী ভয়ংকর কিছু?”
মাথা নেই, স্তন আর নিতম্ব দুটোও সামনের দিকে। কী করবো? আমার চোখ যে ঘাড়ে। আর এই যে আপনারা পুরুষরা, এ দুটোইতো দৃষ্টি দিয়ে গিলে ফেলতো চান। এখন দুটোই একসাথে দেখতে পাবেন- স্তন আর নিতম্ব।
“কি ভালো না?”
 আরো বেশী সেক্সি মনে হওয়া উচিত, “কি বলেন?” পুরুষদের চোখতো সবসময়ই এর জন্য ছোক ছোক করে। সেটা কিশোর (যার গোঁফও গজায় নি) থেকে শুরু করে হাড় জিরজিরে বুড়ো সবাই।
ওমা, লজ্জায় দেখি আপনি লাল হয়ে গেছেন। আপনি পুরুষ- গুল্টু বাবু একটা, ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানেন না। ক্যানাল পেড়িয়ে কিছুটা উত্তরে গেলে বাপাশে একটা জেলে পাড়া পরল। “আমি কি পাড়াটিতে ঢুকব?” কেউ হয়তোবা সাহায্য করতেও পারে। নাহ,যাওয়াটা ঠিক হবে না। ছোট ছোট বাচ্চারা ভয় পেতে পারে। বরং সামনের দিকে কিছুটা এগোই। একটু হেঁটে গেলেই বাসস্টপ। ওখানে কিছু লোকজন পাওয়া যেতেও পারে।
জেলে পারা ছেরে বড় পুকুরটা যখন পার হয়েছি, তখন দূরে কিছু একটা আসতে দেখলাম। ছোট্ট খাট্ট গোলাকার ফুটবলের মতো গোলাকার বিশাল বপুর একজনকে এগিয়ে আসতে দেখছি। দেখি কিছু বলতে পারে কী না? ভদ্রলোকের মনে হয় বড্ড তারা। হন হন করে হেঁটে আসছে এদিকে।
কথা বলার জন্য যখনই প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখনই ওবাবাগো, ওমাগো বলে জ্ঞান হারালো। ধুস শালা, একটা মানুষ পেলাম, সেও কিছু বলার আগেই ঠুস। জ্ঞান নেই, কোন মানে হয়? এই ডিজিটাল যুগেও মানুষ যে কেন অতিপ্রাকৃত বিষয়ে এতো ভয় পায়? আমিইতো, সেই লক্ষ্মী মেয়ে।যে কিনা সামান্য রক্ত দেখলেই জ্ঞান হারাতাম।
“কয়লা ধুলে কি ময়লা যায়?”
“তো চাইলেই কি আমার চরিত্র চেঞ্জ করে ফেলতে পারব?” বোকা মানুষ, কেন যে বুঝতে চায় না। ধুর, উপকার তো হলোই না, বরং সমগ্র এলাকায় রটে যাবে এলাকায় একটা স্কন্ধ কাটা এসেছে। এবং আমি তাকে কিভাবে ভয় দেখিয়েছি তা নিয়ে আষাঢ়ে গল্প।
এদিকে প্রচন্ড ক্ষুধা, তীব্রতা যে বেড়েই চলছে।
“কী যে করি?”
“আচ্ছা আপনার জানা শোনা কোন স্কন্ধ কাটা আছে কি?” পাঠিয়ে দিন না আমার কাছে, আমার বড্ড উপকার হয়। আরো কিছুদুর এগোতেই আরো একটা মোড় পেলাম। রাস্তার পাশের বাসা থেকে আলো এসে কেমন যেন ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। রাস্তায় কয়েকটা কুকুর ছিল।আমাকে দেখেই কিউ কিউ করে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেলো।
“আমি কি এতোটাই বিভৎস?” একটা আয়নায় দেখতে পারলে বেশ লাগতো ।
এই রাস্তা দিয়ে হাঁটতে ভালো লাগছে এখানে অনেক বেশী, বাঁশ ঝারের কারনে অন্ধকার কিছুটা গাড় এখানে। পরিবেশটা তাই অনন্য, অনেক বেশী মোহনীয়। এগুতে থাকি সামনের দিকে।
“আচ্ছা দিনে আমি কোথায় থাকবো?”
“সুর্যের ভুতুরে আলো সহ্য করব কী করে?”
অবশেষে বাসস্টপে কাছাকাছি এলাম। কিন্তু বেশীমাত্রায় ভৌতিক আলোর ছড়াছড়িতে ওদিক দিয়ে পেরুনোর সাহস পেলাম না। তার মানে হচ্ছে, ভয় নামক বস্তু এখনো আমার মাঝে আছে। আলো এক প্রকার শক্তি। আর অন্ধকার আলোর অনুপস্থিতির মাত্রা।
“তাই কি? তাহলে, মনুষ্য জীবনের অনুপস্থিতিই কি স্কন্ধ কাটা জীবন, নাকি বোকা একটা তত্ব দিয়ে বসলাম?” তবে আর ভাবতে ইচ্ছে হচ্ছে না, প্রথম দিন হিসেবে চাপটা বড্ড বেশী হয়ে যায়।
আমি দোকানগুলির পিছনের অন্ধকার দিয়ে মহাসড়ককে কিছুটা দূরে রেখে ঢাকার দিকে হাঁটতে থাকলাম। কিছুদুর এগুনোর পরই মিষ্টি একটা খাবারের গন্ধে আমি মোহাবিষ্ট হয়ে গেলাম।অদ্ভুত সুন্দর একটা ঘ্রান। সত্যি বলতে খাবারের এতো চমৎকার সুঘ্রান আমি আমার মনুষ্য জীবনেও পাই নি। ক্ষুধাটা আরো বেশী চেগিয়ে উঠলো। আমি অন্ধের মতো ব্রিজের দিকে ছুটে চললাম। গন্ধটা আমি ওখান থেকেই পাচ্ছি, এখান থেকে প্রায় দুকিলোমিটার দূরে। আমি প্রায় উড়ে চললাম খাবারের দিকে। ক্ষিধেটা যে বড্ড জ্বালাচ্ছে।
“২”
মহাসড়কের ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে জল বিয়োগ করছে দুজন।কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে তাদের আরো দুজন সঙ্গী। রাত প্রায় একটা, মানুষজনের চলাচল প্রায় নেই বললেই চলে। গাড় অন্ধকারে এদের কোন ভয় নেই। বুক চেতিয়ে নির্ভীক ওরা আছে, সংখ্যায় চার। তবে এর থেকেও বড় কথা, ওরা পুরুষ। জন্ম সুত্রেই পেয়েছে শাসন করার অধিকার। প্রত্যেকের রয়েছে একটা করে রাজদন্ড। রাজদন্ডই ওদেরর পুরুষত্বের মুল দম্ভ। পরাশক্তির মুল উৎস।
রাফি এখন তার রাজদন্ডে মুক্ত আকাশে, এই ব্রিজে দাঁড়িয়ে একটু আলো বাতাস খাওয়ানো খাওয়াচ্ছে, মুক্ত আকাশে জলবিয়োগ। ফুসে উঠা এই সাপকে বসে আনতে তারা গ্যাং রেপ করেছে। ক্রুর হাসি ফুটে উঠল রাফির ঠোঁটে। জটিল মাস্তি করেছে। ধর্ষণ শেষে গলা কেটে ক্যানেলের পাশে ফেলে রেখেছে। কাক পক্ষিও টের পায় নি। আর চাইলেও চিনতে পারবে না। মাথাটা ফেলে দিয়েছে এই কালীগঙ্গায়।
তবে মনটা হঠাৎ খচ করে উঠল, ছিন্নভিন্ন কিছু পোষাক পড়নে রয়ে গেছে। এটাই না শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য কাল হয়ে উঠে।
“এই ভুলটা কী করে করল?”
রেপ করে তাকে পোষাক পড়তে দেয় তারা। খুব অনুনয়-বিনয় করছিল প্রানটা ভিক্ষা দেয়ার জন্যে। হয়তো চলে যেতে দিতো, কিন্তু রাফির মাথায় খেলা করল অন্যে এক সন্দেহ। এই মেয়ে চলে গেলে তাদের ফাঁসাবে। কঠিন ধাতের মেয়ে, সুযোগ পেলেই ছোবল মারবে।
তার হাতে চলে আসে কারুকার্য খচিত ছোরাটি। পিছন থেকে গিয়ে পোচ দিয়ে গলাটি নামিয়ে দেয়। ফিনকি দিয়ে বের হওয়া রক্তে ভেসে যায় সমস্ত শরীর। ছটফট করতে করত্র নিস্তেজ হয়ে যায় অবশেষে। পৈশাচিক হাসি দেখা যায় চারজনের ঠোঁটের কোনে। এখন খালটা পেড়িয়ে ক্যানালের পাশে বুনো ঝোপে ফেলে রাখলে কেউ টের পাবে না। সন্ধ্যার পর এদিকটায় কেউ আসে না। দিনেও খুব একটা মানুষজন এদিকে আসতে চায় না।
খুন করার পর থেকেই অদ্ভুত এক রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে রাফির। সুযোগ পেলেই ছুরিটা বের করে ঘুরাতে থাকে। এটা করলে নিজেকে হিরো হিরো লাগে। আজও জলবিয়োগ করার সময়ও ছোরাটা বের করে আনমনে ঘুরাতে থাকল রাফি। পাশেই দাড়িঁয়ে জল বিয়োগ করছে বদরুল। সে বলে উঠলো, “ভোদাই, আলগা পাঠ নেওয়া বাদ দেও। হাত থেকে ছোরা খসে পরলে তোর ওইটাও খইসা পরব। তখন শালা হিজরা হইয়া পাঠ নিতে হইব,” কথা শুনে খিক খিক করে হেসে উঠল দুলাল আর কামাল।
আমি ওই খচ্চর দুইটার মাঝে গিয়ে বসলাম। ওরা অবশ্য টের পায়নি এখনো, মনের সুখে গান গাইছে আর জলবিয়োগ করছে। ত্যাগেই সুখ। সুখে অবগাহন করতে থাক সোনারা। এখনই টের পাবে, আমি কে?
হেটলাইটের আলো দেখা যাচ্ছে, ব্রিজটা কেঁপে কেঁপে উঠছে কিছুটা। এক সাথে চলে আসছে কতগুলি নাইট কোচ আর ট্রাক। আলো এসে পরল আমার উপর, আমাকে দেখতে পেয়েছে এবার। ভয়ে স্থির গেছে চারজনই। যেনো জলজ্যান্ত চারটে স্ট্যাচু। ভয় পাবারই কথা। স্কন্ধ কাটা দেখে আনন্দ পাবার কিছু নেই। এর থেকেও বড় কথা,ওরাই আমাকে রেপ করে মেড়ে ফেলেছে। ভয়, তাই একটু বেশীই।
রাফির দিকে ঘুরে তাকাতেই ওর হাত থেকে ছোরাটা পরে গিয়ে ওর রাজদন্ডটা গোরা থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে গেলো নদীতে। জলের পরিবর্তে রক্তের ফোয়ারা বইতে লাগল। তীব্র যন্ত্রনায় চিৎকার দিয়ে উঠলো রাফি।উফফ কি যে পৈশাচিক আনন্দ লাগছে আমার, ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না।
আমি খপ করে ছোরাটা ধরেই ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেলাম। স্কন্ধ কাটা হওয়ায় এই এক বিশেষ সুবিধা হয়েছে। আমার ঘাড়ে যে চোখ আছে, গাধারাতো সেটা জানে না।
এবার বদরুলের দিকে তাকালাম, ভয়ে জলবিয়োগ থেমে গেছে। কিছু বোঝার আগেই ওর রাজদন্ডটাকেও শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলাম। একই রকম অমানুষিক চিৎকার করে উঠলো বদরুল।
আমি ভয়ংকর কন্ঠে (আমি নিজেই ইম্প্রেসড, এতোটা ভয়ংকর হবে আমি নিজেই বুঝতে পারি নি) বলে উঠলাম, “তোদের রাজদণ্ড কালীগঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে দিলাম, মাছের খাবার হবে কি বলিস?”
“তোরা আজ থেকে মুক্ত, চেতনাদন্ডের চাপে তোদের আর কোন মেয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পরতে হবে না,” গা হিম করা পৈশাচিক হাসি দিয়ে তাকিয়ে রইলাম তাদের দিকে। এবার দুলাল আর কামালের দিকে তাকালাম। ভয়ে দুজনেই কাপড় নষ্ট করে ফেলেছে। দেখে আনন্দে পৈশাচিক হাসি দিয়ে বললাম, “কিরে কাপড় নষ্ট করে ফেলেছিস? শোন এদের নিয়ে হাসপাতালে যা। হাসপাতালে ভর্তি করে সোজা চলে যাবি থানায়। ওখানে গিয়ে সব স্বীকার করবি। না হলে তোদের ওটাও শরীর থেকে আলাদা করে ফেলবো।”
বাধ্য ছেলের মতো ওরা রাফি আর বদরুলকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে রওনা হোল। পিছন দিক থেকে ডাক দিলাম, “শোন কামাল আর দুলাইল্যা, ভুলেও দন্ড বের করে হিসু করতে যেও না। তাহলে তোদের বন্ধুদের মতো একই পরিনতি হবে,” আবারো হি হি করে গা জ্বালানো একটা পৈশাচিক হাসি দিলাম। এখনো ওরা ভয়ে থর থর করে কাঁপছে। ওদের প্রতি কি মায়া করা উচিত?
ধুর, গোল্লায় যাক।
তৃপ্তির একটা ঢেকুর দিলাম। আমার পেট ভরে গেছে। একটু বেশীই খেয়ে ফেলেছি। এখন বুঝতে পারছি, কোন জৈবিক খাবারে আমার ক্ষুধা মিটবে না। ওদের ধর্ষণ যন্ত্র বিচ্ছিন্ন করার সময় ওরা যে যন্ত্রণায় চিৎকার করছিলো, ওটাই আমার খাবার। বাকী দুজন ধর্ষক ভয়ে কাঁপছিল, ওটা ছিল চাটনি।
আগামী তিন দিন কিছু না খেলেও চলবে। এর পর প্রথমে দুলালের যন্ত্র বিসর্যন করবো এই নাইফটা দিয়ে। একদিন পর কামালেরটা। আমি আবার সিরিয়াল মেইনটেইন করতে পছন্দ করি। সিরিয়াস বলে একটা তকমা পেয়েছিলাম, এই জীবনেও তার মায়া ছাড়তে পারলাম না।
আফসোছ।
“কিন্তু ভাবছেন, ওরা চারজন শেষ হয়ে গেলে আমি খাবার পাব কই?”
চিন্তার কারন নেই, গোপনে প্রকাশ্যে অনেক ধর্ষক ঘুরে বেড়াচ্ছে চারপাশে। সংখ্যায় কত? হাজার, লক্ষ নাকী কোটি? সব হায়েনার দল, সুযোগ পেলেই নষ্ট করে দেয় একটি নারীর সুন্দর জীবন।
এখন তোদের পালা। সময় এসেছে মূল্য বুঝিয়ে দেয়ার।
“হ্যা তুইই বলছি, ঠিকই শুনেছিস।”
নরকের কীট, তোরাতো এই “তুই” এরও যোগ্য নস। আর সে তোরা যে বয়সেরই হয়ে থাকিস না কেনো, তোদের এর থেকে খারাপ কিছু থাকলে সেভাবেই সম্মোধন করতাম। তোরা মানুষ সমাজের কলংক।
একে একে শেষ করে দিবো সব ধর্ষকদের। বিনাশ করে দিবো, ধর্ষকের ভিতরে লুকিয়ে থাকা পিশাচকে। সারাটা জীবন অনুশোচনা করেও মুক্তি নেই, মূল্য হবে পৈশাচিকতার। সৌভাগ্য হচ্ছে, বীর্য স্থলনের জন্য কামুক কুকুরের ন্যায় রাস্তায় ঘুরেতে হবে না আর।
যৌবনের জ্বালার চিরদিনের মুক্তি।
অতএব, সাধু সাবধান।
আমি আসছি।
(সমাপ্ত)





কালবৈশাখী পিয়াস শুভ্র নাগ

কালবৈশাখী
পিয়াস শুভ্র নাগ 

তোমার কালো বিনুনিতে,
আমার আঁখি জুড়ায়,
তোমার প্রেমের শীতল স্পর্শে,
আমার মন কে ভেজায়। 

শৈশবে তুমি আসতে যখন,
স্নেহের আঁচল মেলে ধরে,
আমরা তখন ছুট্টে ছাদে,
টপাটপ শিল খেতাম ভরে। 

কখনো আবার তোমার রোষে,
গরীবের ঘর আর স্বপ্ন মোছে,
পরন্ত বেলার অভিমানের রঙে,
আম লিচুদের মুকুল ঘোচে। 

তবুও তোমার আসার আশায়,
অগ্নিবানের তৃষ্ণা দেখি,
তোমাকে শরীরে মাখবে বলে,
আবাল বৃদ্ধের স্বপ্ন আঁকি। 

প্রেয়সীর ওই কোমল আদর,
মিষ্টি মুখে, দুষ্টু আঁখি,
লাস্য ভরা সন্ধ্যা বাসর,
এসো চঞ্চলা কালবৈশাখী।

পিয়াস শুভ্র নাগ











এমন একজন সীমান্ত কুমার রায়

এমন একজন 
সীমান্ত কুমার রায় 

আজকাল খুঁজে মেলা ভার 
এমনও একজন, 
যে কিনা তার চাহিদা কে দমন করে -
ব্যক্তিসত্বাকে বিলিয়ে দিতে পারে ,
একলহমায়, কারও প্রয়োজনে।
আছেন কি তিনি কষ্ট লাঘবের কাণ্ডারী?
এই স্বার্থের শহরে আমি ও আমরা সবাই 
অন্যের লোভ-লালসার সদা চরিত্রায়ন করলেও 
নিজেও যে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ ও পরাভূত!
মননের যুপকাষ্ঠে প্রয়োজনকে চেপে রেখে -
অপরকে মিথ্যের সম্মোহনী ডাক দিয়ে যাই প্রতিবার।
তথাপি মোহিত না হলে আস্ফালনে, 
নতুবা করুনাদ্র হয়ে -
লালায়িত করতে চাই কুটুম্বিতার মধুরতায়।
আন্তরিক অন্তরঙ্গতা আজ পরজীবী হয়ে, 
পোষিত অন্যের দেহরসে।
খুঁজেও পেলামনা তাকে, 
হয়তো রয়ে গেলো দৃষ্টির বাইরে! 




সীমান্ত কুমার রায়,
স্কূল ম্যাগাজিনে প্রথম লেখা,
পত্রিকায়,ই-ম্যাগাজিনে নিয়মিত লেখালেখি ।
পেশাগত ভাবে শিক্ষকতা র সাথে যুক্ত।






















ব্রম্হজ্ঞানী মোহনা ব্যানার্জী

  ব্রম্হজ্ঞানী 
মোহনা  ব্যানার্জী 

অন্ধকারের কারা থেকে 
যখন তুমি মুক্তি দিলে ;
সেই ক্ষণেতে তুমি প্রভু 
জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়ে ছিলে ;
সেই আলো তে সত্যখানি ,
করি হে  দর্শন ;
মিথ্যার এই খোলস ছেড়ে ,
সত্য কে  করি আলিঙ্গন ;
সর্ব কালের সেরার সেরা ,
দম্ভ হীনা সত্য ;
তোমার জ্যোতি তে আলোকিত ,
সকল নরক মর্ত্য;
সবলতার সুরে গাঁথা ,
সত্য বাণী শুনি ;
তোমার  চরণে আশ্রিত বিশ্ব,
হে  ব্রম্হজ্ঞানী || 



সংক্ষিপ্ত রাস লীলা সুজিত কুমার রায়

সংক্ষিপ্ত রাস লীলা 
সুজিত কুমার রায় 

এক ফালি আকাশ, সুগন্ধি বাতাস -
মর্ত্যলোকে বহিতেছে সুবাস।
চাঁদের আলোর, ওই নীল আভা,
নীল যমুনার জলে পড়ে তার ছায়া।
জোনাকি রা নিজ সাজে -
চাঁদের আলোয় আনন্দে মাতে।
নক্ষত্র গ্রহ তারা উদাস হয়ে রয়,
ঘন কলরবে দেবগন রাস সাজায়।
শারদ চন্দ্রের সাথে -
মল্লিকা যুথীকা মিলি , 
উপহার দিচ্ছে , ভরি পুষ্পাঞ্জলি ।
অষ্ট সখীদের শিরোমণি কানাই, মত্ত
রাস মঞ্চে উদ্ঘট্টা তালে নৃত্যে,
সাথে সখী গন আর তার প্রিয় রাই।
পরম পুরুষ আনন্দে মাতে ---
আহ্লাদী রাধা আছে তার সাথে,
মর্তলোকে করলো এক লীলা
নিস্কাম প্রেমের অপূর্ব খেলা।


সুজিত কুমার রায় 









Thursday, May 19, 2022

উপহাসের কুয়াশা , শেখ শোভন আহমেদ

উপহাসের কুয়াশা 

শেখ শোভন আহমেদ




লালনার মায়া সেই 
স্মৃতিতে ,আজও মিশ্রিত
ভালোবাসা ধরণীর বুকে -
ক্ষণিক মাত্র অমৃত  ।
জীবন নামের গণিতের,সূত্র যোগে
আর বিধির করা বিয়োগে
থমকে দাঁড়ায় পরিশেষে
ভালোবাসা, যায় নিয়তির জলে ভেসে। 

নিঃশ্বাস আশ্বাস আর বিশ্বাস
এক কথায় ভরসা নেই,
ভরসা করেছে যেই
আজ নিরবে কাঁদছে। সেই
ভালোবাসার আগ্নেয়গিরে
জীবন করে শেষ
তবুও স্মৃতি এ বুকেই থাকে 
    অফুরন্তহীন বেশ। 

ভালোবাসা পরিসংখ্যান
করে ,নিয়তি ধোঁয়াশা
হতাশার মাঝেও উঁকি দেয়
   উপহাসের কুয়াশা।



সংখ্যা ২ // 20May2022

SA












শিল্পে বিমূর্ত ধারণা তন্ময় বিশ্বাস

শিল্পে বিমূর্ত ধারণা
তন্ময় বিশ্বাস 


19 শতকের শেষের দিকে পশ্চিমা  শিল্পীরা অনুভব করেছিলেন নতুন ধরনের শিল্প তৈরি করার । যা প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও দর্শনে ঘটে যাওয়া মৌলিক পরিবর্তনগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করবে।  যে উৎসগুলি  থেকে শিল্পীরা তাদের তাত্ত্বিক যুক্তিগুলি আঁকেন তা ছিল বৈচিত্র্যময়। 
তিনটি বিষয় যা বিমূর্ত শিল্পের বিকাশে অবদান রেখেছিল তা হল রোমান্টিসিজম, ইমপ্রেশনিজম এবং এক্সপ্রেশনিজম।  শিল্পীদের জন্য শৈল্পিক স্বাধীনতা 19 শতকে উন্নত হয়েছিল।  

   বিমূর্ততা শিল্পে, চিত্রের চিত্রণে বাস্তবতা কে প্রস্থান নির্দেশ করে।  সঠিক উপস্থাপনা থেকে এই প্রস্থান সামান্য, আংশিক বা সম্পূর্ণ হতে পারে।  এখানে সাধারণত বিভিন্ন রং,বা বিভিন্ন জ্যামিতিক চিত্র প্রভৃতির মাধ্যমে একটি চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয় যা কোনো একটি বিষয় কে নির্দেশ করে কিন্তু প্রকট ভাবে প্রকাশ করে না। 

তবে বিমূর্ত চিন্তা যেমন ১৯শতকে বিদেশে দেখা গিয়ে ছিলো তার বহু আগে ভারতবর্ষে এর প্রকাশ দেখা যায় ।
তবে এই শিল্প একটু অন্য রকমের।
এই ত্বত্তের প্রথম পরিচয় ঘটে লালনের গানে।
""আমার মনের মানুষের ই সনে।
মিলন হবে কত দিনে।।" 

এখানে "মনের মানুষ " ধারণা টি বিমূর্ত ধারণা।যেখানে সীমা ও অসীমের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই।
ক্ষণস্থায়ী নশ্বর দেহে স্থায়ী সাধন ফল পাওয়ার যে সাধনা । এবং মনের মানুষ অর্থাৎ "আলোক সাঁই"  অর্থাৎ "অলক্ষ্য স্বামী"।
আর এই "আলোক সাঁই" এর সমার্থক হিসাবে "মনের মানুষ" ,"অচিন পাখি" ব্যাবহার করেন।  
এখানে "মনের মানুষ" জীবাত্মা রূপী "পরমাত্মা " দেহ মন্দিরে আসা যাওয়াই তার নিত্য লীলা।
আর এই লালনের "অচিন পাখি " এই ধারণার উপর অনুপ্রাণিত হয়ে রবীন্দ্র নাথের "জীবন দেবতা" র প্রকাশ । এবং এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্র নাথ
"The religion of man"  এ লিখেছেন -- 

"I felt that I had found my religion at last,thereligion ofman,in which the infinite became defined in humanity and came close to me so as to need my love and co-operation. This idea of mine found at a later date its experssion in some of my poems addressed to what I called Jivandevate, the lord of my life."


বলা যায় এই বিমূর্ত ধারণার মাধ্যমে আমরা একটি বিষয়ের অস্পষ্ট অবয়ব তৈরী করা হয়।
এবং প্রাচীন ভারতবর্ষে তার প্রভাব ও ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। 

এবং ১৯ শতকের গোড়ার দিকে ভারত বর্ষে জন্ম নেওয়া  শিল্পী Maqbool Fida Husain  এই বিমূর্ত চিত্র শিল্পী যথেষ্ট দক্ষতা দেখিয়েছেন।
তার আঁকা গুরুত্ব পূর্ন বিমূর্ত শিল্প কর্ম হলো ---
1. The Puppet Dancers
2. Battle of Ganga and Jamuna
3. The Horse that Looked Back
ইত্যাদি।।
এখানে আমার অঙ্কিত মাদার টেরেসা র একটি বিমূর্ত চিত্র রইল।


মাদার টেরেসা











দ্রোহকাল ,অভিজিৎ রায়

দ্রোহকাল
অভিজিৎ রায়




ক্লান্তিহীন সে যাত্রার মাঝপথে
আজো ডাক দিয়ে যায় সেই দ্রোহকাল
রাস্তা পেরোই সাবধানে কোনমতে
নতুন সূর্য উঠতেও পারে কাল।

আজন্ম এক চিৎকার বুকে নিয়ে
পেরোচ্ছি যেন মহাসাগরের ঢেউ
কত জন আরো গিয়েছে এপথ দিয়েই
তাদেরই মধ্যে ডাক দিয়ে গেল কেউ।

আমার চলাতে চকিত বিচ্ছুরণ
আমার গ্রীবার ভঙ্গিমা টানটান
আমার লড়াই একলব্যের রণ
চেতনায় তাই একটানা দিই শান।

একক যাত্রা ভূমিকম্পের মাঝে
অগ্নিবলয় পাক খায় পাঁজরায়
দূর দিগন্তে দুন্দুভি যেন বাজে
প্রলয়ের আগে শুধু দিন গুণে যায়।

অশ্বমেধের হ্রেষাধ্বনি ওঠে ঐ
চাবুকে চাবুকে এ জীবন জেরবার
অস্ত্র এবং শিরোস্ত্রাণটা কই
আগুনের মুখে এ জীবন দুর্বার।





পেঙ্গুইন মোহাম্মদ আতিকুল ইসলাম

পেঙ্গুইন
মোহাম্মদ আতিকুল ইসলাম 



সন্ধ্যা নামি নামি করছে; সুর্য পশ্চিম আকাশে অস্ত যাবার যাবতীয় প্রস্তুতি শেষ করেছে। হতভাগা শহুরে বাসিন্দা, দিগন্তের সবুজের উপর লাল আভায় প্রকৃতির অপরুপ শোভা দেখার সৌভাগ্য এই কংক্রিটের জংগলে নেই। সেই জংগলের বিরুপ প্রভাব পরেছে এই নগরের মানুষের আচরনেও, এরকম একটি আচরনে প্রচন্ড বিরক্ত হলেন করিম সাহেব।
বিরক্তটা হলেন, বাস থেকে নামার সময়। তিনি সচরাচর বাসে চলাফেরা করেন না। আজ গাড়ি না থাকায় বাসে আসতে হলো আনেকটা বাধ্য হয়েই। বাসে তোলার সময় আদর করে তুলবে, কিন্তু নামার সময় ভদ্রতা সভ্যতার ধারে কাছ দিয়েও এরা যায় না । যথাযথভাবে বাস থামিয়ে যাত্রী নামাতে সমস্যা কোথায়? আর একটু হলেইতো দুর্ঘটনা হতে পারতো। সবকিছুতেই বড্ড তারাহুরো।
করিম সাহেবের বয়স ষাটের উপর। পড়নে সাদা পাজামা পাঞ্জাবী। পায়ে কালো স্লিপার। তিনি ভাবছেন, বয়স একটু কম থাকলে হেলপারকে নামিয়ে দু-চার ঘা লাগিয়ে দিতেন। মানুষের জীবনের কোন মূল্য এদের কাছেই নেই। প্রচন্ডরকম বিরক্তি নিয়ে সামনের দিকে তাকালেন। তাকিয়েই একটা দৃশ্য দেখে মনটা অদ্ভুত ছেলেমানুষী খুশিতে ভরে উঠলো।
কতগুলো কোটপরা ভদ্রলোক নিয়ে একটি ১৫-১৬ বছরের ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। ভদ্রলোকগুলি সামনে পিছনে দুলছে। দেখতে মনে হচ্ছে জীবন্ত পেঙ্গুইন। মজাতো, শীতের দেশের অতিথির গরমের দেশে আগমন।
ছেলেটির দিকে তাকালেন। মাঝারি উচ্চতার হালকা পাতলা শরীর, গৌর বর্ণ সাথে অদ্ভুত মায়াময় চোখ। এলোমেলো অবিন্যস্ত চুল। পরনে ছাই রঙের প্যান্ট এবং পুরাতন কুচকানো চেক শার্ট।সাথে একটি কালো ব্যাগ। সেই ব্যাগ থেকে একটা একটা করে খেলনা বের করে পাম্প করে সামনে সাজিয়ে রাখছে বিক্রি করার জন্য।
ছেলেটার কাছে এগিয়ে গেলেন। বাতাসে ফোলানো একটা পেঙ্গুইন হাতে তুলে নিলেন। সত্যিই চমৎকৃত হলেন। ছোট্ট একটা কৌশল কি জীবন্ত করেছে খেলনাটিকে। বাতাসে ফোলানো বেলুনের নিচের দিকে কিছুটা ভর দিয়েছেন। আর তাতেই খেলনাটি দাঁড়িয়েছে। একটু বাতাস পেলেই সামনে পিছনে দুলছে। চায়নার তৈরি, অদ্ভুত এক ব্যবসায়ী জাতি। অসাধারণ উদ্ভাবনী শক্তি।
ছেলেটাকে বললেন, “কিরে কত করে এগুলি?”
ছেলেটি বলল ১২০ টাকা। মনে হচ্ছে খুব একটা বিক্রি বাট্টা হচ্ছে না। অনেকেই দাম জিজ্ঞেস করছে কিন্তু কেউ নিচ্ছে না। ছেলেটি কেমন যেন অসহায় দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে।
তার মায়া হলো। তিনি দামাদামি করে একশ টাকায় একটা খেলনা পেঙ্গুইন কিনে নিলেন। তার তিন বছরের নাতিকে এটা উপহার দিবেন।
খেলনাটি নিয়ে মার্কেটে ঢুকলেন। মার্কেটের ভিতর দিয়ে শর্টকাট ওপাশে গিয়ে রক্সা নিবেন। মার্কেটের পেছনের গেট দিয়ে বের হবার সময় এসির তীব্র বাতাসে পেঙ্গুইনটি হাত থেকে নিচে পরে গিয়ে বাতাসের চাপে ছুটে গেলো, যেনবা জীবন্ত একটা পেঙ্গুইন দৌড়ে যাচ্ছে। তিনি এর পিছনে ছুটে গিয়ে তুলে নেন।
আশেপাশে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিলেন, কেউ তার ছেলে মানুষী দেখে ফেলেনিতো?
বাসায় এসে প্রচন্ড বিরক্ত হলেন। বাসায় কেউ নেই। মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। এতক্ষণ নাতিটিকে খেলনাটি দিয়ে যে হাস্যজ্জল মুখটির কল্পনা করেছিলেন সেটি অধরাই রয়ে গেলো।
ড্রয়িংরুমে খেলনা পেঙ্গুইনটি রেখে ফ্রেস হতে ওয়াস রুমে চলে গেলেন।ফিরে এসে তার স্ত্রীর ফোন পেয়ে জানতে পারলেন, আজ সে ভাইয়েয় বাসায় থেকে যাবেন। মিসেস করিম আরো বললেন, ডাইনং টেবিলে খাবার রাখা আছে। তিনি যেন সময়মতো খেয়ে নেন। এবং ঔষধ খেতে যেন ভুল না করেন।
কথামতো করিম সাহেব খাওয়া দাওয়া সম্পন্ন করে রাত ১০টার দিকে ঘুমাতে গেলেন।
রাত ২টার দিকে অদ্ভুত শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। অনেকটা রাজহাঁসের মতো। আবার মনে হোল,স্টিভেন স্পিলবার্গের জুরাসিক পার্কে মুভিতে কিছু ডাইনোসরের অদ্ভুতভাবে স্বরে ডাকার মতো তবে তিনি তার রুম থেকে ড্রয়িং রুমে এসে যা দেখলেন তারজন্যে মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না।
একটি পেঙ্গুইন ঘরময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। জীবন্ত একটা পেঙ্গুইন। অবাক চোখে তিনি তাকিয়ে রইলেন। তিনি কি ঠিক দেখছেনতো?
নাকি এটা তার মনের কল্পনা।
পেঙ্গুইনটি দেখে মনে হচ্ছে এটি এডিলি প্রজাতির, এর চোখের চারপাশে সাদা রিং, ঠোটের অঅনেকাংশই ছোট লোম দিয়ে আবৃত এবং সাদা কালোর গাঁয়ের রংটা অনেকটা ট্যাক্সিডো পরিহিত ভদ্রলোকের মতো। অনেকটা রাজহাঁসের মতো শব্দ করছে। ধীরে ধীরে করিম সাহেবের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
করিম সাহেব ভাবলেন তিনি স্বপ্ন দেখছেন। এটা হয় কি করে? তবে তাকে আরো অবাক করে দিয়ে কথা বলে উঠলো পেঙ্গুইনটি।
“দাদু, তোমাদের এখানে বড্ডো গরম, এসির টেম্পারেচার শুন্যতে নামিয়ে দাও না। আর গলাটা বড্ডো শুকিয়ে গেছে, একটু ঠান্ডা পানি দিবে?” পেঙ্গুইনটি কথা বলছে। এটা হয় কী করে? চিন্তিত করিম সাহেম মাথা চুলকাতে থাকলেন। তিনি নিশ্চিত হলেন, স্বপ্নই দেখছেন। সন্ধ্যায় নাতির জন্য একাটা খেলনা কিনে এনেছিলেন আবার রাতে ঘুমানোর আগে প্রামাণ্যচিত্র "Penguin :Spy in the Huddle" দেখছিলেন। সবমিলিয়ে উর্বর মস্তিষ্কের এই স্বপ্নের অবতারণা। কিন্তু স্বপ্নে এভাবে যুক্তি খন্ডন সম্ভব কি?
পেঙ্গুইনটি তার ডানা দিয়ে হালকা বারি দিয়ে বলতে থাকল, “উফফ দাদু কি হলো তুমি কি আমাকে মেরে ফেলতে চাইছ?” কন্ঠটা ঠিক যেনো তার আহলাদি নাতি অংকুরের মতো।
পেঙ্গুইনটি উচ্চতায় প্রায় ২ ফুট, চোখে অদ্ভুত এক মায়া। সে মায়াময় চোখে যেনবা কিছু বলতে চাইছে।
ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন, অদ্ভুত আহ্লাদী করে রেখেছে ঠোঁটটা। আর দেখে কেন জানি সত্যিই মনে হলো পেঙ্গুইনটি কষ্টে পাচ্ছে। দেখা যাক না কি হয়।
তিনি এসির টেম্পারেচার কমিয়ে গায়ে গরম কাপড় চাপিয়ে আসলেন, “তুইতো দেখি পুরাই এন্টারটিকা বানিয়ে দিয়েছিস। আমারতো ঠান্ডা কমছেই না। তা তোর বাসা কোথায়, আর গ্রীষ্মের দিনেইবা এদেশে উদয় হলি ?”
“এসেছি মেঘের ভেলায় ভেসে। আর থাকি বরফের দেশে। সর্ব উত্তরে,” পেঙ্গুইনটি উত্তর দেয়।
করিম সাহেব হেসে উঠলেন। তার নাতির মতোই বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলছে। তিনি তাল মিলিয়ে গেলেন। একা তিনি, এর সাথে গল্প করে নেহাতই সময় মন্দ কাটবে না। তুই মেঘে উঠলি কি করে? তোর ডানাতো আকাশে উড়ার জন্য যথেষ্ট না। কেন তুমি জেমসের ওই গানটা শুননি,
বিধাতা তুমি ফিরে যাও,
একটু দাঁড়াও যমদূত।
চিঠি এসেছে প্রিয়ার কাছ থেকে,
অদ্ভুত এক দাবী নিয়ে,
আকাশ মাটি যেথায় মিশে,
থাকবে সেথায় সে বসে।
দেখা হবে প্রথম বার,
আমার সঙ্গে প্রিয়ার।
উপহার কি হবে
ভাবছি যে তাই
সূর্য যে তার চাইই চাই।
আকাশ মাটি যেথায় মেশে
থাকবে সেথায় সে বসে
দেখা প্রথম বার
আমার সঙ্গে প্রিয়ার
বাহন কি হবে ভাবছি যে তাই,
মেঘ ছাড়া যে উপায় নাই …..
“আচ্ছা দাদু, দিদাকে প্রথম কি উপহার দিয়েছিলে? হা হা দাদু লজ্জা পেলে? আচ্ছা ঠিক আছে আমি বলছি কিভাবে এসেছি,”
এবার মনে হোল পেঙ্গুইনটা বেশ সিরিয়াস।
“দাদু তুমি কি শুধু হেলিকপ্টারই দেখেছ, মনে হিচ্ছে বিমান দেখনি?” বলেই মনে হোল ফিক করে হেসে ফেলল। আরো বলল, “পাখাদুটো বিমানের ডানার মতো রেখে দু'পায়ে প্যাডেল করলে অনায়েসেই উড়া যায়। তুমিও চাইলেই পারবে। না ইয়ে মানে তোমার হবে না। হাতটা বড্ডই সরু আর সেই সাথে হাতের আঙুলের মাঝে তোমাদের বেশ ফাঁকা। আর বুড়ো হয়ে গেছ, পা দিয়ে যথেষ্ট জোরে প্যাডেল করার শক্তিও নেই তোমার,” বলেই ফিক করে দুষ্টু হাসি হেসে দিল।
মনে মনে হাসলেন, ডিজিটাল যুগের পেঙ্গুইন ভালোই চাপার জোর আছে। অলীক গল্পের বুনট গেঁথে যাচ্ছে ঠিক তার নাতিটার মতো। পুরুষ্কার হিসেবে ফ্রিজের ঠান্ডা পানি দেয়া যেতেই পারে ভাবলেন। সাথে কিছু মাছ দেয়া যেতে পারে। মনে হয় ক্ষুদাও লেগেছে পেঙ্গুইনটির, লজ্জায় হয়তো চাইছে না।
খাবার খেয়ে পেঙ্গুনইনটি ঘরময় ছোটাছুটি শুরু করল। তিনি এবার ডিপ ফ্রীজের ডালাটি খুলে দিলেন। বাবুর বাথটাবে পানি ঢেলে তাতে বরফ কুঁচি ছেড়ে দিলেন। এবার তার খুশী আটকায় কে?
অদ্ভুত আনন্দে পানিতে সাতার কাটে কিছুক্ষণ, ছুটে বেড়ায়, ভেজা ফ্লোরে স্লিপ কাটে। ঘরে বন্দি দুষ্টু ছেলেটাকে খেলার মাঠে নিলে যেরকম খুশিতে মাতোয়ারা হয়ে যায়।
হঠাৎ মনে হোল বাইরে অনেকগুলি কোটপরা ভদ্রলোক ডাকছে। জানাটা খোলা মাত্রই কোথা থেকে যেন বরফ এসে সমস্ত ঘরটা ভরে গেলো। সাথে সাথে ঘরে ঢুকে গেলো অনেকগুলি পেঙ্গুইন। তিনি এদের পিছনে ছুটতে গিয়ে পিছলে পরে গেলেন। চারপাশে তার নেমে এলো অন্ধকার।
মিসেস করিম কলিংবেল বাজিয়েই চলছেন। কিন্তু দরজা খুলছে না কেউ। শেষে চাবি দিয়ে দরজা খুলে বাসায় ঢুকেই যা দেখলেন, তাতে তার হৃদস্পন্দন থেমে যাবার অবস্থা হলো। করিম সাহেব অচেতন অবস্থায় সোফার পাশে পড়ে আছেন। ঘরময় ছিটানো রয়েছে ছোট ছোট মাছ, কিছু বড় মাছের টুকরা, এখানে ওখানে রয়েছে বরফকুচি, অংকুর জন্য বাথটাবে পানিতে ভাসছে অর্ধগলিত বরফকুচি সাথে বাতাসে ফোলানো খেলনা পেঙ্গুইন। ডিপফ্রীজের ঢাকনাটা খোলা। এসিটার টেম্পারেচার শূন্যতে রাখা রয়েছে, জানালাটা হাট খোলা। টিভিটা চলছে উচ্চ ভলিউমে।
অজানা আশংখায় তিনি দ্রুত চলে গেলেন করিম সাহেবের কাছে। কল দিলেন ১৬২৬৩ নাম্বারে, নিকটস্থ হাসপাতালের সাহায্য পাবার আশায়।
দুই সুপ্তাহ তীব্র ঠান্ডা জ্বরে ভোগার পর করিম সাহেব আজ অনেকটাই সুস্থ। আজ উত্তরায় রবিন্দ্র সরণীতে এসেছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ আবরারের কাছে। সম্পর্কে তার ভাতিজা হয় এবং তাকে অনেক সম্মান করে থাকেন।
ডঃ আবরার মন দিয়ে করিম সাহেবের কথা শুনলেন। মিসেস করিমের কাছেও শুনলেন পরের দিন কিভাবে করিম সাহেবকে পেলেন।
“কাকু আপনার আচরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আপনার মাঝে সিজোফ্রেনিয়া রোগের লক্ষ্মণ রয়েছে। যার ফলে আপনার কথা ও কাজের মধ্যে অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।”
“প্রথমত, আপনি ভাবছেন আপনার সাথে পেঙ্গুইন কথা বলেছে। এটা কোনভাবেই সম্ভব না। কারণ এরকম কোন নজির নেই। পেঙ্গুইনের আমাদের এ আবহাওয়ায় জীবিত থাকা সম্ভব না। সুতরাং এটি হেলুসুলেসান ছাড়া কিছুই হতে পারে না। এটা আপনার অবেচেতন মনের কল্পনা,” কথাগুলি বলে করিম সাহেবের দিকে তাকালো আবরার।
“তবে যে গান গাইল, এটা কি করে সম্ভব। আমিতো স্পষ্ট করেই শুনেছি। সে গানটা ঠিকই গেয়েছে। কিন্তু আমিতো গানটা জানি না। তোমাদের ব্যান্ড সংগীত কখন শুনি না। তাহলে এটা হলো কি করে?” এক নিঃশ্বাসে কথাগুলি বলে থামলেন তিনি।
“কাকু আপনি হয়তো নিজে থেকে কখনো শুনেননি। কিন্তু আপনার ছেলে কিন্তু সবসময় শুনতো। সেটা হয়তো অবচেতনে আপনার মনে কখন গেঁথে গিয়েছে আপনি টের পাননি,” আবরার বলতে থাকল,
“কল্পনায় ভেবেছেন আপনি পেঙ্গুইনের সাথে খেলছেন। কন্তু তার প্রায় সব আচরণে অংকুরের ছাপ। আপনি বাসায় একা ছিলেন, ঘুম ভেঙ্গে যাবার পর চাইলেন প্রিয় কারো সাথে কথা বলতে। আর সেটাই পেলেন কল্পিত পেঙ্গুইনের মাঝে,” একটু বিরতি নিয়ে কপালটা চুলকে নিয়ে বলতে শুরু করলেন,
“যাই হোকনা কেন আমাদের বাস্তবতা মেনে নিতেই হবে। অংকুর দুবছর আগে ওর বাবা- মায়ের সাথে চট্রগ্রাম থেকে ঢাকা আসার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। যে অভিমানে ওরা বাংলাদেশ ছেড়ে কানাডায় পারি জমায়। আর সেখানে আরেকটি সড়ক দুর্ঘটনায় আপনার একমাত্র ছেলে এবং বৌ মা উভয়ের মৃত্যুবরন করে। যত কষ্টই হোক এই বাস্তবতা আপনাকে বা আপনাদের মানতেই হবে। আর অংকুর পেঙ্গুইন খুব পছন্দ করতো। আর আপনি ওকে পেঙ্গুইন নিয়ে অনেক মজার মজার গল্প করতেন।”
“আপনাকে এটাকে নিয়ন্ত্রন করতে হবে। না হলে একটা সময় আসবে যখন আপনি বাস্তবতা ও কল্পনার জগৎ আলাদা করতে পারবেন না। তখন কাকীমার কি হবে? তিনিওতো একই ধরনের কষ্ট বুকে লালন করছেন। এখন যদি আপনাকে হারায় তাহলে তার কি হবে?”
ডঃ আবরার তাকিয়ে দেখেন কাকু, কাকিমার চোখ ছলছল করছে। তিনি আর কিছু বললেন না। ধীরে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন।
রাস্তায় গারিগুলি পাল্লা দিয়ে একে অপরকে ছারিয়ে যেতে। সবার যেনো বড্ডো তারা। আইনের বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করছে না। তোয়াক্কা করলে যেনবা বোকা হয়ে যেতে হয়, বড্ড পিছিয়ে পরতে হয়।
অজানা আশংকায় মনটা কেপে উঠে, আহা এবার দুর্ঘটনায় কার জীবনে নেমে আসবে কালো অমানিবাশ, সীমাহীন বোবা বুনো কষ্ট।“ আচ্ছা আমার জীবনের নিরাপত্তা আছে কি?” ভাবছেন ডঃ আবরার ।
তার বুকের গহীন থেকে বের হয়ে আসল একটা দীর্ঘশ্বাস।
এ প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই।






সীমানা ছাড়িয়ে তপন ঘোষ

 সীমানা ছাড়িয়ে
তপন




কোনো এক বিপদের গভীর হাতছানি 
বারবার ডাকে,ডাকে আমাদের, 
চোখবুঁজে না দেখার ছলে
দেখিনা তা,
কান গুলো বধিরতায় পেয়ে বসে।
ঠোঁট দুটো কি এক 
অদৃশ্য সুতোয়, কে যেনো করেছে সেলাই, 
হাত দুটো ওঠে না আর প্রতিবাদে
চলে না পা গুলো মিছিলে মিছিলে। 
আগুনেরও সীমা আছে 
সীমা আছে লেলিহান শিখার,
এখনো সময় আছে।
লক্ষ লোক আজ পৃথিবীতে অপেক্ষায় আছে
জ্বলে ওঠার জন্য,ভীমরুলের মতো।
হয়তো হয়েছে সময়
হে সমুদ্র, 
জীবন বা মরণের
আসো জনতার মতো।




নতুন প্রাণ দাও হে তপন ঘোষ

'নতুন প্রাণ দাও হে'
তপন 





'নতুন প্রাণ দাও হে'। 

সকল পথ রুদ্ধ যেথায়
জীবন যেখানে স্তব্ধ হায়,
শুরু যে তোমার সেথায় 
চির সখা, প্রাণ সখা হে
বন্ধু হে আমার----------।
ক্ষ্যাপা বাউলের মতো
আমি যে খুঁজে ফিরি সেথায় তোমায়,
খুঁজি চির মুক্তিতে,জীবনের পথে পথে
অন্জনা সেই নদীটার তীরে
খুঁজি রন্জনায়,মালঞ্চ আর ফুলঞ্চে।
খুঁজি যে তোমায় ঝর্ণায় আর ঝরাপাতায়
ভরা সুরের সাগরে সাগরে। 
খুঁজি রুদ্র বৈশাখের প্রতাপে
ভরা গ্রীষ্মে,কোন সে শরৎ মেঘে মেঘে, 
খুঁজে ফিরি নবান্নের উৎসব, শীতের হাওয়ায়
কোকিলের কুহু কুহু বসন্তে।
'চির পথের সাথী আমার
চির জীবন হে'।।




Sunday, May 15, 2022

প্রথম সংখ্যা 15May2022

 প্রথম সংখ্যা 15May2022













গায়ের ঘামের কোপ্তা , রানা জামান

 গায়ের ঘামের কোপ্তা

রানা জামান






তিন বছরের শিশু রাবিনার হাসি-ই জমিরের শক্তি ও সাহস। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম শেষে বাড়ি এসে রাবিনার শিশু-হাতের স্পর্শ ও নিস্পাপ হাসি মুছে দেয় ওর সকল ধকল। সারাদিন ভ্যান টেনে শাকসব্জি বিক্রি করা অনেক পরিশ্রমের না হলেও বেশ ধকলের। কোনোদিন এক ভ্যান শাকসব্জি বিকেলের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়; কোনোদিন রাত আটটা পর্যন্তও থেকে যায় কিছু-ঐ থেকে যাওয়া শাকসব্জি ঐ রাতের জন্য রান্না করা হয়।

গুড়ো মাছের সাথে হরেক পদের সব্জির সালুন অনেক মজার হয়ে থাকে। কম পরিমাণ মশলায় জুলিয়ার হাতের রান্না অনেক মজাই লাগে। মেয়েটাও ওদের সাথে গাপুসগুপুস খেয়ে ফেলে ওসব।

বরাবরের মতো জমির মিরপুর-১-এর শাকসব্জির আড়তে ফজরের আযানের সাথে সাথে এসে শাকসব্জির পরিমাণ অর্ধেকের কম থামায় বেকুব বনে মনে মনে বললো: আইজ এতো তাড়াতাড়ি শাকসব্জি শেষ হয়া গেলো! এক শাকের আড়তদারকে জিজ্ঞেস করলো, আইজ এতো তাড়াতাড়ি শাকসব্জি শেষ হয়া গেলো মহাজন ভাই?

শাকের মহাজন বললো, আইজ কম আইছে।

কম আইছে ক্যান মহাজন ভাই?

করোনা না ফরোনা নামের একটা ভাইরাস আইছে। এই ভাইরাস নাকি খুব ছোয়াছে। কাছে গেলেই ধইরা ফেলে। আর ধরলে জ্বর গলাব্যথা হইয়া মরা ছাড়া উপায় নাই!

কুনু অষুধ নাই? প্যারাসিটামলে এই জ্বর সারে না?

না রে জমির। দুনিয়া জুইড়া হাজার হাজার মানুষ মরতাছে। তুমি তাড়াতাড়ি শাকসব্জি লইয়া চইলা যাও। পরে পাইতা না।

জমির বরাবরের মতো ভ্যান বোঝাই করে বড় রাস্তায় এসে বেশ অবাক: কোনো বাস চলতে দেখা যাচ্ছে না, দুই একটা রিক্সা ছাড়া কোনো যানবাহনই নেই রাস্তায়। কী ব্যাপার! আচানক হরতাল শুরু হইলো নি? কোন্ পাট্টি ডাকলো হরতাল?

ভালোই হয়েছে। রাস্তা একদম ফাঁকা থাকায় সাঁইসাঁই করে ভ্যান চালিয়ে দশ মিনিটে চলে এলো এলাকার বাজারে। ও রাস্তার পাশেই থাকে ভ্যান নিয়ে। কিন্তু আজ ওর জায়গাসহ পুরো ফুটপাতে বসে গেছে মাছের বাজার। রাস্তায় কিছুদূর পরপর শাদা রঙের চক্র বানানো হয়েছে। একটা পুলিশের ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে। কয়েকজন পুলিশ ক্রেতাদের চক্রে দাঁড়িয়ে বাজার করার নির্দেশ দিচ্ছে। সবার মুখে রংবেরঙের মুখোশ দেখা যাচ্ছে। মুখোশ কেনো?

তাহলে জমির কোথায় দাঁড়াবে ভ্যান নিয়ে আজ? দৃষ্টি প্রসারিত করে দেখতে পেলো মাছ মহালের পরে শাকসব্জির মহাল দেয়া হয়েছে। জমির ভ্যান নিয়ে এগিয়ে গেলো ওদিকে।

নতুন শসকসব্জি মহালে একটা খালি জায়গায় ভ্যান লাগানোর সাথে সাথে এক পুলিশ এসে দাঁড়ালো ওর সামনে। পুলিশ সামনে এসে দাঁড়ানোর মানে জমির ভালো করেই জানে। সে খতি থেকে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট বের করে বাড়িয়ে ধরলো।

পুলিশ কনস্টেবল খানিকটা বিস্মিত হয়ে বললো, এটা কী?

চান্দা ছার! ক্যান? চান্দা কী বাইড়া গেছে অহন?

তোমার মুখে মাস্ক নাই কেনো?

মাস্ক? জমির তাকিয়ে দেখলো পুলিশের মুখেও মুখোশ আছে।

এদিকওদিক তাকিয়ে জমির বললো, সবার মুখেই মুখোশ দেখতাসি। ব্যাপার কী ছার?

করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে হইলে সবাইকে মাস্ক পইরা চলাচল করতে হইবো।


অহনই পিন্দতে হইবো ছার?


আঙ্গুল তুলে উত্তর দিকে দেখিয়ে কনেস্টবল বললো, ঐদিকে মাস্ক বিক্রি হইতাছে। ঘরে বৌ-বাচ্চা থাকলে ওদের লাইগাও একটা কইরা কিনিস। মাস্ক ছাড়া বাইরে আইলেই শাস্তি।


পুলিশ কনেস্টবল জমিরের হাত থেকে পঞ্চাশ টাকার নোটটা ছো মেরে নিয়ে উল্টো দিকে রওয়ানা দিলো। জমির মুচকি হেসে এগিয়ে গেলো মাস্ক কেনার জন্য।


পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে খদ্দের কম এলেও বিক্রি ভালোই হয়েছে। বিকেলেই ভ্যানের সকল শাক-সব্জি বিক্রি হয়ে গেছে। বেশ বেলা আছে। কিন্তু এখন আড়তে গিয়ে শাক-সব্জি এনে বিক্রি করা যাবে না। সে এদিকওদিক তাকিয়ে বেড়াতে বের হলো। ঢুকলো মাছ মহালে। কত মাছ বাজারে, কত রকমের মাছ! বড় মাছ, ছোট মাছ, মাঝারি মাছ। কত ইলিশ মাছ আজ বাজারে। কবে ইলিশ মাছ খেয়েছে বলতে পারবে না। কখনো কি ইলিশ মাছ খেয়েছে এ জীবনে? মনে পড়ছে না, একদম মনে পড়ছে না। মনে মনে আজকের মুনাফা হিসাব করছে জমির। শুনছে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের কোনো ঔষধ নেই। সবাই মিলে একবেলা ইলিশ মাছ খেলে কী এমন ক্ষতি হবে?

জমির খতিতে হাত দিয়ে আস্তেধীরে এগিয়ে গেলো ইলিশ মাছের দিকে। ইলিশ মাছের বেশ কয়েকটা ডালা এসেছে আজ। সে কোন দরদাম না করে দাঁড়ালো গিয়ে খদ্দেরদের পাশে। খদ্দেররা দাম করে ইলিশ মাছ কিনে নিচ্ছে আর ও শুনছে। ইলিশ মাছের দাম সম্পর্কে বেশ ধারনা হয়ে গেলো ওর। যখন একদিন খাবে, তখন বড়টাই খাবে। একবার ঢোক গিলে মনে মনে বললো: আইজ ইলিশ কিনতে খুব ইচ্ছা করতাছে! কিইন্যা ফেলি যা থাকে কপালে!


বাজারের বড় ইলিশ মাছটা কিনে ভ্যানের হাতলে ঝুলিয়ে ফিরে এলো ডেরায়।


ডেরা বলতে রূপনগর ওয়াসার ময়লা নিস্কাশন খালের উপর বাঁশের মাচার বস্তি। খালটা ময়লা জমে বদ্ধ হয়ে যাওয়ায় সর্বক্ষণ দুর্গন্ধ। এই ভয়ানক দুর্গন্ধ গা-সওয়া হয়ে গেছে ওখান যারা বসবাস করে ওদের।


জমির ওর ঝুপড়ির সামনে এসে ভ্যান থেকে নেমে ঝুপড়ির ভেতরে রাবিনার খিলখিল হাসি শুনে বেশ অবাক হলো। জুলিয়া আজ এতো সকালে চলে আসছে? অসুস্থ হয়ে গেছে নাকি? উদ্বিগ্ন হয়ে জমির ইলিশ মাছটা নিয়ে ঢুকলো ঝুপড়ির ভেতরে। জুলিয়া রাবিনাকে বুকে চড়িয়ে খেলা করছে।


জমির ইলিশ মাছটা দেখিয়ে বললো, তোমার কি অসুখ করছে নাকি রাবিনার মা?


জমির ইলিশ মাছটা একটা থালার উপর রেখে রাবিনাকে কোলে তুলে গালে কপালে চুমু দিতে লাগলো। শিশু রাবিনাও বাবাকে পেয়ে অনেক পুলকিত। ও বাবার গলা জড়িয়ে ধরে আদর নিচ্ছে খিলখিল হেসে।


জুলিয়া শোয়া থেকে উঠে বললো, করোনা না কী জানি আইছে দেশে। কাউরে ধরলে আর বাঁচে না। বিশ্বে নাকি অনেক লোক মরতাছে। হের লাইগ্যা গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ কইরা দিছে।


জমির জুলিয়ার পাশে বিছানায় বসে বললো, ঠিক কথা। বাইরে গেলে মাস্ক পইরা যাইতে হইবো। আমি আইজ সারাদিন মাস্ক পিন্দা বেচাবিক্রি করছি। তোমার ও মাইয়াডার লাইগাও দুইটা মাস্ক কিনছি।


প্যান্টের পকেট থেকে দুটো মাস্ক বের করে জুলিয়ার হাতে দিলো। জুলিয়া একটা নিজে পরে আরেকটা শিশু রাবিনাকে পরাতে পরাতে বললো, এতো বড় ইলিশ মাছ কিন্যা আনলা। ব্যাপার কী? আইজ কি বেশি লাভ হইছে?

জমির মুচকি হেসে বললো, হুনলাম করোনায় যারে ধরে, সে আর বাঁচে না। জীবনে ইলিশ মাছ খাইছি কিনা কইতে পারুম না। তাই বাজারের বড় ইলিশটা কিন্যা নিয়া আইছি।


জুলিয়া চৌকির নিচের একটা পোটলা দেখিয়ে বললো, আসার সময় লাইনে খাড়াইছিলাম। একটা টেরাক থাইকা রিলিফ দিতাছিলো, নিয়া আইছি।


কী আছে এই পোটলায়?


চাউল আছে, ডাউল আছে আর এক বোতল তেল।


জমির জুলিয়ার কাছে এসে কাঁধে হাত রেখে বললো, রাবিনার মা, আল্লায় আমাদের মেলা দিছে। আমি কামাই করতে পারি। আরো বেশি কামাই করুম। আমাদের অহন রিলিফের দরকার নাই। ল্যাংড়া সরুপা খালাকে দিয়া দিও।

কী কও! ল্যাংড়া খালা তোমার চাইতে অনেক ধনী! ভিক্ষা কইরা অনেক টাকা কামায়!


যতই কামাক তবুও হে ভিক্ষুক।


ঠিকাছে। আমি কী করুম? তোমার ঘাড়ে বইসা বইসা খামু?


না। তুমি আমার সাথে থাকবা। তাইলে দুই গুণ বেচাবিক্রি হইবো।


তা হইলে আরো ভালাই হইবো। এতো বড় ইলিশ আনতে গেলা ক্যান ছোট দেইখা আনলেই হইতো।


আর কবে ইলিশ আনতে পারুম জানি না। তাই বড়ডাই আনছি।


জুলিয়া বললো, বিয়ার আগে বাবায় মাঝে মইধ্যে জাটকা আনতো। বিয়ার পরে তুমি আনো নাই, খাইও নাই।


জমির বললো, দুই টুকরা ভাজি কইরো। ভাজা ইলিশ খুউব স্বাদের।


কোপ্তা করুম?


ইলিশের কোপ্তা? নাম শুনছি; কুনুদিন খাই নাই। তুমি করতে পারবা?


কুনু দিন করি নাই, তয় হুনছি কিভাবে করতে হয়। মাছ সিদ্ধ কইরা কাঁটা ফালায়া দিতে হয়। তারপর পিয়াজ মরিচ দিয়া ভর্তা মতো কইরা তেলে ভাজতে হয়।


বাহ! তোমার কথা শুইনা অহনই আমার জিব্বায় পানি আয়া পড়ছে!


জমির ইলিশ মাছটার দিকে তাকিয়ে ঢোক গিললো একবার।



নবতম প্রকাশিত সংখ্যা

অপূর্ণ স্বপ্ন

অপূর্ণ স্বপ্ন  বিপ্লব মাহাতো পূর্ণিমা রাতে চাঁদের এ কী মেলা, ও সুন্দরী, ভালো লাগে না আর লুকোচুরি খেলা। ভেবেছিলাম তোমাকে নিয়ে যাবো দূরদেশে, ...

আরও পড়ুন