সাহিত্যের অঙ্গনে !!
অজানা পলাশ
তপতী রায়
মধুমিতার জন্য অনেকক্ষন অপেক্ষা করে রমা ভেতরে গিয়ে বসল।প্রচন্ড ভীর। অল্প বয়সের ছেলে মেয়ে খুবই কম।রমা কোনের দিকের একটি খালি চেয়ারে বসে এক কাপ কফি অর্ডার দিল।চারিদিকটা একটু দেখে নিল পরিচিত কেউ আছে কিনা। আজকাল এখানে বই এর দোকানের মালিক আর পাবলিশারের ভীর।আমাদের সময় কলেজ পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রী, প্রফেসারদের ভালো-মন্দ আলোচনার আড্ডা খানা। লেখক,লেখিকা, সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের মাঝে মধ্যে দেখা যেত। এক কাপ কফি নিয়ে ঘন্টার পর ঘ্ন্টা আড্ডা বা কিছু কাজের কথা বলে ফেলার জায়গা বোধহয় ভূ-ভারতে নেই।এর নাম কফি হাউস।
দিন সত্যিই বদলেছে। এ যুগের মেয়েরা মনে হয় অন্য ঠিকানা পেয়ে গেছে।রমা আর একবার চারি দিকে চোখ বুলিয়ে নিল, চেনা পরিচিত কেউ দেখা যায় কিনা।
মনের গভীরে পুরনো দিনের কথা ঢিমে তালে দুলে চলেছে। যত চেষ্টা করছে প্রাক্তন কে জীবন থেকে কাঁচি দিয়ে কেটে ফেলেছি। তবু বার বার ঘুরপাক করছে কফি হাউসে ঢোকা পর্যন্ত। অল্প অল্প প্রেমের গল্প। কলেজ ছেড়ে, সবে বিশ্ববিদ্যালয়।মনের নায়ক স্যাটা বোসকে যেন হাতের মুঠোয় পেয়ে গেলাম। পলাশ বোস। চেহারা থেকে কথা-বা্র্তা! আমার স্বপ্নের নায়ক। গরম কফিতে চুমুক দিতেই মনে হলো পাশের চেয়ারে কে যেন বসল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি আমার স্যাটা বোস! প্রাক্তন স্বামী পলাশ বোস। এতক্ষন মন জ্বালাতন করছিল। এবার অতীত এসে পাশে বসল।
ব্যাগ নিয়ে উঠে পড়ছিলাম ,হাত ধরে বসিয়ে দিল।বলল, এই চেয়ারটার একটা আলাদা আকর্ষণ আছে। প্রথম পরিচয় এইখান থেকে।মন বলছে আবার শুরু হবে এইখান থেকে।অসহ্য! উঠে পড়লাম।শব্দ করে হেসে উঠল। আসপাশের লোক মিটি মিটি হাসছে।
মিটিমিটি হাসছে।অপেক্ষায়, পরের নাটক দেখার আশায়।আমি কফি হাউস থেকে বেড়িয়ে পড়লাম।
(২)ঘড়িতে প্রায় আটটা বাজে। পলাশের কাছে গাড়ি আছে।কোন রকম অনুরোধ করল না। ভালো করেই জানে যাব না। একটা ক্যাপ নিয়ে বাড়ি পৌছাতে প্রায় রাত দশটা হলো।মেয়ে গাড়ির শব্দ শুনেই দরজা খুলে রেখেছে, দেয়ালে হালান দিয়ে দা্ঁড়িয়ে।ঘরে যেতে যেতে বললাম, অনুরাধাকে ছেড়ে এলাম। দেরী হয়ে গেল।খেতে আয়।
এই প্রথম ওকে চুপচাপ দেখলাম। ঘরে ঢুকলেই গল্পের তুবড়ি, আরম্ভ হলে শেষ হতে চায় না।খুশি খুশি মুড!শিস শিস দিতে দিতে নিজের ঘরে চলে গেল।মনে হলো আগ্নির সাথে দিনটা ভালোই কেটেছে।প্রতিদিন হাজার গন্ডা নালিশ।কথা গুলো শুনে মনে হয় একশ ভাগ সোনাই এর দোষ।মন্তব্য করি না। নিজের ভুল নিজেই সমাধান করা উচিত।একটা সমায়ের পর মা-বাবার উপদেশ তেমন কাজে লাগেনা।বিরক্ত হয়।বিশেষ করে এই যুগে।একদিন বলেই ফেলল, ভুল, ঠিক যাই করি নিজেই সামলে নেব।যেমন তুমি সামলে নিচ্ছ!
হাতে প্রচুর কাজ। এনজিও তে কাজ করি। এবার গ্রাম পরিক্রমা আছে। গ্রামের স্কুলের ছেলের পড়াশুনা ছারাও পরিবেশ সচেতনার ভার আমার ওপর পড়েছে।প্রথম প্রথম একটু আসুবিধা হতো। একবার বন্যার সময় তিনজন বন্ধু মাটির ঘরে আটকে পরে ছিলাম।ভাগ্যিস লীলা আর সালমা ছিল।ওদের ছেলে বেলা বাংলা দেশের গ্রামে কেটেছে।সত্যি কথা বলতে আমার জন্ম সোনার চামচ মুখে দিয়ে বললেই হয়। না পারি হ্যারিকেন জ্বালাতে, না পারি কাঠের আগুনে রান্না করতে। সব শিখে গেলাম।
এখন পুরনো বন্ধু-বান্ধবদের সাথে মিশতে একটু অসুবিধে হয়।সব হাই-ফাই সোসাইটি। আমিও ঐ রকমি ছিলাম। কিছুটা পলাশ এর কাছ থেকে কিছুটা নিজের পরিবেসে বদলে গেছে পথ চলার রাস্তাটা। মেয়েটাকে নিয়ে, সিধে সরল শিশু গুলোকে নিয়ে নতুন আলোর সন্ধানে এগিয়ে চলেছি। মনে মনে সঙ্কল্প করেছি ওদের মনে পৃথিবীর সবটুকু আলো পৌছে দেব একদিন।
নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছি।তাই এক পরম শা্ন্তি অনুভব করি মনের অন্তরালে।
(৩)
কোন কাজে মন বসাতে পাড়লাম না। ঘুরে ফিরে সেই রাতের কথা।
সেদিন জোর করে পলাশকে কলেজ কামাই করালাম।সোনাই এর জ্বর। কাজের মেয়ের ভরসায় রাখা যাবে না। কাজে মন লাগাতে পাড়লাম না। একটু আগেই বাড়ি চলে এলাম। বাড়ি তালা বন্ধ।পুরনো চাবি দিয়ে দরজা খুললাম। বাড়ি নিঃশব্দ। মেয়েটা নিজের ঘরে অকাতরে ঘুমচ্ছে। কাজের মেয়ে নীতুর কোন পাত্তা নেই। বেড রুমের দরজা বন্ধ। দরজা ধাক্কা দিতেই, আমাদের বহুদিনের পরিচিত বন্ধু বা ছোট বোন বলা যেতে পারে মালা আর পলাশ বেড়িয়ে এলো। হতবাক!
সেই মূহু্র্তে তিন বছরের মেয়ে নিয়ে মায়ের কাছে চলে আসি শান্তিনিকেতন। আমাদের কোন আইনের কাঠ গোড়ায় দাঁড়াতে হয়নি। কেউ কাউকে কোন প্রশ্ম করিনি।মালা বিবাহিত। পাকাপাকি ভাবে আমেরিকায় বসোবাস করে। কোন সন্তান ছিল না।এর পর ওর খবর কিছু জানতাম না বা জানার চেষ্টা করিনি। পলাশ মাঝে মাঝে মেয়ের কাছে আসত। শা্ন্তিনিকেতনের গেস্ট হাউসে থাকতো। পনেরো বছরে দু-এক বার দেখা হয়েছে।বহু বছর বাদে কফি হাউসে মুখো মুখি হোলাম।
ভাবতে কোন দ্বিধা নেই এখনও সুপুরুষ। মাথার চুল সাদা কালো। ঝুলপি সাদা কালো সোনালি রং। রমা নিজের অজান্তে আয়নায় নিজেকে দেখে নিল।নিজের মনেই বলে ফেলল, কেউ কি বলবে আমার এত বড় মেয়ে। হেসে ফেলল বালিশে মাথা গু্ঁজে।
ভোর বেলা ঘরের বাইরে গিয়ে দেখি, সোনাই খাবার টেবিলে বসে।–কী রে এত সকাল সকাল। কোথায় যাবার আছে। বলল, “না মা, তোমার সাথে একটু কথা আছে।আমার কথা একটু ধৈয্য ধরে শুনতে হবে। তোমার কথাও আমি শুনবো।
বাবার সাথে বেশ কিছু দিন আমার যোগাযোগ আছে।শরীর খুব খারাপ।তার চেয়ে কঠিন সমস্যা পুরনো ঘটনা।বাবার সাথে মালা মাসির বিয়ের কথা ছিল.। হয়তো তুমি জানো। বাবার পছন্দ ছিল না। ঠাকুমার কথায় রাজি হয়ে ছিল।ওদের সংসারের হাল এমন অবস্থায় পৌছায়, মালা মাসির বাবার বেশ কিছুদিন জেল হয়। বিয়ে ভেঙে যায়।মালা মাসি বাধ্য হয় এক অসুস্থ মানুষকে বিয়ে করে এবং আমেরিকা চলে যায়।
এর পরের ঘটনা তোমার সাথে বাবার পরিচয় ও বিবাহ বন্ধন। একটি সুখী পরিবার। মালা মাসির স্বামীর প্রচুর টাকা। মালা মাসির পরিবার আজ দা্ঁড়িয়ে গেছে।মানুষটা কোনদিন সন্তান দিতে পারেন না।অক্ষম!সেদিন বাবার কাছে একটি সন্তন চেয়ে ছিল। কথা দিয়েছিল, কেউ জানতে পারবে না কেবল আমার বাঁচার রসদ। মানসিক অবস্থা এতই খারাপ ছিল, বাবা ফেরাতে পারেনি। তখন তোমাদের এক ভরপুর আনন্দের সংসার। তোমাকে ও আমাকে হারাতে চাইনি। আমার মাত্র দু বছর বয়স। আমেরিকা ফিরে যাবার আগে ওর বাড়ি সাতদিন ছিল। তুমি তখন শান্তিনিকেতনে আমাকে নিয়ে ছিলে।।বাচ্ছা হবার পর মালা মাসি চার দিন বেঁচে ছিল।বাবার সাথে আর কোন যোগাযোগ ছিলনা। ওর স্বামী মারা যাবার সময় সব কিছু জানিয়ে যান। বাবাকে ওখান থেকে জানায়। নিয়ে আসতে বাধ্য হয়। নাম এনা। বয়স চৌদ্দ। একেবারে আমার মতো দেখতে।
তুমি একজন সমাজ সেবিকা। শত শত অনাথ শিশু, পরিচয় হীন শিশুর জন্য লড়াই করে চলেছ।একই বাবার দুই মেয়ে। মা কেবল আলাদা। গ্রহন করতে পারবেনা”.
(৪)আমি দু-হাত দিয়ে ওকে জরিয়ে ধরলাম। বললাম, “জানি না কতদুর মেনে নিতে পারব তোমার বাবাকে, তোমার বোন এনাকে। একদিন তোমায় কলে নিয়ে অনেক কেঁদেছি। তোমার বাবা বহুবার এসে ফিরে গেছে।বহু চিঠি দিয়েছে। খুলে দেখেনি। সমাজ সেবা কাজে যখন নিজেকে লিপ্ত করলাম। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম ঈশ্বরের কাছে,মানুষের কাজে যদি কোন দিন আমাকে প্রয়োজন হয় সব বাঁধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাব।দায়িত্ব তোমায় দিলাম। আমার দিক দিয়ে তোমাদের কোন অসুবিধে হবে না।কেবল আমার ঘর এবং ছাদ আমার থাকবে”।
সোনাই হৈহৈ করে বাবা, মেয়ে নিয়ে চলে এলো। প্রথম প্রথম একটু অসুবিধে হতো। বহুদিন বাবা মারা যাবার পর পুরুষ মানুষ কেউ ছিল না। বিশেষ করে খাবার টেবিলে, সামনা সামনি পড়ে গেল, আমার অসুবিধে হতো।পলাশের হতো না।
যেমন রেখে এসে ছিলাম ঠিক সেই রকম। বয়স নামক সংখ্যাটাই বেড়েছে।একদিন কাজে বেড়চ্ছি দেখি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। আমাকে উদ্দেশ্য করেই বলছে, “আগের মতো জ্বর, মাথা ব্যাথা হয় না”। গেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে।হাতটা সজোড়ে টেনে বেড়িয়ে পড়লাম। বলল, “আশা করেছিলাম পাঞ্জাবিটা ছিঁড়ে বেড়িয়ে যাবে সিনেমার সুচিত্রা সেন এর মতো”। রিস্কা চালকও হাসতে শুরু করল।অনেক দূর পর্যন্ত হো হো করে হাসির শব্দ কানে এলো।
এই ভাবে এগিয়ে চলল জীবন। মেয়ে দুজনে বড় হয়ে গেল। বিদেশ চলে গেল।
আমরা দুজনে। সামনেই দোল। শান্তিনিকেতনে যাতায়াত বেড়েই গেল।আমার চেয়ে পলাশের চাহিদাটা বেশি ছিল। একবার ঢুকলেই হলো। ছেলে মেয়েরা চারিদিক থেকে ঘিরে ধরতো। সকলের সামনে আমার হাত ধরে টেনে আনতো।– “এই শোন, বউ পাশে থাকবে, তার চার দিকে তোরা।বহুবার বলেছি এই রকম করলে এক সাথে আসব না”।
একদিন শান্তিনিকেতন থেকে ফিরছি। সূর্য পশ্চিমে অস্ত শিখরে।আকাশ জুড়ে লাল আভা। টুপ টুপ করে পলাশ ফুল পড়ছে বৃষ্টির মতো। আমার কাঁধের ওপর একটা হাত রেখে বলল, “বসন্ত আবার এলো। আজ রাতে যে যাই বলুক আমি হোলি খেলবোই খেলব”!ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের হাসির হুল্লোড়। কি আর অভিমান করব এই অজানা পলাশের ওপর।