এই সংখ্যার সূচী.....
Friday, August 26, 2022
প্রাচীন আছো যারা ।। সোমনাথ ঘোষ
SA
প্রাচীন আছো যারা
সোমনাথ ঘোষ
দুনিয়াটা বদলে গেছে
বদলে গেছে মানুষ
পুরোন দিনের আছে যারা
এই সত্যিটাই বোঝে না তারা।
তারা ভাবে তাদের মতই
চলবে জগৎ সংসার
ভরাবে থলি বাজার গিয়ে
দু দশ টাকা সঙ্গে নিয়ে।
রাশভারী কপট গাম্ভীর্য নিয়ে
ঘর্মাক্ত কলেবরে ফিরবে যবে বাড়ি
ছেলে মেয়ে বাড়ির সবাই যেন
ব্যস্ত থাকবে ভারী।
না চাইতেই জল আনবে
সঙ্গে তালপাতার এক পাখা
করবে বাতাস শরীর পরে
নির্দ্বিধায় মাথা নত করে।
গিন্নি তখন ব্যস্ত ভীষণ
পাক ঘরেতে ফুটছে ভাত
আটপৌরে শাড়ির পরে
হলুদ রংয়ের ভর্তি ছাপ।
স্নান ঘরেতে থাকবে ভর্তি
পরিশ্রুত বালতি দুয়েক জল
সেই জলেতেই কর্তা মশাই
করিবেন রোজের অবগাহন।
স্নানটি সেরে শুদ্ধ হয়ে
গৃহ দেবতাকে সেরে প্রনাম
পঞ্চব্যাঞ্জন সহকারে কর্তা মশাই
সারবেন দিনের আহার।
সেই দিন আর নেই রে ভাই
এই কথাটাই বোঝাতে তাই
নতুন যুগের সাথে মিলিয়ে চল
সোমনাথ ঘোষ
অবসর প্রাপ্ত ব্যাঙ্ক কর্মচারী।
শিক্ষাগত যোগ্যতা। বি কম।
নিবাস -চন্দননগর।
নদীর জলে নৌকায় বধূ ।। জাফর মোল্লা
SA
নদীর জলে নৌকায় বধূ
জাফর মোল্লা
নদীর পারে বাপের ঘরে
গাঁয়ের বধূ যাবে বলে।
নৌকা নিয়ে মাঝি আসে
ভাসিয়ে নদীর জলে।।
দীর্ঘ সময় বাপের আলয়
ছেড়ে এসেছে।
বাপের ঘরে যাবে এবারে
মন নেচেছে।।
অনেক দিন পর পিতা মাতার
দেখবে হাঁসি মুখ।
আনন্দে তাই নাচছে হৃদয়
মনের মাঝে সুখ।।
হেলে দুলে নৌকা চলে
গাইছে মাঝি গান।
ঘোমটা টেনে গানটি শুনে
জুড়ায় বধূর প্রাণ।।
নদীর জলে নয়ন মেলে
গাঁয়ের বধূ কয়।
তাড়াতাড়ি ভেড়াও তরী
আমার বাপের গাঁয়।।
মেঘের ভেলা চারিগালা
ওঠে যদি ঝড়।
মাছ নদীতে নৌকা ডুবলে
সব হবে গড়বড়।।
মেঘ চারিধার তোবু ধীবর
টানছে নদীই জাল।
বান যদি আসে যাবে সব ভেসে
এমন তাদের হাল।
বধূর কথায় মাঝি নৌকায়
পাল তুলে দেয়।
নৌকা দুলে বাতাসের তালে
পৌঁছে যায় গাঁয়।।
বড়ো খুশি মুখে হাঁসি
মেয়েকে দেখে সবে।
বহুদিন পর বাপ মা'র আদর
মেয়ে আজ পাবে।।
জাফর মোল্লা
জয় নগর,দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা
Education qualification:- BSC Bio,(DIAM,RMP )
প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জিত হবে সেই দিন ।। তসলিমা লস্কর
SA
প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জিত হবে সেই দিন
তসলিমা লস্কর
স্বাধীনতা চাই, -স্বাধীনতা-,
প্রকৃত স্বাধীনতা বলবো আমরা কাকে?
এটাই কি? বলবো সর্বোত্তম
সীমাহীন স্বাধীনতাকে?
এমন কল্পনা নিছক বোকামি,
কোনো ধর্ম নয়, মনুষ্যত্ব দিয়ে অনুধাবন করুন!
কোন সীমা টি ন্যায্য এবং দামি!
সাংগঠনিক আইনগুলো যত জটিল করে রাখে
তাইতো সব স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকে।
যদি মনুষ্য হয় অসৎ আনুগত্য আর
পাপাচারের দাস।
এটাই তো পরাধীনতা দেশের সর্বনাশ।
এ পুরুষশাসিত সমাজে
নারীরা আজ পুরুষদের অধীন।
লাঞ্ছিত, অপমানিত, অত্যাচারিত হচ্ছে
মেয়েরা দিনের পর দিন।
কেমন করে বলছেন আপনারা?
দেশ হয়েছে স্বাধীন।
নর ভক্ষক কিছু দানবের দল
যদি ধর্ষিতার স্বাধীনতাকে
করে রাখে অর্থহীন।
তাহলে স্বাধীনতা শব্দটি একদিন উঠবে
ঐ কাঠগড়ার সম্মুখীন।
মানব জাতি কোন না কোনো
পিতা-মাতা থেকে সৃষ্টি।
সেই অর্থে আমরা সকলে সকলের ভাই বোন।
অগ্রজগতের পথ হোক অনুজগতের নিদর্শন।
তাই আসুন সেই বদান্য ব্যক্তিটির জন্য
কাজে পড়ি নেমে-
যে নিজের অধিকার জানে,
যে নিজের কাজ জানে,
যে ভালো মন্দের পার্থক্য করতে জানে,
যে দেশপ্রেম জানে,
যে মানব প্রেম জানে,
যে আমি আপনি ভুল করলে-
প্রতিবাদ করতে জানে,
উপযুক্ত প্রতিবাদী ভাষা জানে,
যে প্রয়োজনে ত্যাগ স্বীকার করতে জানে,
যে সৎ থাকার মর্ম জানে,
যে সৎ বানানোর কারিগরি বিদ্যা জানে,
যে ভালো স্বপ্ন দেখতে জানে, ও অন্যদের ভালো স্বপ্ন দেখাতে জানে,
অগণিত জনতা ঐক্যবদ্ধ হবে যার
ভালবাসা ও সততার টানে।
সেই রাজর্ষি কে দাঁড় করান,
জনসম্মুখে এনে।
চাই স্বাধীকার থেকে প্রাপ্ত স্বাধীনতার মুক্তি।
চাই চিন্তা-চেতনা, কর্মের মিলন ও ভক্তি।
চাই একতা, অহিংসা, সম্ভ্রম,
জন্মদাত্রির প্রতি অনুরক্তি।
চাই প্রেম, প্রীতি, দুর্নিবার ও ত্রাসহীন ধীশক্তি।
আর চাই মানবিকতা, মনোবল, মমত্তো, মহার্ঘ,
ও সচেতন মনোবৃত্তি।
তবেই এদেশের জনগণ পাবে
অধীনতা থেকে নিষ্কৃতি।
তবেই অবসান ঘটাতে পারবে
দুশমন দুষ্কৃতি।
দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও আন্দোলনের বিনিময়ে
ভারতীয়রা পেয়েছে স্বাধীন ভূখণ্ড।
তাদের এই মহৎ কার্য,
কিছুতেই হতে দেবে না পন্ড।
বাঙালি আশাবাদী জাতি তারা পথ চলতে অবিচল।
তারা একদিন নারীর অধিকার করবে সচল।
লব্ধ স্বাধীনতাকে জ্বলজ্বলে নক্ষত্রে পরিণত করবে একদিন।
আমাদের আশা-
প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জিত হবে সেই দিন।
তসলিমা লস্কর।
- কুলতলি
দক্ষিণ 24 পরগনা
অতুলনীয় ।। অনুপ কুমার জানা
SA
অতুলনীয়
অনুপ কুমার জানা
আমি শ্রষ্টা , আমি শ্রেষ্ঠ ,
নব নব সৃষ্টিতে সর্বদা মাতি ;
আমি সবজান্তা , আমি সর্বজ্ঞানী ,
বিশ্বজুড়ে তাইতো আমার এত সুখ্যাতি ।
আমি কবি , আমি লেখক ,
আমি যা ভাবি তাই হয়ে যায় কাব্য ।
আমি সমাজসেবক , আমি কর্তব্যপরায়ন ,
আমি সর্বদাই পালন করি নিজের কর্তব্য ।
আমি জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড , আমি দিবাকর ,
আমি রাতের অন্ধকার দূর করে ফোটাই আলো ;
আমি দরদি , আমি মায়াবী ,
কোমল হৃদয়ে প্রত্যেকের করি ভালো ।
আমি বৃষ্টি , আমি ঝর্ণা ,
ঝরঝর ঝরে প্রকৃতির বুকে আঁকি শ্যামলা ;
আমি উল্কা , আমি আগ্নেয়গিরি ,
উষ্ণ লাভা ছড়িয়ে রূদ্ধ করি শয়তানের খেলা ।
আমি তুষার , আমি হিমবাহ ,
সংসার সমুদ্রে মেকি কৃতিত্বকে করি ভরাডুবি ।
আমি সত্য , আমি ত্রেতা , আমি দাপর ,
কলির জঘন্য কালিমা মুছে দেবার কথা ভাবি ।
আমি শুকতারা , আমি ধ্রুবতারা ,
অসীম সমুদ্রে নিঃসহায় নাবিককে পথ দেখাই ।
আমি হিন্দু , আমি মুসলিম , আমি খ্রীষ্টান ,
আমি শুধুই মানুষ , জাতের গোঁড়ামী দু'পায়ে মাড়াই ।
আমি কাঞ্চনজঙ্ঘা , আমি হিমালয় ,
উত্তরের শৈত্য প্রবাহ থেকে রক্ষা করি ভারতকে ;
আমি বিপ্লবী , আমি দেশপ্রেমী ,
আমি চিরকাল ভালোবাসব আমার দেশের মাটিকে ।
আমি বৈজ্ঞানিক , আমি এলিয়েন ,
মস্তক আমার ক্ষুদ্র নয়কো , অতি অসাধারণ ।
আমি দীর্ঘায়ু , আমি অমর ,
মনুষত্বের উন্নতিতে রব চিরকাল , হবে না মরণ ।
আমি বাস্তব , আমি বিবেক ,
আমি ছল-চতুরীকে প্রশ্রয় দিই না ;
আমি সত্য , আমি স্পষ্টবাদী ,
আমি ভণ্ড কলমের ভাষাতে প্রতিবাদ জানাতে
ভয় পাই না ।
অনুপ কুমার জানা
পশ্চিম মেদিনীপুরের ভূঞ্যাড়া গ্ৰামের শীতল চন্দ্র জানা র পুত্র কবি অনুপ কুমার জানা পেশায় ফার্মাকেমিস্ট্ এবং নেশা ছোট বেলা থেকেই কবিতা ও গল্প লেখার।
শিক্ষা : বি এস পি অনার্স (রসায়ন)
Friday, August 19, 2022
মৃত্যু বনাম ভালোবাসা ।। সুপ্রিয় ভট্টাচার্য
SA
মৃত্যু বনাম ভালোবাসা
সুপ্রিয় ভট্টাচার্য
আমাদের পৌরাণিক উপাখ্যান গুলির অন্যতম একটি " সাবিত্রী সত্যবান।" সাবিত্রী তখন সদ্য যমরাজের সঙ্গে লড়াই করে মৃত স্বামীকে ফিরে পেয়েছেন। আত্মীয় স্বজন ও রাজ্যবাসীর মনে খুশীর হাওয়া বইছে সেসময় একদিন সাবিত্রীর পিতা অশ্ব পতি নিজ কন্যাকে বলেন যে আমি একটা কথা ভেবে বিস্মিত হচ্ছি যে তুমি মহা পরাক্রমী যমরাজ কে কোন শক্তিতে পরাস্ত করলে! স্মিত হেসে সাবিত্রী তার উত্তরে যা বলেছিলেন তা এক চিরকালীন সত্য হয়ে আছে -" সত্যবান এর মা আমাকে একটা কথা বলেছিলেন : যে ব্রাহ্মণেরা সত্যবান এর কুষ্টি তৈরি করেন তার মধ্যে একজন ছিলেন খুব বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ। তিনি
কুস্টির শেষে একটা মন্ত্যব্য করেছিলেন - মৃত্যুর চেয়ে শক্তিশালী যদি কিছু থাকে
তবে তার দ্বারাই সত্যবান এর মৃত্যুকে এড়ানো যেতে পারে। এই মন্তব্য ই আমায় শক্তি জোগায়। আমার ভালবাসা মৃত্যুর চেয়ে ও শক্তিশালী।"
সুপ্রিয় ভট্টাচার্য
কি রেখেছ ।। সোমনাথ ঘোষ
SA
কি রেখেছ
সোমনাথ ঘোষ
কতদিন আর বাঁচবে তুমি
খুব বেশি হলে হয়তো আশি
ঠিক আছে হয়তো কয়েক বছর বেশি।
প্রশ্নটা আমার বন্ধু অন্য খানে
এতো গুলি বছর থাকলে ধরার পরে,
কিন্তু কি রেখে গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের তরে?
কি বললে, সঞ্চয় করেছ কিছু কম নয়,
ধন সম্পদ তোমার আত্মজের তরে।
যেন থাকে তারা সুখে জীবন ভরে
ও এইটাই তোমার জীবনের সঞ্চয়?
আত্ম সুখে আর নিজ স্বার্থের তরে
কাটিয়ে দিলে বছর গুলো এ ধরার পরে
রাখলে না তুমি কিছু তাদের জন্য
রয়ে গেল যারা সমাজের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
সোমনাথ ঘোষ
অবসর প্রাপ্ত ব্যাঙ্ক কর্মচারী।
শিক্ষাগত যোগ্যতা। বি কম।
নিবাস -চন্দননগর।
কিসের তরে ।। সঞ্জিত কুমার বর্মণ
SA
কিসের তরে
সঞ্জিত কুমার বর্মণ
তুমি কিসের তরে প্রেমে দুর্বল ?
কারোর রুপ চেহারায় আত্ববিহ্বল -
নতুবা ডাগর ডাগর চোখের কাজল -
নতুবা সুদন্তী চাঁদনী হাসোজ্জ্বল।
তুমি কিসের তরে প্রেমে দুর্বল ?
কারোর গুণবিচারী দর্শনধারী মনোবল -
নতুবা দন্ডায়মান নীতিসংগত প্রবল -
নতুবা জীবনধারা প্রাণবন্ত সুশৃঙ্খল।
তুমি কিসের তরে প্রেমে দুর্বল ?
সুশ্রী মনের মিশ্রিত অদৃশ্য জল -
নতুবা মনের আর্কষণ ও চঞ্চল -
নতুবা সরলতার তহবিল মহল।
তুমি কিসের তরে প্রেমে দুর্বল ?
কাকতালীয়ভাবে কালো কেশ ছলছল -
নতুবা নয়নাভিরাম তিল উজ্জ্বল -
নতুবা পাহাড়ি কন্যার মত কোলাহল।
সঞ্জিত কুমার বর্মণ
২৫ শে অক্টোবর ’ ১৯৮৫ সালে গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলাধীন ফুলবাড়িয়ার নাবির বহর গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে। পিতা: ব্রজেন্দ্র চন্দ্র বর্মণ, মাতা: সরজা বালা বর্মণ।
শিক্ষাজীবন থেকে সাহিত্যের প্রতি প্রচণ্ড অনুরাগ আর ভালবাসার সুবাদে লেখালেখি শুরু। পড়াশুনা ও করেছেন ইংরেজি সাহিত্যে। লিখতেন কবিতা, ছড়া ও ছোট গল্প সহ গ্রামীণ জীবনের পটভূমিকায় নানান সমস্যার কথা। নির্সগ প্রেমিক কবি সঞ্জিত কুমার বর্মণ মা মাটি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। ইতিমধ্যে কতিপয় দৈনিক পাতায় তার সমসাময়িক বিষয়ের উপর ভিত্তি করে কবিতা প্রকাশিত হয়ে পাঠক নন্দিত হয়েছে।
পেশাগত জীবনে সঞ্জিত কুমার বর্মণ উত্তর লস্কর চালা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে ইংরেজি ’র প্রভাষক হিসেবে নিয়োজিত আছেন।
ঝরে পড়লো পাতা ।। তসলিমা লস্কর
SA
ঝরে পড়লো পাতা
তসলিমা লস্কর
(১)
সেদিন বর্ষার ঝড় বাদলে সালাম খুঁড়ো অফিস কাছারি সেরে রওনা দিলেন বাড়ির উদ্দেশে। মাইল সাতেকের রাস্তা, ঝাউতলা বাসস্ট্যান্ডে নেমে তাঁর বাড়ি আধা কিলোমিটার হাঁটা রাস্তা। তখন সূর্য প্রায় অস্তমিত বাস স্ট্যান্ডে নেমে হাঁটতে শুরু করলেন,। আর বৃষ্টি হচ্ছে না ,তবে হালকা ঝড়ো বাতাস বইছে ,মাঝে মাঝে হাওয়ার দমকানি । বাড়ির সম্মুখে মোস্তবাগান বাড়ি পেরিয়ে সালাম খুঁড়োর বাড়ি । বাগানে প্রবেশ করতেই,এক দমকা হাওয়াতে যেন সমস্ত গাছের পাতা অঝরে ঝরে পড়ল খুঁড়োর দেহাঙ্গে। কেমন যেন এক আলাদা অনুভূতি। বাড়িতে পৌঁছে তিনি শুনলেন মেজ বৌমার একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তান হয়েছে। তিনি আদর করে নাতনিকে কোলে নিয়ে কি নাম রাখা যায় তা নিয়ে ভাবছিলেন। ,মনে হলো সেই পাতা ঝরার দৃশ্যটা ।বললেন, নাতনির নাম থাকবে 'পাতা'। বাড়ির অন্যরা বললেন এটা কোন নাম হলো নাকি! সালাম খুড়ো বললে ,এটা নাম না হলেও আমার পছন্দের।
(২)
আজ পাতার বয়স ১২ বছর। আজ তার ঠাকুরদা বেঁচে নেই, যা সময় সম্পত্তি ছিল সর্বস্ব শেষ করে বাবা ও অকালে চলে গেছেন চিরো ঘুমের দেশে । ঠাকুমা ,কাকা ,জেঠা,পিসিমা কেউ বেঁচে নেই। পাতার মায়ের বিয়ের আগে তার দিদিমা মারা গেছেন। পাতার দাদু আর বিয়ে করেননি।মেয়ে রোকেয়া কে বিয়ে দিয়ে কিছুদিন পর পাতার দাদু ও মারা গেলেন। তাদের দেখাশোনার করার মত কেউ নেই । নেই কোথাও মাথা গোঁজার ঠাই। আছে কেবল তারা ছয় ভাই বোন ও তার মা । পাতার দাদা সুহান সবার বড় ,তারপর পাঁচ ভাই বোন খুব ছোট ছোট। সংসারে দুর্দিন রোজগার করার মত কেউ নেই, সাত জন সংসারে । পাতার দাদা ১৪ বছর। তারপর পাতা মেজো। পাতাও তার দাদা লোকের বাড়ি পেট-ভাতে কাজ করে। পাতার মা কোন প্রকারে, এক বেলার খাবার যোগায়,। আবার কখনো বা শাপলা, শাপলা মূল সিদ্ধ ,কখনো বা শাক সিদ্ধ , ফ্যান (ভাতের মাড়) ,কোন সময় জলে লবন গুনে এইভাবে আর কতদিন চলবে!
"পাতার মা আগে ছিল ধনী লোকের একমাত্র দুলালী। জমিদার বাড়ির বউ "। "কিন্তু এখন নিয়তি তাঁকে করেছে সর্বস্বান্ত"। একসময় গরিবরা তাঁর দুয়ারে হাত পাততো ।এখন অন্যের কাছে হাত পাততে তাঁর লজ্জা করে । কিন্তু তাঁর সাত, সাত টি পেটের ভার কে নেবে ! "শেষে অদৃষ্ট তাকে টেনে নিয়ে গেল অন্যের দ্বারে"।
(৩)
সকালে পাতাও তার দাদা সুহান লোকের বাড়ি কাজ করে এসে বাড়ি ফিরে ছোট ভাইবোনদের খাইয়ে, স্নান করিয়ে, কিছু খেলনা দিয়ে তাদের বাড়ির মধ্যে তালা দিয়ে রেখে দু' ভাই বোন স্কুলে যেতো। পাতার মা যেতো লোকের বাড়ি কাজ করতে। প্রায় সমস্ত কিছু সামলাতে হতো পাতা কে। এইভাবে অতি কায়ক্লেশে দিনপাত হয়। তবুও তার মধ্যে থেকে তারা কিছু টাকা জমিয়েছে সুহান কে একটা নৌকা কিনে দেবে বলে । নদীতে মাছ ধরলে ভালো টাকা আয়। কিন্তু ওই সামান্য টাকাতে তো আর নৌকা হয় না! পাতার মা জমিদারের হাতে পায়ে ধরে একটা মোটা টাকা সুদ নিলেন,। ভাবলেন নৌকাতে সকলে মিলে আয় করলে ৮-৯ মাসের মধ্যে শোধ দিয়ে দেবেন । এইভাবে কোনক্রমে একটা ভালো নৌকা মিলল।
পাতার ছোট ছোট ভাইবোনেরা হাঁড়ি নিয়ে নদীর চড়ায় শঙ্খ, সামুদ্রিক ঝিনুক তুলততো,আর সুহান, পাতা, পাতার মা তিনজন মিলে মিনজাল (বাগদা চিংড়ির বাচ্চা ধরার জাল) পেতে 'মিন ('বাগদা চিংড়ির বাচ্চা) ধরতো। এই মিনের সঙ্গে কুচো চিংড়ি মাছ ও পড়তো ঝুড়ি ঝুড়ি, সেগুলো নদী বাঁধের ঢালে নেপা- পোঁচা করে রোদে শুকিয়ে ১৫-২০ বস্তা করে টাল দিয়ে রাখত বারান্দায়। এইভাবে মিন (বাগদা চিংড়ির বাচ্চা), শুকনো চিংড়ি, ঝিনুক, শঙ্খ প্রভৃতি বিক্রি করে সংসার কিছুটা স্বচ্ছল হলো। কিন্তু তাদের পক্ষে অত বড় সংসার চালিয়ে অতগুলো টাকা দেনা মেটানো অতি কঠিন হয়ে পড়ল। জমিদার বারবার তাগাদা করতে আসছে।
তখন পাতা ক্লাস ফাইভে পড়ে তার বয়স ১৪ বছর।
(৪)
একদিন অকস্মাৎ রহমত ঘটকের প্রবেশ, পাতার মাকে এসে বললেন,-''তোমার মাইয়াটারে বিয়া দিবা''।
পাতার মা - "হ্যাঁ দেব কিন্তু !মেয়ে তো এখন ছোট!"
রহমত ঘটক - ''যদি কিছু মনে না লাওতো একখান প্রস্তাব লইয়া আইছিলাম''।
পাতার মা - ''মনে করার কি আছে বলুন…''
রহমত ঘটক - ''কইছিলাম কি পাতার আম্মা ঐ অজিত খোঁড়াগো কইছিলো যে ওনার স্ত্রীর ঐ নাড়ির দোষ সংসার ধর্ম হইতেছে না তাই ঝামেলা কইরা এই- ছয় সাইত মাস চইলা গেছেন,আর আসবেক লাই। তার সংসার করার ক্ষমতা নাই তো আসবেক কিল্লাগি। তোমার মাইয়াটারে যদি বিয়া দাও তো উনি কইছিলেন তোমাদের দেনাদানি যা কিছু আছে সবগুলো মিটাইয়া দিবেক"।
পাতার মা - "না না আমার মেয়ে এখন ছোট, ওনার চার-চার টে বাচ্চা, ওনার স্ত্রীর তো ডিভোর্স হয়নি, আমার মেয়েকে বিয়ে দেব না। আমাদের দেনা আমরা মিটিয়ে নেবো"। রহমত ঘটক প্রস্থান করলেন।
পরদিন জমিদার নিজেই পাতাদের বাড়িতে উপস্থিত বললেন,- "অনেক সহ্য করেছি আর এক মাসের সময় দিচ্ছি ,আমার সম্পূর্ণ টাকা সুদে-আসলে চাই। নইলে এই মাসের ৩০ তারিখে তোমাদের নৌকা জাল আমি নিয়ে নেব, সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করে তবেই নৌকা জাল নিয়ে আসবেন"। পাতার মা কাকুতি মিনতি করে বললেন-, "বাবু সাপ আমার নৌকা জাল নিয়ে নিলে আমার সংসার চলবে কিভাবে !আর আপনার টাকা বা কিভাবে পরিশোধ করবো। দয়া করে আর দু -চার মাস সবুর করুন"। জমিদার বললেন -"এটাই আমার শেষ কথা" বলেই হন হন করে বেরিয়ে গেলেন।
(৫)
অজিত খোঁড়া তার পরের দিন আবার রহমত ঘটককে পাতার মায়ের কাছে পাঠালেন। তিনি এসে বললেন, -''কেন এত দুশ্চিন্তা করছোস মা কইলাম মাইয়াটারে বিয়া দাও সমস্ত চিন্তা দূর হইবেক,- ঋণ সব শোধ হইবেক,-মাইয়াটাও একটা ভালো পোলাপানের হাতে পাত্রস্থ হইবেক'। 'পলাটা কি খারাপ হুনি? হয়তো পা একখান সামান্য টাইনা টাইনা হাইটটে, সুঢম সুশ্রী চেহারা।ওনার পলা মাইয়া কেউই ভি খুব ছোট না তাদের কারো ভি পায়খানা প্রসাদ পরিষ্কার করতে হইবেক লাই, তাদের খাওন তারা খাইবেক''।
পাতার মা,-"এখন আপনি বাড়ি যান আমার মন ভালো নেই"। রহমত ঘটক যেতে যেতে বললেন, ''ভাইবা দেখিস মা''-
পাতার মা মনে মনে ভাবলেন এটা কখনোই সম্ভব নয় । আমি নিজে হাতে মেয়ের জীবনটা নষ্ট করতে পারিনা।
(৬)
দু' পাঁচ দিন পর কিছু দুষ্ট প্রকৃতির লোক, লোক মারফত খবর দেয় "ওরা তোমার মেয়েকে দু' ভরি সোনার গহনা গড়িয়ে দেবেন, তোমার সমস্ত দেনা শোধ করে দেবেন, তোমার সন্তানদের সারা জীবন দেখাশোনা করবেন তোমার মেয়েকে বিয়ে দাও। আর যদি বিয়ে না দাও তো রাতে লোক দিয়ে তোমার মেয়েকে উঠিয়ে নিয়ে যাবেন, তোমাদের ঘর জ্বালিয়ে দেবেন রাতের অন্ধকারে । তোমরা তো কটা মেয়ে মানুষ থাকো ! বাচ্চারা ও তো সব ছোট ছোট ঠেকাতে পারবে তো"? এইভাবে গোপনে নানা ভাবে হুমকি দিয়ে দলিত করতে থাকে। কোনো নেতার সাহস নেই সামনে গিয়ে কিছু বলার,অসহায় কে পিষে মারতে চায়, কথায় বলে ''জোর যার মুলুক তার''।
(৭)
দেখতে দেখতে এ মাসের শেষ হতে কয়েকটা দিন মাত্র বাকি বাধ্য হয়ে মেয়ের বিয়ে দিতে রাজি হয়ে গেলেন পাতার মা। কিন্তু পাতা তো রাজি না, ভীষণ কান্নাকাটি করছে পাতা। তাকে একদিন মিথ্যা কথা বলে নিয়ে যাওয়া হলো কাজির অফিসে । নেই তার স্নান করানো ,নেই তার গায়ে হলুদ, নেই কোন নতুন ড্রেস। কাজী সাহেব শুনলেন মেয়ে রাজি নয়। তিনি বললেন, - ''নিকের মেয়ে (বিবাহিত মেয়ে) নিজেই রাজি, আর বিয়ের মেয়ে (বিবাহযোগ্য মেয়ে) বাপ- মা রাজি, মেয়ে তখন আপনি রাজি'' । কাজী সাহেব বিয়ে দিয়ে দিলেন।
কিছুদিন পর তার প্রথম স্ত্রীর কানে পৌঁছলো স্বামী বিয়ে করেছে। শুনেই তৎক্ষণাৎ বাপের বাড়ি থেকে চলে এলেন স্বামীর কাছে ।শুরু হলো পাতার উপর অকথ্য অত্যাচার। তার এখন খেলার বয়স, সে সংসার সম্বন্ধে কিছুই বোঝেনা,সে সতীনের হিংসা অত্যাচার আর সইতে পারলো না।
(৮)
অজিত খোঁড়ার প্রথম স্ত্রীর চাচার বাড়ি পাতার বাপের বাড়ির পাশেই । তাঁদের মেয়ে এতদিন বাপের বাড়ি ছিল। স্বামী নেবে না, সেও আসবেনা, তাই পাতার বিয়ের সময় তাঁরা কিছুই বলেননি ।যখন তাঁদের মেয়ে স্বামীর কাছে ফিরে এলেন তখন থেকে তাঁরাও পাতার মা ভাই বোনদের উপর অত্যাচার করতে শুরু করলেন। তাঁরা যখন তখন কারণে-অকারণে অকথ্য ভাষায় গালাগালি, কথায় কথায় বলেন- যেখানে প্রথম স্ত্রীর ডিভোর্স হয়নি সেখানে মেয়ে বিয়ে দিয়েছিস কেন? এখন মেয়েকে ছাড়িয়ে নে নইলে দেখি তোরা কত অত্যাচার সইতে পারিস। বাধ্য হয়ে পাতার মা এক মাসের মধ্যে পাতাকে ছাড়িয়ে আনতে বাধ্য হলেন। দিলো না কোন দেনার টাকা , কোন গহনা।নৌকা জাল এখন জমিদারের হাতে। নেমে এলো আরো দুর্দিন। এইভাবে কেটে গেল আরও পাঁচ -সাত মাস
(৯)
পাতার আরো একটা বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে এলেন তাদের গ্রামের সাখাওয়াত বিচারক তিনি বললেন-, "ছেলেটা আমাদের পুরানো বাড়ির ওখানে বাড়ি। আমি তাদের স-পরিবারের চিনি ও জানি ।ছেলেটা আইবুড়ো ছেলে সুন্দর দেখতে, আমি তাদের সব কথা বলেছি। বলেছি যে, মেয়েটা খুব সুন্দরী, পড়ালেখা ও জানে কপাল খারাপ একটা ঘটনা ঘটে গেছে ,আমি সব বলেছি, ওরা রাজি, ওদের কোন দাবি-দাওয়া নেই। বিয়েতে কোন খরচাও করতে হবে না। কেবলমাত্র তারা মেয়েটা পছন্দ করলেই হবে আর তোমার মেয়েটা তো আর অপছন্দের মেয়ে নয়, আশা রাখি হয়ে যাবে"।
পাতার মা রাজি হয়ে গেলেন। তারপর দিন ছেলেপক্ষ পাতাকে দেখে পছন্দ করে গেলেন।
শাখাওয়াত বিচারক বললেন- ,"আমাদের পুরানো বাড়ির ছেলে, আমি ছেলের ''নারী নক্ষত্র'' সব জানি, চিনি। তোমরা তো ছেলে দেখলে ,বাড়িঘর আর কি দেখবে, বাড়িঘর যথেষ্ট ভালো। ছেলে ভালো, বংশ ভালো যদি বলো তো আজ বিয়েটা পড়িয়ে দি ছেলেপক্ষ রাজি আছেন। শুভ কাজ যত তাড়াতাড়ি ততই মঙ্গল। কথায় বলে না "শুভস্য শীঘ্রম""।
পাতার মা বললেন, - "না, না ,তা কি করে হয়, আমার মেয়ের একবার কপাল পুড়েছে, না দেখে শুনে এসব কাজ হয় নাকি!?" সাখাওয়াত বিচারক বললেন, -"তোমাদের তো আর দেখার তেমন কেউ নেই তাছাড়া আমিতো তাদের সমস্ত কিছু জানি। তাই বলছিলাম" !
"তোমরা যেহেতু শুনবে না তাহলে তোমার ঐ চাচাতো ভাই আবুল না কে আছে না ,কাল তাকে আমার সঙ্গে পাঠিয়ে দিও"।
(১০)
তারপর দিন আবুলকে সঙ্গে নিয়ে বাস থেকে নামলেন সাখাওয়াত বিচারক। পাত্র স্বয়ং বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন দুজনকে। যত্নের ত্রুটি রাখলেন না, বাড়িঘর ভালো ,ছেলে দেখতে ভালো। ছেলে নিজে এসে বাসে তুলে দিয়ে গেলেন। আবুল কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করার কোন সুযোগই পেলেন না । আজ বুধবার শুক্রবার বিয়ের দিন স্থির হল।
যথারীতি বিয়েও হয়ে গেল। পরে জানা গেল ছেলেটি চরিত্রহীন লম্পট নেশাগ্রস্ত তার ১১ টি বিয়ে পাতা ১২ নম্বর। সেখানেও গরিব বলে অবহেলা, অশ্রদ্ধা , সহ্যাতীত নির্যাতনের শিকার। সেখান থেকেও ২-৫ মাসের মধ্যে বিতাড়িত হতে হলো তাকে। গরিবের মেয়ে তার ওপর দু 'দুটো স্বামী পরিত্যক্তা এবার কি হবে তার উপায়।
বড়ই ভেঙে পড়লো পাতা এবং তার পরিবার। পাতা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন আর কোনদিন বিয়ে করবে না সে।
(১১)
এখন তাদের গ্রামের এক আরি সুচ (হস্তশিল্প )কারখানাতে কাজ শিখতে যায় পাতা । ৮-১০ মাসের মধ্যে সে কাজ শিখে ফেলে। এখন আর কারখানাতে যায় না ওই কারখানা থেকে কাজ নিয়ে এসে বাড়িতে কাজ করে। কাজ নিয়ে যাওয়া, দিয়ে আসা ও কাজের কোন সমস্যা হলে ওই কারখানার ম্যানেজারের ছেলে দেলোয়ার দেখিয়ে দিয়ে যায়। পাতার বয়স এখন ১৬ +পাতা দেলোয়ারের সহযোগিতায় রবীন্দ্র মুক্ত বিদ্যালয়ে ক্লাস এইটে এডমিশন নিয়েছে। পাতা পড়ার ফাঁকে ফাঁকে আরির( হস্ত সূচ শিল্প) কাজ
করে নিজের পড়াশুনার খরচ ও কিছু সংসারে সাহায্য করে। তার দাদা এখন বড় হয়েছে লোকের জন খেটে পরিশ্রম করে সমস্ত দেনা পরিশোধ করে নৌকা ফিরিয়ে এনেছে । নদীতে এখন মাছ হচ্ছে ভালো সংসারের দুর্দিন অনেকটা কেটেছে ।পাতা এবার মাধ্যমিক দিয়েছে 'ফাস্ট' "ডিভিশনে" পাস করেছে সে। কিন্তু তার দাদা সুহান,সংসারের ঘানি টানতে টানতে তার পড়াশুনা ওই প্রাইমারি পর্যন্ত শেষ। পাতার এই সাফল্যের জন্য সুহান খুব গর্ভবত করেন। পাতার দাদা চান সে চাইলে অনেক বেশি পড়াশোনা করুক বড় হোক।
(১২)
এবার পাতা ক্লাস 'ইলেভেনে' এডমিশন নিয়েছে,। অনেক টাকার বই কিনতে লাগবে। সুহান কিছু টাকা দিলেন, দেলোয়ার লুকিয়ে বেশি টাকাটা সাহায্য করলেন। ধীরে ধীরে দুজনে মনের অজান্তে যেন অনেকটা কাছে আসতে শুরু করলেন।
আজ বৈশাখ মাসের এক মেঘোময় বিকেল পাতা স্কুল শেষে টিউশন গিয়েছে ।,ছুটি হলো বিকাল পাঁচটায়। চারিদিকে মেঘের ঘনঘটা, যেন অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে, এক তীব্র ঝড়ের পূর্বাভাস। পাতাদের বাড়ি ভিতরের হাঁটা রাস্তা ধরে প্রায় ৮ কিলোমিটার। এমন থমথমে আবহাওয়া দেখে কোন গাড়ি চালক গাড়ি ছাড়তে চাইলো না। গাড়ি ভাড়া না থাকলে পাতা মাঝেমধ্যে পায়ে হেঁটে স্কুলে আসতো। তাই পাতার হাঁটা অভ্যাস আছে। সে হাঁটতে শুরু করলো মেন রোড ধরে ,ভাবল হাঁটতে হাঁটতে গাড়ি পেলে উঠে পড়বে।
দেলোয়ার মটর মেকানিক এর কাজ করেন, রাত দশটা তে বাড়ি ফেরেন, ।কিন্তু সেদিনের আবহাওয়া খারাপ দেখে তিনিও বাড়ি ফিরছিলেন সেই রাস্তায়। রাস্তায় দেখা হলো পাতার সঙ্গে গাড়ি দাঁড় করিয়ে বললেন, -"চলে এসো আমার বাইকে"।, পাতার ইচ্ছা থাকলেও একজন পুরুষ মানুষের গাড়িতে একা কেমন যেন সংকোচ বোধহয় তার। পাতা বলল,-" না আমি গাড়ি এলেই উঠে যাব আপনি যান"। দেলোয়ার বললেন,- "এখন রাস্তায় একটাও গাড়ি পাবে না তুমি। তুমি মেয়ে মানুষ এই ঝড় বাদলে এতো রাস্তা সন্ধ্যাবেলা এই অন্ধকারে হেঁটে যেতে ভয় করবে না তোমার? তাছাড়া এই ঝড় বাদলে একজন অসহায় মেয়েকে একা ফেলে আমি চলে যেতে পারি না ।, উঠেপড়ো গাড়িতে।" পাতা বলল, - "কেন পারবেন না ফেলে যেতে?" দেলোয়ার বললেন, - "তোমাকে ফেলে যাওয়া অনুচিত হবে তাই"। পাতা বলল, - "আমি মেয়ে মানুষ বলেই তো ভয় , আমি ছেলে হলে, আপনাকে উপযাচোক হয়ে দাঁড়াতে হতো না, আমি আপনাকে দাঁড় করিয়ে আপনার গাড়িতে উঠে পড়তাম । দেলোয়ার বললেন-, "বেশি কথা বাড়িও না, ঝড় বৃষ্টি পিছনে ধেয়ে আসছে শুনছো না ঐ শাঁ শাঁ শব্দ । এই ঝড়বাদলের সন্ধ্যায় তেমন কেউ নেই রাস্তাতে । উঠে এসো বলেই তাকে হাত ধরে টেনে এনে গাড়িতে বসালেন"। অল্প খানিকটা আসতেই প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টি, অকস্মাৎ হৃদয় কুঁচকানো বজ্রপাত ভয়ে কুঁকড়ে গেলেন দুজনেই। পাতা পিছন থেকে সজরে জাপটে ধরলেন দেলোয়ার কে। ভয়ের মধ্যেও কেমন যেন একটা গভীর ভালবাসার আলিঙ্গন, এক অসীম আনন্দের শিহরণ বয়ে গেল দু'জনের শরীরে। পাতা নিজেকে সামলে নিলো। কিছুক্ষণ পর পাতা কে জায়গা মতো নামিয়ে দিয়ে বললেন,- "এখানে গাড়ি রেখে তোমাকে কিছু দূর আগিয়ে দিয়ে আসবো? পাতা লজ্জা জড়ানো চোখে বলল, না ,না আর যেতে হবে না"। দেলোয়ার - "তাহলে সাবধানে যেও শুভ রাত্রি।
(১৩)
সেই দিন রাতে সজ্জাতে গিয়ে পাতার দু,চোখে নিদ এলোনা । ভয়ে জড়িয়ে ধরার দৃশ্য টা বারবার মনে ভেসে উঠতে লাগলো। তাকে যেন আরো গভীর ভাবে কাছে পেতে, ও তাকে আরো আপন করে নিতে ইচ্ছা করলো। সে ভোলার চেষ্টা করলো, বিবেক দিয়ে নিজেকে বোঝালো, যে, -এমন কল্পনা নিছক বোকামি এটা কখনোই সম্ভব নয়। আমি কলঙ্কিত দুই দুই স্বামী পরিত্যক্তা, তাছাড়া আর্থিক দিক থেকে ওদের তুলনায় আমাদের আসমান জমিন ব্যবধান। এমন কল্পনা " বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়ানো"। বিভিন্ন ভাবে বিবেক দিয়ে নিজেকে বুঝিয়েও, বিবেককে উপেক্ষা করে আবেগ যেন বারবার তার সঙ্গে ঘনিষ্ট হওয়ার বিভিন্ন মুহূর্ত কে মনের সামনে এনে উপস্থিত করে ।সেই দিন রাতে অনেক টা একই অবস্থা হয়েছিল দেলোয়ারেরও।
(১৪)
পাতা ইস্কুলে গেল আজ আর ছুটির পর "প্রাইভেট" পড়া নেই। যেদিন "প্রাইভেট" পড়া থাকে না সেদিন পাতা নদীর পাড় দিয়ে হেঁটে বাড়িতে আসে, কারণ সব সময় তার গাড়ি ভাড়ার পয়সা থাকে না। দেলোয়ার পাতার সঙ্গে দেখা করতে বাইসাইকেল নিয়ে চলে এলেন। স্কুল ছুটির কিছুক্ষণের মধ্যে স্কুল থেকে সামান্য কিছু দূরে পাতার সঙ্গে দেখা , পাতা বলল-, "হঠাৎ এত তাড়াতাড়ি তাও আবার বাই সাইকেলে আগমন!
আপনি তো কারখানা থেকে এত তাড়াতাড়ি কখনো ফেরেন না!"
দেলোয়ার বললেন,- "তোমার সঙ্গে দরকার ছিল তাই।"
পাতা বলল," কি দরকার বলুন।"
দেলোয়ার- "চলো যেতে যেতে বলবো।"
পাতা -"আমি তো ভিতরের নদীর রাস্তা থেকে যাবো।"
দেলোয়ার- "সে তো আমি জানি, তা আমি কি ঐ নদীর রাস্তা দিয়ে যেতে পারি না?"
পাতা আর কোন প্রদুত্তর দিলো না।
(১৫)
নদীর পাড়ে একধারে ঘন বন, অন্য ধারে ছোট বড় বৃক্ষ। জনবসতি ধারে পাশে নেই। কিছু কিছু লোক ছাগল গরু চরাতে, আর ভিতরের পাড়ে দুই একজন সবজি ক্ষেতে আসে। দুজনে হাঁটছিলেন নদীর পাড় ধরে। সেদিন অনেকটা নির্জন জনমানবের কারো দেখা মিলল না। পাতার মনে এক আলাদা আবেগ মিশ্রিত ভয় ভর করলো । সে সব কিছু লুকিয়ে নিজেকে শক্ত করে বলল,- "কই কি বলবেন বলে এলেন যে!"
দেলোয়ার হাত বাড়িয়ে নির্দেশ করে বললেন,- "ওই দেখো! পাতা তাকিয়ে দেখলো দুইজন প্রেমিক প্রেমিকা বাহুডোরে আবদ্ধ।" লজ্জাবোধ করে এক মুহূর্তে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো পাতা। এদের দুজনকে নিকটে দেখতে পেয়ে তাঁরা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেলেন।
পাতা বলল-, "আমি এতদিন আসা-যাওয়া করছি তো কখনো এমন কিছু চোখে পড়ে নি।"
দেলোয়ার মুচকি হেসে বলল,-" হয়তো এরা আজ আমাদের দেখাবার জন্য এসেছেন।" দুজনে যখন ঐ ''কপোত কপোতির'' বৃষ্টির আড়াল হলেন, দেলোয়ার বললেন,-" এই, এই নির্জন রাস্তায় যেতে তোমার ভয় করে না?
পাতা বলল,-" না, আমি একা থাকলে ভয় করতাম। আমার সঙ্গে প্রতিদিন আমার বান্ধবীরা থাকে ওরা আজ সকলে গাড়িতে চলে গেলো। আর আজ তো আপনি ,সঙ্গে একজন পুরুষ মানুষ আছে যে, আজ তো মোটেই ভয় নেই।"
দেলোয়ার বললেন, - "ব্যাটা ছেলে থাকলে তো এই নির্জনে আরও বেশি ভয়।"
পাতা বললেন, -"সে তো অচেনা হলে,
তাছাড়া আপনি তো চেনা ,আবার বিশ্বস্ত ও বটে।"
দেলোয়ার বললেন, -"বিশ্বাস করো আমাকে?
পাতা, - "না করলে আপনার সঙ্গে এই রাস্তাতে যেতাম।"
দেলোয়ার ,-" শুনে খুশি হলাম।"
পাতা, -"আপনি কি বলবেন বলছিলেন এবার বলুন।"
দেলোয়ার -, "এসো এখানে এক দন্ড বসি ,বসেই বলছি।"
পাতা- , "না যদি কেউ এসে পড়ে, তাছাড়া কেমন খারাপ দেখায়।"
দিলোয়ার -, "কেউ তো নেই শুধু দু মিনিট কেউ দেখবে না প্লিজ আর হাঁটতে পারছি না"। দু'জনে বোনের ধারে ঘাসের উপর বসলেন।
দেলোয়ার -, "এই নিরালায় আমার সঙ্গে এখানে বসে থাকতে ভালো লাগছে না তোমার?"
পাতা-, "না ভালো লাগছে না।"
দেলোয়ার -, "ভালো লাগলেও বলবে না তুমি, বলেই পাতার দু'হাত তার দু'হাতের সঙ্গে চেপে ধরে বললেন, "আই লাভ ইউ পাতা"।সেই ঝড়বাদলের সন্ধ্যায় যে তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরে ছিলে, সেই রাত থেকে কোন রাতে আমার দুচোখে তন্দ্রা আসেনি । আমি জানি তুমিও সেই রাতে শুধু আমার কথা ভেবেছিলে, তুমিও ঘুমাতে পারোনি। বিশ্বাস কর পাতা শয়নে ,স্বপনে, জাগরনে শুধু তোমার দেখি পাতা। তোমার ছাড়া আমার খুব নিঃসঙ্গ মনে হয়, এই, বলোনা তুমি আমাকে ভালোবাসো!,"
পাতা কিছুক্ষণ নিরব থাকলো। এক আলাদা ঝড় বয়ে গেল তার হৃদয়ে সে কি বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। যেন এক হৃদয় কাঁপানো প্রেমের অনুভূতি। কোনভাবে নিজেকে সামলে নিল। মনে কঠিন পাথর বাঁধলো সে।
দেলোয়ার -, "তুমি না বললেও তোমার নীরবতা ও তোমার মুখ ,চোখ ই বলে দেয় যে, তুমি আমাকে ভালোবাসো!"
পাতা-, "আমিও আপনাকে ভালোবাসি ,আমি তা অস্বীকার করব না, কিন্তু তা মনের মাঝে চির সুপ্ত হয়ে থাকবে, তা কখনোই প্রকাশ করা সম্ভব নয়।"
দেলোয়ার-, কেন?
পাতা-, "আপনার আমার মধ্যে যে বহুত ব্যবধান, তাছাড়া আমার জীবনে যে কত কালিমার লেপোন আছে তা জেনেও কি আপনার বাবা-মা মেনে নেবেন?" উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, -"ভুলে যান আপনি আমাকে ।এটা কেউই মানবে না, এটা সম্ভব নয়।"
দেলোয়ার-, "কে মেনে নিল না নিল, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমি শুধু তোমাকে চাই। আমি মেনে নিলে তারা মানতে বাধ্য,। আর একান্ত যদি না হয় তাহলে তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যাব অন্য কোথাও, যেখানে বাধা দেওয়ার কেউ থাকবে না ,সেখানে তুমি পাশে থাকলে আমি সব কষ্ট সয়ে ছোট্ট কুটিরে বাস করবো, সেই ছোট্ট কুটিরে ভরে থাকবে শুধু ভালোবাসা আর ভালোবাসা।"
পাতা -, "ভালোবাসা অনেক সহজ, বহন করা বড় কঠিন।"
দেলোয়ার-, "তুমি একটু আগে যে বললে আমাকে বিশ্বাস করো। ভরসা রাখো আমি নিশ্চয়ই পারব। এই প্লিজ বলো না,!তুমি শুধু আমার হবে,! তুমি আমার ভালোবাসো!"
পাতা-," জানিনা আমি এখন কিছু বলতে পারছি না"। দুজনের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণএকটা নীরবতা বিরাজ করল। হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা দূরে চলে এলো দুজনে, একটু আগে আগে হাঁটছিল পাতা, অকস্মাৎ দিলোয়ারের দৃষ্টিগোচর হল দু'টি সাপ রাস্তার উপর এক নমনিতো ডালে জড়িয়ে জড়িয়ে ঝুলছে, পাতার মাথার এক ইঞ্চি দূরে। দেলোয়ার সাপ বলেই পাতার হাত ধরে পিছনের দিকে টান দিতে ,পায়ে গাছের উঁচু শিকড় বেঁধে দোলোয়ার পড়লো মাটিতে ,তার দেহের উপর পাতা ও, ।একে অপরের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন বেশ কিছুক্ষণ। পাতার সামান্য ঢেউ খেলানো ভ্রমর কালো জোড়া ভ্রু , টানা টানা উজ্জ্বল আখি পল্লব, দেলোয়ার কে যেন পাগল করে দিলো।
(১৬)
পাতা পূর্বে বিবাহিত,তার ওপর তার উপছে পড়া যৌবন, কতদিন সে নিজেকে বেঁধে রাখবে পাতা নিজেকে আর বিবেকের বাঁধনে বাঁধতে পারল না। সে সবকিছু ভুলে সেই মুহূর্তে আনন্দের এক অতল সাগরে হারিয়ে গেলেন দুজনা। পাতা বলেই ফেলল আই ''লাভ ইউ টু'' আমিও তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না। "
দেলোয়ার তাঁর দুই বাহুডোরে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেললো পাতাকে। আলতো করে একটা চুম্বন করলেন তার উত্থিত ললাটে। যেন এক অনাবিল ভালোবাসার গভীর অগ্নুৎপাত হয়ে বয়ে গেল তাদের দেহাঙ্গে। পাতা নিজেকে সামলে নিলো কোন প্রকারে ,বেরিয়ে এলো তাঁর বাহুবন্ধন থেকে।
যাওয়ার পথে দেলোয়ার বললেন,- "২৫' তারিখে বিকাল '৪:০০' টায় কৈখালী নদীর পাড়ে তোমার জন্য অপেক্ষা করবো, বলে সাইকেল চালিয়ে চলে গেলেন দেলোয়ার।
(১৭)
এইভাবে দেখা-সাক্ষাৎ প্রেমালাপ এক ঘনিষ্ঠ প্রেমময় সম্পর্ক গড়ে উঠলো। একদিন এই সম্পর্কের কথা 2 পরিবারের মধ্যে জানাজানি হয়ে গেল।
পাতারা ছিল খুব গরীব তাদের শুনতে হলো নানান গর্হিত কুটুক্তি। শুনতে হল, দু' দুটি স্বামী পরিত্যাক্তা , নির্লজ্জ, বেহায়া , বেশ্যা, নোংরা মেয়ে কে দিয়ে সমাজকে কলুষিত করছে, এরা ভালো ভালো ছেলেদের মন ভাঙ্গিয়ে তাদের জীবন নষ্ট করছে ,মেয়েকে দিয়ে। আরো কত নিন্দনীয় উক্তি। ঘৃণায়, অপমানে শেষ পর্যন্ত মেয়েকে ঘরে আটকে রাখলেন। দেলোয়ার কেও ঘরবন্দী করে রাখলেন তাঁর বাবা। ছেলের অন্যত্র বিয়ে দেবেন। মেয়ে দেখা আছে ,কাল ই বিয়ে দেবেন ছেলেকে। আজ রাতে সবার দৃষ্টি এড়িয়ে কৌশলে পালিয়ে এলেন দেলোয়ার, পাতাকে নিয়ে চম্পট দিলেন সেই রাতে । তাঁরা চলে এলেন গ্রাম ছেড়ে শহরের অনেক দূরে, যেখানে এত সহজে ওদের খোঁজ মিলবে না বিয়ে করলেন দুজনে। এক সরু গলিপথে একটা ছোট্ট রুম ভাড়া নিলেন। দেলোয়ার ধনীর দুলাল তেমন পরিশ্রম করে নি কখনো। এখন কায়িক পরিশ্রমে কষ্টে দিন পাত হলেও তাদের ছোট্ট কুটিরটি যেন ভালোবাসায় টইটুম্বুর। পাতা তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
দেলোয়ারের বাবা গোপনে সন্ধান চালাতে চালাতে জেনে গেলেন তাঁদের আবাসন।
(১৮)
একদিন অকস্মাৎ তাদের ভালোবাসার ছোট্ট কুটিরে নেমে এলো ঘোর কালবৈশাখী। ভাড়াটে দুষ্কৃতী দ্বারা দেলোয়ার কে জোর করে তুলে নিয়ে এলেন ,এবং জোরপূর্বক চাপ সৃষ্টি করে পূর্বে নির্ধারিত মেয়েটির সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিলেন দেলোয়ার কে।
পাতা তা জানতে পেরে ফিরে এলো মাত্রীলয়ে। অবজ্ঞা ,অনাদরে, বিনা চিকিৎসায় পাতা জন্ম দিলো এক কন্যা সন্তানকে। এখন মেয়ের বয়স পাঁচ মাস একদিন রাতে দেলোয়ার লুকিয়ে দেখা করতে এলেন স্ত্রী সন্তানের সঙ্গে। পাতা রাগে, অভিমানে সেই দিন রাতে এক ধরনের অপমান করে তাড়িয়ে দিলেন দেলোয়ার কে।
পাতার দাদার সুহানের বিয়ে হলো ,বাড়িতে বউ এসেছে। পাতা এবং তার সন্তান যেন এক অঝক্কি ও অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ালো। বাধ্য হয়ে পাতা তার মেয়েকে নিয়ে তাদের সংসার থেকে পৃথক হয়ে গেলো। তার পিত্রালয়ের পাশে ছোট্ট দুই চালাতে পাতা থাকতো তার মেয়েকে নিয়ে।
(১৯)
এখন আর আরির কাজে (হস্তসুচের কাজ) আগের মত পয়সা নেই। এখন কম্পিউটারের ডিজাইন হচ্ছে, বিভিন্ন যন্ত্র দ্বারা শাড়িতে কাজ চলছে, হাতে আরি কাজে অতি অল্প আয় ।পাতা একা এই কাজ করে, যৎসামান্য আয়, শোকে দুঃখে ,অভিমানে, অতি কষ্টে ,পাতার দিনকাটে।
একাএই ঘরের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ বসে থেকে কাজ, দুশ্চিন্তা বেশি করে চেপে বসে।
দুশ্চিন্তা, নিজের শরীরের প্রতি অযত্ন, অতি অল্প বয়সে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে পড়ে সে। ডাক্তার দেখায় না, কারো কথা শোনে না ,কোন ওষুধ খায় না, দিন-রাত আরির কাজে মুখ গুঁজে বসে থাকে। আর আনমনে দিনরাত ফিসফিস করে কি যেন বলেই চলেছে সারাক্ষণ। বাড়ির পাশ দিয়ে গেলে মনে হয় পাতা কার সঙ্গে যেন গল্প করছে। জানালা দিয়ে উঠি দিয়ে দেখি কেউ নেই, নিজে নিজের মনের সঙ্গে এক মনে, এক ধ্যানে কি যেন বলেই চলেছে ।
হয়তো দেলোয়ার কে ছেড়ে থাকার যে গভীর মর্মাঘাত, সে কাউকে বলতে না পেরে নিজের মনকে জানায় , তার মনো কষ্ট ও বেদনার কথা। পাতা যেন কেমন হয়ে গেছে কারো কথা সহ্য হয় না তার, কেমন যেন নিরব, রগচটা।
আজ শুক্রবার সকাল থেকে পাতার কাঁপন দিয়ে জ্বর। পাতার মা মসজিদের হুজুরের কাছ থেকে তেল,পানি পড়া এনে দিলেন, তাতে কিছু হচ্ছে না ।পর দিন গ্রামের এক প্রাথমিক ডাক্তারকে দেখিয়ে এখন আর জ্বর নেই পাত এখন অনেকটাই সুস্থ।
্(২০)
এদিকে দেলোয়ারের দ্বিতীয় স্ত্রী আহুজা তিনি এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের একমাত্র কন্যা। তিনি কেমন যেন বেপরোয়া, একা ভালো থাকতে চান। তিনি দেলোয়ারের পরিবারের সঙ্গে কোনভাবে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। দিনরাত অশান্তি ,সুখ নেই যেন সেই পরিবারে।
একদিন আহুজা তার কোলে ৫ বছরের শিশু সন্তান আলাল কে রেখে কার সঙ্গে পালিয়ে গেছেন তিনি, এই দুই মাস তাঁর কোন খোঁজ নেই।
(২১)
পাতার অসুস্থতার কথা শুনে পাতার শাশুড়ি মা, ছেলে দেলোয়ার কে সঙ্গে নিয়ে হঠাৎ এলেন পাতা বৌমাকে দেখতে। বললেন, বৌমা ভালো আছো? পাতা কোন উত্তর দিল না তাঁদের বসতে জায়গা করে দিলেন। মা বেটিতে সাধ্যমত আপ্যায়ন করলেন তাঁদেরকে। তাঁরা তাঁদের অপরাধ স্বীকার করলেন। পরদিন বৌমাকে নিজ বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পাতাকে জানালেন। পাতা হ্যা না কোন উত্তরই দিল না। পাতার মা বললেন, এই কদিন আগে পাতা জ্বর থেকে উঠেছে ওর শরীর মন তেমন ভালো নেই আমি বুঝিয়ে বলব আপনারা সামনের সপ্তাহে এসে নিয়ে যাবেন। পাতার শাশুড়ি বললেন, তাহলে আজ আমরা যাই সামনের সপ্তাহে বৌমাকে নিতে ওর শ্বশুর আব্বাকে পাঠিয়ে দেবো।
(২২)
সপ্তাহখানেক পর পাতার শশুর বাড়ি থেকে খবর এলো ,পরশুদিন পাতার শশুর বৌমাকে নিতে আসবেন। আগামীকাল
নিতে আসবেন শ্বশুর, ।আজ হঠাৎ আবার ভীষণ জ্বর পাতার মা তৎক্ষণাৎ গ্রামের সেই ডাক্তার বাবুর কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে এলেন ,এবার এই ওষুধ খেয়েও যেন মোটেই জ্বর কমলো না পাতার শশুর যথারীতি পরের দিন বৌমাকে নিতে এলেন।
কিন্তু আর নিয়ে যাওয়া হলো না, এসে দেখলেন, বৌমার প্রচন্ড জ্বর। সেই দিন রাতেই প্রচন্ড খিঁচুনি, দেলোয়ার কে খবর দেওয়া হল সেই দিন রাতেই দেলোয়ার, পাতার মা ,দাদাকে সঙ্গে নিয়ে পাতা কে ভালো এক নার্সিংহোমে ভর্তি করলেন। তারপর দিন পাতার শাশুড়ি শশুর প্রায় বাড়ির সকলে গেলেন নার্সিংহোমে।
ডাক্তার জানালেন তার দুটি কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে, তার বাঁচার কোন আশা নেই। যা খেতে চায় খাইয়ে দেন।
দেখতে দেখতে মৃত্যুর অন্তিম সময় উপস্থিত। কান্নার রোল পড়ে গেল চারিদিকে। পাতা তার একমাত্র সন্তান আইরিন কে দেলোয়ারের হাতে সঁপে দিয়ে মাত্র ২৯ বছর বয়সে সকলকে কাঁদিয়ে চিরদিনের মত ঝরে পড়লো পাতা।
তসলিমা লস্কর।
দক্ষিণ 24 পরগনা কুলতলী।
রক্তে গড়া স্বাধীনতা ।। জাফর মোল্লা
SA
রক্তে গড়া স্বাধীনতা
জাফর মোল্লা
এই ভারতের মাটিকে যারা
করেছিল কলুষিত।
তাদের বিরুদ্ধে উঠেছিল গর্জে
ভারতবাসী লাখো লাখো।।
আকাশ বাতাস ভরে ছিল
গোলা বারুদের গন্ধে।
মেতেছিল হানাদার দল
মানুষ মেরে আনন্দে।।
দিকে দিকে আর্তনাদ
শোকাহত সারা দেশ।
পরিয়েছিল সারা গায়ে
পরাধীনতার বেশ।।
ছড়িয়ে পড়ে রোনাজারি
কান্না হাহাকার।
মৃত্যু মিছিল চালিয়েছিল
ইংরেজ হানাদার।।
শাড়ির আঁচল ভিজে ছিল
মায়ের চোখের জলে।
স্বামী হারা স্ত্রীর আর্তনাদ
দুধের শিশু কোলে।।
ধুকে ধুকে মরেছে মানুষ
ঝরেছে জমিনে রক্ত।
ভাঙেনি কারো মনোবল তোবু
হয়েছে দৃঢ় ও শক্ত।।
আসফাক আলী তিতুমীর
সূর্যসেন ক্ষুদিরাম।
সবার আগে চলে আসে
কণ্ঠে এদের নাম।।
মহাত্মাগান্ধী, নেতাজী,
লাল বাল পাল।
মাতঙ্গীনি প্রীতিলতা রাও
এদের সাথে মেলাল তাল।।
দিন এসেছে রুখে দাঁড়াও
সামনে হানাদার।
প্রচারিল এই খবর
সন্তান ভারত মাতার।।
শক্তি সাহস জাগিয়ে তুলতে
গড়ল সেনাদল।
দেশ মাতাকে রক্ষা করতে
এগিয়ে সবাই চল।।
মাঠে ঘাটে বাজারে হাটে
উঠল এই সুর।
নরখুনি বিদেশি দল
হয়ে যাও দূর।।
লাখো লাখো ভারতবাসী
হলো বলিদান।
তবুও জেঁকে ছিল বসে
ব্রিটিশ রাজত্ব।।
দিকে দিকে আওয়াজ ওঠে
আমরা স্বাধীনতা চাই।
রাখব না আর নাম মোদের
গোলামীর খাতায়।।
এমন করে শপথ নিল
লক্ষ কোটি দল।
১৯৪৭ এর ১৫ ই আগস্ট,
এক সাগর রক্ত দিয়ে
খুলল পরাধীনতার শিকল।।
ঘোষিত হলো স্বাধীনতা
ঝরিয়ে রক্ত ঘাম।
চীর স্মরণীয় হয়ে আজ ও
বীর সেনাদের নাম।।
জাফর মোল্লা
জয় নগর,দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা
Education qualification:- BSC Bio,(DIAM,RMP )
Subscribe to:
Posts (Atom)
নবতম প্রকাশিত সংখ্যা
অপূর্ণ স্বপ্ন
অপূর্ণ স্বপ্ন বিপ্লব মাহাতো পূর্ণিমা রাতে চাঁদের এ কী মেলা, ও সুন্দরী, ভালো লাগে না আর লুকোচুরি খেলা। ভেবেছিলাম তোমাকে নিয়ে যাবো দূরদেশে, ...


















