স্বামী বিবেকানন্দ ও সোস্যালিজম
লেখক - তন্ময় বিশ্বাস
বিবেকানন্দের ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত। অনেকের মতে বিবেকানন্দ ছিলেন ‘হিন্দু রিভাইভ্যালিস্ট’। সরকারী মার্কসবাদীরা অর্থাৎ ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির তাত্ত্বিকেরা মোটামুটি এই মতেরই সমর্থন করেছেন। বিবেকানন্দের ধর্মমত ও সমাজসংস্কারের কর্মসূচী প্রভৃতি আলোচনা করে এসব তাত্ত্বিকেরা সিদ্ধান্ত করেছেন যে, সামগ্রিক বিচারে বিবেকানন্দকে প্রগতিশীল ঐতিহ্যের স্রষ্টা বলা চলে না।
আবার ঊনবিংশ শতাব্দীর উপর অনুশীলন করেছেন এমন অন্য অনেকের মতে বিবেকানন্দ ‘জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক’ ছিলেন। ধর্মকে আশ্রয় করে যদিও বিবেকানন্দ নিজস্ব চিন্তাধারা প্রকাশ করেছেন, তবুও একথা অস্বীকার করা চলে না যে, তাঁর বক্তব্যের সারবস্তু প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদেরই অনুকূল।
বেসরকারী মার্কসবাদীরা বলেছেন যে, বিবেকানন্দ যে শুধু জাতীয়তার উদ্গাতা তা-ই নয়, ভারতের প্রথম সোস্যালিস্টও বিবেকানন্দ।
ডক্টর ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ‘ডায়ালেকটিক্যাল বস্তুবাদী’ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেকানন্দের সমাজ-বিষয়ক, ধর্ম-বিষয়ক, সাহিত্যিক ও অন্যান্য মতামতের বিশ্লেষণ করেছেন। ডক্টর দত্তের মতে বিবেকানন্দ 'patriot and prophet', তদুপরি ভারতের প্রথম সোস্যালিস্ট।
তথাকথিত মার্কসবাদীদের সমালোচনা করে ডক্টর দত্ত লিখেছেনঃ 'Now-a-days, the youngmen imbued with a smattering of Marxism call him a "reactionary". In his life-time the social-reformers. of the day called him a reactionary as well; because he did not advocate that only by giving widows to remarriage or by making some inter-caste marriages and suchlike social reforms India's regeneration would be achieved.... The desideratum according to him is to raise the masses, to educate them and to elevate them in the scale of advanced humanity."
স্বামীজী ছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম ‘সোস্যালিস্ট’ । বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধাবলীতে সাম্যবাদের আলোচনা আছে। তৎকালীন সাম্যবাদী সাহিত্যের সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের পরিচয় ছিল বলে মনে হয়। তবে বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনবেদ ছিল স্বতন্ত্র এবং বঙ্কিমচন্দ্র সোস্যালিজমের অনিবার্যতায় তাঁর আস্থা ঘোষণা করেননি।
স্বামী বিবেকানন্দ পাশ্চাত্যের বিভিন্ন বিপ্লবী-আন্দোলন সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। এসব বিপ্লবী-আন্দোলনের সাহিত্যের সঙ্গে তিনি পরিচিত ছিলেন।
১৯০০ খ্রীষ্টাব্দে প্যারীর আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর প্রাক্কালে প্রিন্স ক্রপোটকিন ও অন্যান্য বিপ্লবীদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ পরিচয় ঘটে। যেযুগের কথা আমরা বলছি সেটা বিপ্লবী অভ্যুত্থানের যুগ নয় এবং বিপ্লবী অভ্যুত্থান তখনও অনেক দূরের কথা।
এনাকিজম, নাইহিলিজম, সোস্যালিজম, কমিউনিজম — সেযুগের শৈশব অতিক্রম করে প্রবল পরাক্রান্ত হয়ে ওঠেনি। এসব আন্দোলনের তদানীন্তন নেতারা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছেন ঠিকই, তবে কবে যে বিপ্লব বাস্তবে রূপ নেবে সে-সম্পর্কে কোন ভবিষ্যদ্বাণী করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
এই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে বিবেকানন্দ যখন ঘোষণা করলেন, 'Socialism or some form of rule by the people, is coming on the boards.' এবং I am a socialist.' তখন এই গৈরিকধারী সন্ন্যাসীর ইতিহাস-চেতনা ও দূরদর্শিতার প্রশংসা না করে পারা যায় না।
ডক্টর ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত বলেছেন, স্বামীজী শুধু এটাই বলেননি 'দরিদ্র আরও দারিদ্রের পঙ্কে নিমজ্জিত হচ্ছে এবং ধনী আরও ধনবান হয়ে উঠছে, তিনি ভবিষ্যৎ-সমাজে শোষিত জনসাধারণের নয়া সংস্কৃতির (Proletocult) কথাও বলেছেন।
ডক্টর দত্ত আলোচনা করে আরও প্রতিপন্ন করেছেন যে, স্বামীজী রাশিয়ার জনসাধারণের অভ্যুত্থানের কথা বলে গেছেন এবং অর্ধশতাব্দীরও কিছু পূর্বে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেনঃ রাশিয়ায় জনসাধারণের শাসন স্থাপিত হবে।
ভারতীয় প্রজাসাধারণের উপর বিত্তবানদের শোষণের তীব্র বিরোধিতা করে স্বামীজী লিখেছিলেনঃ এ শোষণ দানবিক ও পাশবিক। স্বামীজীর মতে দেশপ্রেমিকের প্রথম কাজ হবে, কোটি কোটি নিরন্ন সাধারণ মানুষের কাছাকাছি আসা, তাদের জন্য গভীর বেদনা অনুভব করা।
কাজেই আহ্বান জানিয়েছিলেন স্বামীজীঃ ‘কাহারও কোন বিশেষ অধিকার নাই, অথচ প্রত্যেক ব্যক্তির উন্নতি করিবার সমান সুবিধা থাকিবে।' আরও বলেছিলেন: সামাজিক উন্নয়নের বাণী ছড়িয়ে দাও, সাম্যের বাণী প্রচার কর।'
স্বামীজীর বক্তব্য অনুধাবন করলে দেখা যায় যে, সবরকম শোষণের তিনি ছিলেন বিরোধী। ধর্মের নামে যে শোষণ অব্যাহত থাকে, দেশপ্রেমের পিছনে যে অলক্ষ্যে শ্রেণী-শোষণ ঘটে, স্বামীজীই বোধহয় ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম ঐ সত্যকে স্বীকার করেন।
স্বামীজী তাই বলেছিলেনঃ ‘আমাদের নির্বোধ যুবকগণ ইংরেজগণের নিকট হইতে অধিক ক্ষমতা লাভের জন্য সভাসমিতি করিয়া থাকে—ইহাতে ইংরেজরা হাসে। যে অপরকে স্বাধীনতা দিতে প্রস্তুত নয়, সে কোনমতেই স্বাধীনতা পাইবার যোগ্য নহে।
স্বামীজী শুধু উপরতলার মানুষদের স্বাধীনতায় বিশ্বাস স্থাপন করতে পারেননি। তিনি চেয়েছিলেন শোষিত, দীন-দরিদ্র ভারতবাসীর সর্বাঙ্গীণ মুক্তি। তাঁর মতে 'ভারতের একমাত্র আশার স্থলই ভারতীয় জনসাধারণ, কেননা জনসাধারণই সমাজের মূল সঞ্চালক শক্তি, সমাজের অগ্রগতির ধারক ও বাহক।
সূত্র:
Swami Vivekananda: Patriot-Prophet-Bhupendranath Datta, Nababharat Publishers, Calcutta, 1954
The Complete Works of Swarni Vivekananda, Vol. V, Advaita Ashrama, Calcutta, Eighth Edition (1964)
স্বামীজীর বাণী ও রচনা, পঞ্চম খণ্ড, উদ্বোধন কার্যালয়, কলিকাতা
চিন্তানায়ক স্বামী বিবেকানন্দ
পাঠকের মতামত
No comments:
Post a Comment
আপনার মতামত প্রদান করুন....