ও ঘরের কথা
মনোরঞ্জন ঘোষাল
আনেক কষ্ট করে মাধ্যমিক পাশ করেছে বিকাশ। তার পর কলেজে ভর্তি হল। লেখাপড়ার খরচ চালানোর সামর্থ নেই তাদের, হাভাতের সংসার। কটা টিউশনি করে কোন রকমে নিজের পড়ার খরচ চালাচ্ছে, এমন সময় মা মারে গেল।
ছেলে বড় হয়ে গেছে, বাবা ‘প্রকাশ’ আর বিয়ের পিঁড়িতে বসতে রাজি হল না। মনে ভেবে রাখল দু’একটা বছর অপেক্ষা করে ছেলেকে বিয়ে দিয়ে দেবেন। মানুষ স্বপ্ন নিয়েই বাঁচে, আর এমন হাভাতেদের স্বপ্ন ছাড়াই বা আছে কী?
মা ‘জানকী’ মারা গেলে বাবা প্রকাশ হাত পা পুড়িয়ে রান্না করে, ঘর গৃহস্থালির সব কাজ করে। ছেলে বিকাশকে এতটুকু কাজের বোঝা চাপতে দেয় না। প্রকাশ তো লেখাপড়া জানে না, তাই ভাবে ছেলে ঐ লেখাপড়া শিখে ভাল কিছু চাকরি করবে, অন্তত দু’বেলা দু’মুঠো ভাত তাদের পেটে পড়বে।
বাস্তব যে কত দূর তার জানা ছিল না। বিকাশ উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিল কিন্তু পাশ করতে পারল না। তার এই ফলের জন্য পরিবেশ পরিস্থিতি দায়ী হলেও তা বুঝবে কে? সে কথা কেউ বুঝল না।
লেখাপড়ায় ইতি দিয়ে কাজের খোঁজে লেগে পড়ল বিকাশ। চাকরি পাওয়ার থেকে ভগবানের দেখা পাওয়া যে অনেক সহজ সে জানতো না! নানান জায়গাতে ছুটে বেড়াল কোথাও কেউ তাকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিল না। সে তো জানে না যে লোকে তেলা মাথাতেই তেল দেয়। জলে জল দাঁড়ায়! নিজের লোক বা অপর, সকলে তাকে আশা দিয়ে তাদের কিছু কাজ গুছিয়ে নিতে লাগল। আর ও বেচারা আশায় বুক বেঁধে খোঁটায় বাঁধা গরুর মত তার চারিদিকে ঘুরতে লাগল। যখন সে বুঝতে পারল যে, তারা ওর কোন কাজেই লাগবে না, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। জীবনের অনেকটা কাজের সময় পেরিয়ে গেছে তার। তবু সব ভাল যার শেষ ভাল হয়। কিন্তু যার ভাল হবার নয়, তার শুরু বা শেষ সবটুকুই সমান তালে চলে। সে একটা দোকানে কাজে লাগল। অল্প মাইনে দেয় সেখানে। দোকান তাই আলাদা কিছু করার সময় পায় না। কোন রকমে সেই অল্প টাকায় তাদের সংসার চলছে। এদিকে বাবার বয়স বেড়ে চলেছে। কাজ আর আগের মত করতে পারে না। ছেলেকে একটা বিয়ে করার জন্য বলে। সে বলে তার অল্প রোজগার নিজেদেরই ঠিক মত চলে না, তায় আবার বৌ আনলে কী হবে?
বুড়োদের একটা কথা আছে, তাঁরা প্রায়শই এই কথা বলে থাকেন যে, পাঁচ জনের সংসারে এক জনের একটু টেনেটুনে চলে যাবে। সেটা চলে যায় তবে তা যে আসবে তার গুণে। এই খানেই একটা কথা একেবারে যুক্তিযুক্ত তা হল “ সংসার সুখি হয় রমণীর গুণে”। সেটি বাছাই করার লোক তার নেই। সাধারণত ঘরের গৃহিণী তার মা জানকী বেঁচে থাকলে তার সংসারের মঙ্গলের উপযুক্ত কনেকে পছন্দ করে বৌমা করে আনতেন, এদের তা করবে কে?
বিয়েতে রাজি না থাকলেও বাবার চাপে তাকে একরকম জোর করে বিকাশকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হল। অভাবের সংসার তাই এক গরিবের মেয়ে ‘কাজল’কে পছন্দ করে বিয়ে করল। মনে ভাবল কাজল গরীব তো তাই অভাবটা বুঝে মানিয়ে নিয়ে সংসার চালাবে। আচার অনুষ্ঠান করে বিয়ে মিটল। বৌ বাড়িতে এসেই তাদের চাল চুলো হীন সংসারের চেহারা দেখে মনে খুব গোঁসা ভরে রাখল। মনে ভেতরে কে কার ঢুকবে? তাই বৌয়ের গোঁসা সে বুঝতে পারল না। আমাদের এই একটা দোষ! আমরা আমাদের নিজের অবস্থাকে কখনও তুলনা করতে চাই না। আমি কী ছিলাম আর কী হলাম? তা কখনো ভেবে দেখি না। আর ভাবলেও মিথ্যের জাল বুনে আসল সত্যকে আড়াল করে মিথ্যেটাকেই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে সকলের সামনে তুলে ধরি। জাহির করতে চাই যে আগে আরো ভাল ছিলাম। অনেকে তার মিথ্যে ধরে ফেলে, অনেকে ধরতে পারেনা। বিশেষ করে মহিলারা, সেই মিথ্যে শুনে মন গরম করে তাদের নিজেদের সংসারে অশান্তি শুরু করে। স্বামীর ওপর একের পর এক আবদারের বোঝা চাপাতে থাকে, আর সে সেই আবদার মেটানোর জন্য ঘোড়ার মত দৌড়াতে থাকে।
কেউ কেউ তাদের স্ত্রীর ঐ সব আবদার মেটাতে সক্ষম হলেও সকলে সক্ষম হয় না। তাদের স্ত্রীদের কেউ কেউ আবার অন্য পথে নিজের সখ পূরণ করতে আগ্রহ দেখায়। সে পথ নানান রকম হয়। অনেকে সংসারে থেকেই তা পূরণ করে, আবার অনেকে সংসার ত্যাগ করে। এখানেও তেমন ঘটল।
স্ত্রীর আকাশ ছোঁয়া সাধ বিকাশ পূরণ করতে পারছে না। তার বৌ কাজল কোন কথা তাকে আর জানাল না। একদিন তার থাকা যাবতীয় গয়না আর গচ্ছিত টাকা গুলো নিয়ে গেল বাপের বাড়ি। বিকাশ তা বুঝতে পেরে গেল। সে বৌকে ফিরিয়ে আনলেও সেই গয়না আর টাকা ফেরত আনতে পারল না। খুব সাধারণ সরল মনের ছেলে সে, অহেতুক ঝামেলা না বাড়িয়ে শ্বশুর বাড়িতেই সেগুলো থাক বলে তাকে বুঝিয়েছে কাজল, আর সে তা মেনে নিলো। একবার ভেবে দেখল না যে, তার বৌ এ কাজ কেন করল?
বেশ কিছুদিন কেটে গেল, কাজলের বাপের বাড়ি যাবার মন হল। দু’জনে একসঙ্গে গেল, কিন্তু কাজল আর ফিরতে চাইল না। বিকাশ তাকে ঘরে ফিরে আসার কথা বললে, তার কপালে জুটল গাল মন্দ আর মার। তাকে মারধোর করে তাড়িয়ে দিল। সে বুঝতে পারল না যে, এমন ঘটনা কেন ঘটল? সাদা মাটা সংসারি ছেলে, সে চায় সংসার করতে। সংসারটা দু’জনের, সে একা চাইলেই সংসার হবে কী? তাই হল না। শ্বশুর বাড়ির লোকেও কেউ মেয়েকে সংসার করানোয় আগ্রহ দেখাল না। মেয়ে যে তাদের কী বোঝাল তা সে ঈশ্বরই জানেন। তাই বলে তো আর বিয়ে করা স্ত্রীকে সে হুট বলতে ছেড়ে দিতে পারে না! বেশ কয়েকবার সে নিজে গিয়ে মীমাংসা করবে বলেও ফিরে এসেছে। স্ত্রীর ব্যবহার তাকে সেখানে যেতে পাপ বোধ করায়। সে ভীত হয়ে পড়ল।
ভাল ছেলেদের এই এক জ্বালা, তারা কোন ঘটনাকে তুচ্ছ বলে উড়িয়ে দিতে পারে না। সব সময় তার মাথায় ঐ ঘটনা ঘুরে বাড়াতে থাকল। সে খুঁজে বেড়াতে থাকল তার অপরাধ! সে যে বনের সুন্দর ঘাস ফুল ভেবে বিষের আধার তুলে এনেছে তা বুঝতে পারল না। এমন চলতে চলতে কাজল একদিন শ্বশুর বাড়ির পাড়ার এক ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গেল। গয়না আর টাকা যে সেখানে নিয়ে গিয়ে কেন রেখেছিল সে এখন বুঝতে পারল। নিজের ভূল বুঝতে পেরে সে অনুশোচনায় ভেঙে পড়ল। অসহ্য মানসিক চাপ নিয়ে একদিন সে রাতে বিছানায় ঘুমাতে গেল আর তার ঘুম ভাঙল না। সেধে সেধে সে মৃত্যুকে বেছে নিলো। এটাকে নিয়তি বলবে না অপরিনাম দর্শিতা?
No comments:
Post a Comment
আপনার মতামত প্রদান করুন....