Sunday, January 15, 2023

নিরূদ্দেশ অনুপম দাস

সাহিত্যের অঙ্গনে !! January 2023



নিরূদ্দেশ
অনুপম দাস

ঝুপুস বৃষ্টি নামলে ঘরে চুপটি করে বসে না থেকে অর্কর। নিরূদ্দেশ হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। এই বৃষ্টিভেজা দিন গুলোতে তাই সুযোগ পেলেই ট্রেনে চড়ে অর্ক শহরবা শহরতলি ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় কোন নাম না জানা স্টেশনে। তিন বছর ধরে সমাজের তথাকথিত নিচু তলার মানুষদের নিয়ে গবেষণা করছে অর্ক, জন্মসূত্রে আপাদমস্তক শহুরে হলেও,  উদাস করা এক রাখালিয়া মেঠো সুরে ওর মন অনুরণিত হয়। তাই মাঝে-মাঝেই কংক্রিটের জঙ্গল থেকে মুক্তি নিয়ে অর্ক পৌঁছে যায় শাল-পিয়ালের জঙ্গলে। মহামারীর আবহে যখন ট্রেনের চাকা স্তব্ধ হয়ে যায় তখন অর্ক হাঁপিয়ে ওঠে। আজ এই বৃষ্টি ভেজা দিনে ব্যালকনিতে একলা দাঁড়িয়ে এমনই এক দিনের স্মৃতি অর্কর মনে আরো এক পরত বিষন্নতার প্রলেপ লাগিয়ে দিল।

গতবছর মার্চ মাসে গবেষণার কাজে অর্ক গিয়েছিল পুরুলিয়ার আদিবাসী অধ্যুষিত বরন্তি গ্রামে। সকাল থেকে পায়ে হেঁটে বেশ কয়েকটা গ্রামে ঘুরেছিল। গ্রামের মানুষদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করে দুপুরে ক্লান্ত হয়ে সে একটা বুড়ো বট গাছের তলায় বসে পরেছিল। 

"তুমি কে ? কোথা থেকে আসছ? বছর দশেকের একটি বাচ্চা মেয়ে সাঁওতালি ভাষায় অর্ক কে জিজ্ঞেস করল।  গাছের  ছায়ায় বসে অর্কর একটু তন্দ্রা এসে গিয়েছিল হঠাৎ মেয়েটির কথা শুনে চমকে উঠল। আদিবাসীদের নিয়ে গবেষণা করবে বলে অর্ক সাঁওতালি সহ আরো কয়েকটা অস্ট্রিক ভাষা শিখে নিয়েছিল। তাই মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে ওর কোন অসুবিধা হয়নি। অর্ক খুব বাচ্চা ভালোবাসে, তাই মেয়েটির সঙ্গে ও সহজেই ভাব জমিয়ে নিল। অর্কর প্রচন্ড জল তেষ্টা



 পেয়েছিল। সেকথা মেয়েটিকে বলতেই ও দু কিলোমিটার দূর থেকে অর্ক কে জল এনে দিয়েছিল। জল খেয়ে তৃপ্ত হলেও এই একরত্তি  মেয়েটা ওর জন্য এতটা কষ্ট করছে দেখে অর্কর খুব লজ্জা করেছিল । মেয়েটির নাম গুঞ্জা। এই নামটাও অর্কর খুব মিষ্টি লেগেছিল। মাত্র ঘন্টা দুয়েকের আলাপে গুঞ্জা অর্ককে আপন করে নিয়েছিল।

ট্রেনে ফেরার সময় গুঞ্জার বড় বড় দুটো চোখ বারবার অর্কর চোখে ভেসে উঠেছিল। সেই চোখের দৃষ্টিতে গ্রামীণ সরলতা যেমন ছিল তেমন যে একটা দৃঢ় প্রত্যয় ছিল তা ওর  নজর এড়ায়নি। গুঞ্জা বলেছিল ওর বাবা নেই, এতোটুকু বয়সে  বাবা না থাকার যন্ত্রণা নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করতে পারে অর্ক।

তারপর নাগরিক জীবনের ব্যাস্ততায় গুঞ্জার কথা অর্কর আর তেমন করে মনে রইল না। গত বছর ডিসেম্বর মাসে গবেষণার কাজে পুরুলিয়া গিয়েছিল অর্ক । সেদিন ও সকাল থেকে  ঝুপুস বৃষ্টি হচ্ছিল। তাই অর্ক ঠিক করেছিল কাজ মিটিয়ে সোজা হাওড়ার ট্রেন ধরবে। পুরুলিয়ায় গিয়েই অর্কর হঠাৎ গুঞ্জার কথা মনে পড়ে গেল। তাই কাজ মিটতেই বৃষ্টি মাথায় করে অর্ক বেরিয়ে পরল। বিকেল তিনটে নাগাদ ও বরন্তি গ্রামে পৌঁছল। ততক্ষণে বৃষ্টি থেমে রোদ্দুর উঠেছে। আদিবাসীরা রাস্তায় এসে পরন্ত বিকেলের মিঠে রোদ পোহাচ্ছে। তাদের গুঞ্জার নাম বলতেই ওরা চুপ করে গেল। ওরা নিজেদের মধ্যে চোখে চোখে কি যেন কথা বলল, তারপর অর্ক আবার যখন গুঞ্জার প্রসঙ্গ তুলল, তখন ওরা কথা না বলে শুধু একটা ঘৃণার দৃষ্টি


ছুঁড়ে দিল। না, এই গুগুল যুগেও গুঞ্জা সম্পর্কে আর কোনতথ্য জোগাড় করতে পারে নি অর্ক।




No comments:

Post a Comment

আপনার মতামত প্রদান করুন....

নবতম প্রকাশিত সংখ্যা

অপূর্ণ স্বপ্ন

অপূর্ণ স্বপ্ন  বিপ্লব মাহাতো পূর্ণিমা রাতে চাঁদের এ কী মেলা, ও সুন্দরী, ভালো লাগে না আর লুকোচুরি খেলা। ভেবেছিলাম তোমাকে নিয়ে যাবো দূরদেশে, ...

আরও পড়ুন