Sunday, January 15, 2023

বৃষ্টির গন্ধ গৌরাঙ্গ শ্রীবাল

সাহিত্যের অঙ্গনে !! January 2023


বৃষ্টির গন্ধ 

গৌরাঙ্গ শ্রীবাল 



অনেক দিন হল সুদীপ্ত মারা গেছে। 

      সুদীপ্ত যে মারা গেছে তা মনেই হয় না মন্দিরার। কারণ মন্দিরার হৃদয়ে থেকে গেছে সুদীপ্তর অনেক কথা। কথা আছে যখন, মানুষ আছে। কলেজে যেদিন মন্দিরার সঙ্গে সুদীপ্তর প্রথম কথা হয়েছিল, সেদিন সুদীপ্ত মন্দিরাকে বলেছিল, ‘মন্দিরা, তুমি যেন শ্রাবণের মেঘ।’ 

      সুদীপ্তর কথায় খুশি হয়েছিল মন্দিরা। সে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুমি জানলে কী করে?’ 

      ‘তোমার সারা গায়ে বৃষ্টির গন্ধ।’ উত্তর দিয়েছিল সুদীপ্ত। 

      খিল খিল করে হেসে উঠেছিল মন্দিরা। তার হাসি দেখে সুদীপ্ত বলেছিল, ‘তুমি যে এইভাবে হাসছ না, আমি যেন দেখতে পাছি চারদিকে বৃষ্টির ধারা ঝরে পড়ছে।’ 

      ‘ভিজে যাবে তো তাহলে।’ 

      ‘ভালোবাসার বৃষ্টিতে ভিজতে ক্ষতি নেই।’ 

      না সুদীপ্ত মন্দিরার বৃষ্টিতে ভিজেনি। বরং যখনই এই কথাগুলি ভাবে তখনই মন্দিরা তার নিজের চোখের জলে ভিজে যায়। এ চোখের জল তার যতখানি না সুদীপ্তর দুঃখে তার থেকে বেশি আনন্দে। কারণ সমস্ত দুঃখকষ্টের মাঝেও থেকে গেছে এইটুকু ভালোবাসার গন্ধ। 

      সুদীপ্ত থার্ড ইয়ার ইংরেজি অনার্স। মন্দিরা প্রথম বর্ষ জুলজি অনার্স। সুদীপ্ত ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য। নবাগত ছাত্রছাত্রীদের ভর্তির সময় সহযোগিতা করতে গিয়ে মন্দিরার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় সুদীপ্তর। 

      তার পর দেখাশোনার পথে হল আরও ঘন পরিচয়। পরিচয় গড়ায় ভালোবাসায়। তাদের ভালোবাসা বেশ জমে উঠেছিল। সে ভালোবাসা গড়িয়ে গিয়েছিল অনেক দূর পর্যন্ত। 

      সুদীপ্ত ইংরেজি অনার্স পাশ করে কলেজ থেকে বেরিয়ে মাস্টার ডিগ্রি করতে ভর্তি হল ইউনিভার্সিটিতে। তার বছর দুই পরে মন্দিরাও জুলজি পাশ করে বেরিয়ে গেল। সেও মাস্টার ডিগ্রিতে ভর্তি হল। 

      তবে সুদীপ্ত ও মন্দিরার ছাড়াছাড়ি হয়নি। তাদের ভালোবাসা ছিল গভীর। 

      কিন্তু সব গভীরতার একটা তল থাকে। সেই তল স্পর্শ করাটা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। মন্দিরা ও সুদীপ্তর ভালোবাসার গভীরতার তল যদি স্পর্শ করে মৃত্যু? তার কাছে অসম্ভব কিছু নেই। 

      একদিন ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট হস্টেলে সুদীপ্তকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার মৃত্যুর তদন্ত চলছে। তদন্তের কাজে মন্দিরাকেও ঝামেলা পোহাতে হল।
এই ঝামেলা থেকে পাস কাটাতে শুরু হল মন্দিরার পাত্র খোঁজার পালা। 

      দুজনের ভালোবাসার কথা কেউ বাড়িতে জানানোর সময়টুকু পেল না। হঠাৎ মৃত্যু এসে সব এলোমেলো করে দিল। 

      মন্দিরাকে বাবা-মা-র সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হল। মাস্টার ডিগ্রিতে পড়তে পড়তে ভাঙা ঘরে চাঁদের আলোর মতো সুদীপ্তর কথাগুলিকে বুকে মুঠো করে রেখে মন্দিরা বিয়ের পিঁড়িতে বসল। মন্দিরার স্বামী ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট অফিসের ক্লার্ক। প্রচুর চাপ। 

      মন্দিরারও চাপ কম নয়। নিজের পড়াশুনা, স্বামীর অফিস যাওয়ার তাড়া, তারই মাঝে গোপনে গোপনে আবার সুদীপ্তর স্মৃতি রোমন্থন করে আবেগে আপ্লুত হওয়া। 

এইভাবে দেখতে দেখতে বছর সাত-আটেক কেটে গেল। মন্দিরা অনেক চেষ্টা করেছে, চাকরিবাকরি পায়নি। এখন সে মেয়েকে নিয়ে পড়েছে। তার একটি বছর ছয়েকের মেয়ে সুদীপা। নামটা সে সুদীপ্তর নামের সঙ্গে মিলিয়ে রেখেছে। মেয়ের এই নাম রাখার পিছনের ভাবার্থ মন্দিরার স্বামী জানে না। 

      মন্দিরা জানে। 

মন্দিরা জানে বলে তার মাঝে মাঝে ভয় করে। কারণ সে সুদীপার মধ্যে যেন সুদীপ্তর ছায়া দেখতে পায়। মাঝেমধ্যে হঠাৎ করে মন্দিরাকে তার মেয়ে সুদীপা জিজ্ঞেস করে ফেলে, ‘মা তুমি কি বৃষ্টিতে ভিজেছ?’ 

‘কেন বল তো সোনা?’ মন্দিরাও পালটা প্রশ্ন করে ফেলে। 

‘তোমার সারা গায়ে বৃষ্টির গন্ধ।’ 

মন্দিরা নাক দিয়ে নিজের গায়ের গন্ধ শুঁকে বলল, ‘কই না তো। এখন বৃষ্টি কোথায়?’ 

‘হ্যাঁ মা, আমি তোমার সারা গায়ে বৃষ্টির গন্ধ পাচ্ছি।’ 

মন্দিরা কথা ও সুদীপার মনটাকে ঘোরানোর জন্য বলল, ‘কী যে বলিস না, মন দিয়ে ছবিটা আঁক।’ 

মন্দিরা সুদীপাকে ছবি আঁকায় মন দিতে বললেও তার মনে অন্য কথা চলতে লাগল। সে মেয়ের কাছে থেকে সরে এল। ভাবতে লাগল কেন মাঝে মাঝে সুদীপা এমন কথা বলে? ওর মধ্যে কি তবে…। না ও এমনিই বলছে? না এটা কোনো মানসিক রোগ? 

মন্দিরা কিছু বুঝে উঠতে পারে না। সুদীপ্তর রেখে যাওয়া কোনোকিছু তো মন্দিরার কাছে নেই, যা সুদীপা দেখে ফেলতে পারে। যা আছে তার বুকের ভিতরে জমানো কথা। সে কথা তো কারও কাছে কোনোদিন বলেনি। 

তবে?
তবে সুদীপা জানল কী করে? ভাবতে ভাবতে মন্দিরার বুকটা ভারী হয়ে উঠল। টল টল করে উঠল দু-চোখ, গড়াতে লাগল গাল বেয়ে। 

ঠিক এই সময় সুদীপা এসে তার মাকে জড়িয়ে ধরল। মন্দিরা তাড়াতারি চোখে জল মুছে বলল, ‘কী হল সোনা তুমি চলে এলে কেন?’ 

‘চল মা, দেখবে চল, আমি তোমার একটা ছবি এঁকেছি।’ 

‘তাই! চল দেখি চল।’ মন্দিরা বলল। 

‘আর তোমার সেই ছবি থেকেও না বৃষ্টির গন্ধ বেরোচ্ছে।’ 

      ‘সোনা! এ তুই কী বলছিস?’ 

      ‘জানি না মা। আমি তোমার মধ্যে শুধু বৃষ্টির গন্ধ পাই।’ 

      ‘না সোনা। আমার মধ্যে কোনো বৃষ্টির গন্ধ নেই।’ বলেই মন্দিরা তার মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁদতে লাগল। 

      ‘কাঁদছ কেন মা?’ সুদীপা বলল। 

      মন্দিরা মেয়ের মনের ভাব কিছুটা আন্দাজ করতে পারল। সে সুদীপার কথায় সায় দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁরে সোনা। আমি শ্রাবণের মেঘ। আমার সারা গায়ে বৃষ্টির গন্ধ।’ 

‘কেন এমন হয় মা?’ 

‘জানি না। তবে এরকম মাঝেমধ্যে হয়।’ 

‘আচ্ছা মা তুমিও আমার গায় কোনো গন্ধ পাও’ 

‘হ্যাঁ।’ 

‘মিষ্টি গন্ধ।’ 

‘হল না, হল না।’ 

‘কী হল না।’ 

‘আমার দেহের গন্ধের সঙ্গে তোমার আন্দাজ মিলছে না।’ 

‘তবে?’ 

‘আমিও ঠিক বুঝতে পারছি না।’ 

‘আমি বুঝতে পারছি।’ 

‘কী?’ 

‘আমার শরীর বৃষ্টির শরীর। সেই শরীর থেকে তোমার জন্ম। তোমার শরীরেও সেই একই বৃষ্টির গন্ধ।’ 

সুদিপা আনমনা হয়ে বলল, ‘হয়তো তাই।’ 

মন্দিরা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে খুব করে আদর করতে লাগল। সুদীপার সারা গালে মুখে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিতে লাগল। এবং বলতে লাগল, ‘আমরা দুজনে বৃষ্টির মেয়ে। আমাদের গায়ে শুধু বৃষ্টির গন্ধ।’ 

      বলতে বলতে মন্দিরা আদরে সোহাগে সুদীপাকে কাতুকুতু দিতে লাগল। সেই শিহরনে সুদীপা ‘হি-হি-হি’ হাসতে লাগল।

No comments:

Post a Comment

আপনার মতামত প্রদান করুন....

নবতম প্রকাশিত সংখ্যা

অপূর্ণ স্বপ্ন

অপূর্ণ স্বপ্ন  বিপ্লব মাহাতো পূর্ণিমা রাতে চাঁদের এ কী মেলা, ও সুন্দরী, ভালো লাগে না আর লুকোচুরি খেলা। ভেবেছিলাম তোমাকে নিয়ে যাবো দূরদেশে, ...

আরও পড়ুন