নবম কন্যা
অধীর সিনহা
‘বাবা, এক সপ্তাহ হয়নি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছ।কোন সকালে ট্যাবলেট দিয়ে গেলাম,খাওনি কেন? কবে ভালো হয়ে প্রতিমা তৈরি করবে?’ গৌরী রাগত স্বরেই বলল।
‘বড় তেতো ওষুধ মা, মিষ্টি কিছু খেতে ইচ্ছে করছে।’
‘সব পাবে-ওষুধ খেয়ে আগে সেরে ওঠো। কুমারটুলির সব ঠাকুরের মাটি সুরু হয়ে গেছে। তুমি খড় বেঁধেই অসুস্থ হয়ে পড়লে।এখন হাত চালিয়ে কাজ করতে হবে। ’
‘আমি এখন অনেক সুস্থ হয়ে গেছি।এক কাজ কর, আমার লাল খাতার লিস্ট দেখে তাড়াতাড়ি ৯ জায়গা থেকে ৯ কন্যার মাটি জোগাড় কর। এই মাটি দিয়েই মায়ের কাজ সুরু হয় প্রতিবার। এবারে আমি বাইরে সব জায়গায় যেতে পারব না, শক্তি নেই। অবশ্য সব জাগায় তুইও যেতে পারবি না-তবু যতটা পারিস কাজ এগিয়ে রাখ।’
‘খাতা কোথায় বাবা?’
‘ওই বাইরের ঘরে রাখা আছে।খুঁজে নিতে পারবি না মা?’
গৌরী লাল খাতা খুঁজতে বাইরের লাগোয়া ঘরে ঢুকল। এটাই বাবার অফিস,গুদাম, একসাথে-খড়ের বিচালি ছড়িয়ে চারিদিকে। লাল খাতা চোখে দেখলেও কোনদিন পড়ে দেখেনি।অন্ধকারে হাতড়ে লাল খাতা পেয়ে গেল গৌরী।আঁচল দিয়ে ধুলো ঝেড়ে খাতা খুলল। এই ত মাটির লিস্ট; প্রথমে নর্তকী, তারপর কাপালিক, ধোপানী, নাপিতানী, ব্রাম্ভণী, শূদ্রাণী, গোয়ালিনী, মালিনী,শেষে বেশ্যা বাড়ি।
গৌরী খেয়াল করল তার আঁচল কাঁধ থেকে সরে যাচ্ছে,চমকে পেছনে তাকাল, ‘একি স্বপনদা? এখানে? পায়ে পড়ি, ছাড় আমাকে,বাবা টের পাবে।’ গৌরীর কাতর আর্তনাদ।
‘ওষুধের জন্য অনেক টাকা নিয়েছিস,তখন শোধ দেবার কথা বলেছিলি? চিন্তা নেই ফেরত দিতে হবে না।’
‘সব টাকা আমি শোধ করে দেব,আমায় ছেড়ে দাও,’গৌরী শেষ চেষ্টা করল।
‘কোন দরকার নেই শোধ করার, খালি মাঝে মাঝে...,’ স্বপনদার শ্বাপদ থাবার মধ্যে গৌরীর লাজ লজ্জা একাকার গেল।
‘ছাড়ো আমাকে,বুকে লাগছে।আমি সব টাকা মিটিয়ে দেব...।’
আসুরিক শক্তির কাছে এক মাটি হয়ে গেল গৌরী-কানে এলো বাবার ডাক।পেঁচান হাতে দাঁত বসিয়ে দিল গৌরি। শাড়ি তুলে গৌরী ঘর থেকে বেরতে গিয়ে দেখে বাবা বাইরে দাঁড়িয়ে,
‘শাড়িটা পড়েনে মা, তারপর গঙ্গায় চান করে-এক ঘটি জল নিয়ে আয়।’
গৌরী বাবাকে দাওয়ায় বসিয়ে, গঙ্গায় ডুব দিয়ে ভিজে কাপড়ে এক ঘটি জল নিয়ে এলো। রুদ্ধ স্বরে বাবা বললেন,
‘এবারে চৌকাঠের নীচে থেকে এক চিমটে মাটি তুলে নে। ন কন্যার লিস্টের শেষ পুণ্যবতী কন্যা তুই। অন্য কোথাও যাবার দরকার নেই।’
No comments:
Post a Comment
আপনার মতামত প্রদান করুন....