Thursday, July 3, 2025

আত্মিক যোগ সমীর কুমার দত্ত

মুকুর অনলাইন আষাঢ় সংখ্যা

আত্মিক যোগ 
সমীর কুমার দত্ত 
                  

একরত্তি ছেলেটা নামে দুষ্টু কাজেও দুষ্টু। বাবা মা'র সাত রাজার ধন এক মানিক। মরা হাজা ছেলে। সবে ধন নীলমণি। আবার দুষ্টুমিতে সকলকে অতিষ্ঠ করে তোলে।যখন তখন বাবা- মায়ের কাছে মার‌ও খায় । আর অমনি নিরাপদ আশ্রয়ে দাদু -ঠাকুমার কাছে দৌড়ে যায়। তবে হলে কি হবে বুদ্ধি ধরে খুব। ঠাম্মা - দাদুর সঙ্গে থেকে হয়েছে চালাক চতুর। দাদু সবসময় বুদ্ধিদীপ্ত গল্প বলে বলে ওকে অনেক চালাক করে দিয়েছেন। দাদু ছেলে বৌমাদের কাছে প্রায়শই বলেন, " ও আমার বাবা এসেছে। ভাব ভঙ্গি, চলন বলন , কথা বলার ধরণ সব আমার বাবার মতো।" আগে শুতো বাবা মায়ের মাঝে।এখন তার শোবার জায়গা হলো বদল। এখন সে শোয় ঠাকুর দাদা ও ঠাকুমায়ের মাঝে। অনেক দিন সে বাবা মায়ের কাছছাড়া। এখন তার জগৎ শুধু ঠাকুর দাদা আর ঠাকুমায়ের ছত্রছায়া। দাদুর সঙ্গে পার্কে যাওয়া , দাদুর সঙ্গে স্কুলে যাওয়া, সবেতেই দাদু। "গত জন্মে ছেলের ওপর জোর খাটাতে পারেনি বলে, এ জন্মে নাতি হয়ে এসে উসুল করে নিতে চায়।"— দাদু মাঝে মাঝেই এই কথা বলে থাকেন।একদিন সে লিখলো চিঠি ঘুমের ঘোরে বাবা মাকে।

"বাবা -মা, তোমরা কেমন আছো? তোমাদের অনেক দিন দেখিনি। আমার মন কেমন করছে তোমাদের দেখতে না পেয়ে। তোমরা সেই যে চলে গেলে , আমি তখন ঘুমচ্ছিলাম, আর এলেই না। আমি দুষ্টুমি করি বলে চলে গেলে? আমি সেই থেকে আর দুষ্টুমি করি না। সত্যি বলছি। তোমরা চলে যাবার পর দাদু, ঠাম্মি, কাকা মণি, কাকীমণি কি কন্নাই না কাঁদছিলো! আমি জিজ্ঞেস করেছি কতো বার—তোমরা কাঁদছো কেন? ওরা কোন উত্তর দিচ্ছে না। ঠাকুমা তো খুব কাঁদছে। যতো বলছি — কেঁদে না। কাঁদলে আমার ভালো লাগেনা। তবুও শুনছে না।

আমার এখানে আর ভালো লাগে না, তোমাদের দেখতে না পেয়ে। তোমরা এসে আমায় নিয়ে যাও। জানো তো কাল রাত্রে একটা স্বপ্ন দেখেছি। তোমরা একটা গাড়ি করে কোথায় যেন চলেছো। কোথায়? তা আমি বলতে পারবো না। হঠাৎ একটা গাড়ি এসে তোমাদের গাড়িটাকে খুব জোরে ধাক্কা মারলো। দুটো গাড়ি দুমড়ে মুচড়ে গেলো। আর কিছু মনে নেই। তারপর আমার ঘুমটা ভেঙে গেলো। চোখ খুলে দেখি আমি বিছানায় শুয়ে আছি। আমার পাশে কেউ নেই। সকলের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। আমার ছুটি পড়লে তোমাদের কাছে যাবো। আমি আর দুষ্টুমি করি না। সত্যি বলছি। তোমরা ভালো থেকো।কেমন?
            —ইতি
        তোমাদের দুষ্টু "
  
দুষ্টুর এই স্বপ্ন দেখার আগেই বাড়ির মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ এমন কিছু ঘটনা ঘটে চলছিলো যা স্বাভাবিক ছিলো না। হঠাৎ হঠাৎ শব্দ হ‌ওয়া, যার স্বাভাবিক কোন কারণ ছিলো না। দুষ্টু ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়তো। প্রায় দিনই স্কুল কামাই হতো। হঠাৎ হঠাৎ চোট লাগতো। বাড়ির লোকেরা এ সবের কারণ জানতো। সবচেয়ে বড়ো কথা বাবা মা'র দুর্ঘটনা জনিত মৃত্যুর কথা কোনদিন তাকে জানানো হয় নি। তার অজ্ঞাত থাকলেও মৃত্যুর ঠিক অব্যবহিত পূর্বেই সে স্বপ্নে দেখে নিয়েছে।

হঠাৎই ঠাম্মির গলা শোনা গেলো, "দুষ্টু উঠে পড়ো। ছটা বাজে।স্কুল যেতে হবে। স্কুলের নাম শুনলে দুষ্টু তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে প্রস্তুত হয়ে যায়। কারণ স্কুলে গেলে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে পাবে , ঘরে তো ওর সমবয়সী কেউ নেই। ওই দাদুকে খেলতে হয়। পার্কে খেলতে গেলে দাদু, এসে সন্ধ্যে হলে দাদুর কাছে হোম ওয়ার্ক করা, সব‌ই দাদু। দাদুময় জীবন। স্কুলের জন্য রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ে। দুষ্টু সামনে আর দাদু ব‌ইয়ের ব্যাগ বহে নিয়ে পিছনে পিছনে যেতে থাকেন। মুহূর্তের মধ্যে রাস্তায় পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা একটা মাল বোঝাই লরি ব্রেক ফেল করেই হোক,আর ভুলক্রমে অ্যাক্সিলেটরে পা পড়ে যাওয়ার জন্যেই হোক লরিটা দুষ্টুকে ও ওর দাদুকে নিয়ে একটা দেওয়ালে পিষে দিলো মুহূর্তের মধ্যে।এতো চকিতে ঘটনাটা ঘটে গেলো যে কিছু করার সুযোগ‌ই পেলেন না দাদু নিজেকে ও নাতিকে বাঁচাতে। দু দুটো প্রাণ চলে গেলো কতো সহজে।

দু দুটো মৃত্যু কতো অনিবার্য ছিলো। ছেলে বৌয়ের মৃত্যু যেমন আচম্বিতে ঘটে গেছে, আর তাদের অতৃপ্ত আত্মা তাদের সন্তানকে টেনে নিতে চেয়েছে। কিন্তু সন্তান তো একা একা যাবে না। দাদুর সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক। সুতরাং সে দাদুকে না নিয়ে যাবে না। ছেলে বৌ এর নিয়তি ছিলো এক‌ই স্থানে,এক‌ই সময়ে মৃত্যু বরণ করা তেমনি দাদু নাতির নিয়তিও তাই ছিলো। কেউ কাকেও ভালোবাসলেই শুধু হয় না। আত্মিক সম্পর্ক থাকা চাই। আত্মার সঙ্গে আত্মার যোগ না হলে এমনটি ঘটে না। বাবা মা'র অতৃপ্ত আত্মা প্রিয় ছেলের আত্মাকে টানতে চেয়েছে। ছেলের আত্মা তার ধ্যান জ্ঞান দাদুর আত্মাকে না নিয়ে যাবে না।

No comments:

Post a Comment

আপনার মতামত প্রদান করুন....

নবতম প্রকাশিত সংখ্যা

অপূর্ণ স্বপ্ন

অপূর্ণ স্বপ্ন  বিপ্লব মাহাতো পূর্ণিমা রাতে চাঁদের এ কী মেলা, ও সুন্দরী, ভালো লাগে না আর লুকোচুরি খেলা। ভেবেছিলাম তোমাকে নিয়ে যাবো দূরদেশে, ...

আরও পড়ুন