মোহাম্মদ আতিকুল ইসলাম
“১”
কতক্ষণ জ্ঞান ছিলো না, আমার জানা নেই।
কেউ আমাকে রাস্তার পাশে বুনো জঙ্গলে ফেলে রেখে গেছে। জায়গাটা স্যাঁতস্যাঁতে, বুনো ঘাস ও বুনো ফুলের ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে আসছে। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শোনা যাচ্ছে ঝিঁঝিঁ পোকার বিরামবিহীন ডাক।
যতদূর মনে পরে, প্রতিদিনের মতো সেদিনও কলেজ শেষ করে টিউশনি করতে যাই। ছাত্রী পড়িয়ে বের হতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। কয়েকদিন পর ছাত্রীর ফাইনাল পরীক্ষা। আর এ কারনে এখন কিছুটা বেশী সময় দেয়ার চেষ্টা করি। আমার বাড়ি গ্রামে। শহর থেকে একটু দুরেই। প্রথমে বাসে করে প্রায় ৬ কিলোমটার গিয়ে নামতে হয় নতুনগঞ্জ বাস স্ট্যান্ডে। সেই বাস স্ট্যান্ড থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার ভিতরে আমাদের বাড়ি, রিক্সায় যেতে হয়। আজ পৌঁছাতে রাত আটটা বেঁজে যাবে নিশ্চিত।এমনটা হলে আম্মুকে ফোন করে জানিয়ে দেই, না হলে বড্ড দুশ্চিন্তা করে আম্মু। এবং বাড়িতে না ফেরা পর্যন্ত তা চলতেই থাকবে সেই দুশ্চিন্তা।
বলে নেয়া ভাল, আমি আবার একটু সিরিয়াস টাইপের মেয়ে। অবশ্য সিরিয়াস না বলে একটু বেশীমাত্রায় দায়িত্বশীল বলাটাই শ্রেয়তর। অবশ্য দুষ্টুজনেরা সিরিয়াস তকমাটা লাগিয়ে দিয়েছে। কেউ আরো দুই এক ডিগ্রি সরেস, তারা বলে আমি নাকি রোবোটিক।
বলতে থাক তোরা। আমার কিছু যায় আসে না। আব্বু বেঁচে নেই। আম্মু প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা। বাসায় বুড়ী দাদী রয়েছে। আমি সবার বড়। আমার ছোট আরো দুজন ভাই বোন আছে। তাই আম্মুকে কিছুটা সাহায্য করি। যতোটা পারি নিজের খরচ, নিজেই আয় করে চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করি।
যা বলছিলাম, আমাকে রোবোটিক বললেও আমি খুব একটা মাইন্ড করি না। কারণ জানি আমি যথেষ্ট জলি মাইণ্ডের, সাথে সেন্স অফ হিউমারও বেশ ভাল আর সেই সাথে খুবই মিশুক। বন্ধু মহলে ও বাড়িতে হি হা হু হু করেই সময় পার করে দেই। তাই ওদের গুজবে কান দেই না। কারণ ওরা পাত্তা না পেয়েই এমনটা করে থাকে।
আমি শুধু জলি মনের মেয়ে নই, যথেষ্ট সুন্দরীও বটে।
কি ভাবছেন, গাল গপ্পো করছি? শুধু সুন্দরী বললেও ভুল হবে, বলা উচিত আগুন ঝরা সুন্দরী। আপনারা যাকে স্ট্যাটিসটিক্স বলেন, কি লজ্জা পেলেন- ওটাও বেশ পারফেক্ট। আর আমি জানি কোন পোশাকে এটা আরো ভালো দেখায়। বলতে পারেন, গ্রামে থাকলেও এদিকে যথেষ্ট স্মার্ট।
থাক এ কথা। এটা না হয় অন্য আরেকদিন বলা যাবে। বর্তমান কথা হচ্ছে আমার খুব ক্ষুধা লেগেছে। জানি না কতক্ষণ এখানে পড়ে ছিলাম। শরীরে প্রচন্ড ব্যাথা। আমার মাথাটা.........!!!
কিন্তু এ কী? আমার মাথা কই? আমি মাথা খুঁজে পাচ্ছি না। হাত দিতেই, মাথার ওই জায়গায় থিকথিকে কিছুর স্পর্ষ পেলাম, রক্ত নাকি? ধাতস্ত হতে সময় লাগবে একটু। মনে হচ্ছে আমি এখন স্কন্ধ কাটা। ছোট বেলা থেকে এদের গল্প অনেক শুনেছি। অতিপ্রাকৃত চরিত্র হিসেবেই এদের মেনে নিয়েছি। কখন বিশ্বাস করি নি। অতিপ্রাকৃত ঘটনাতেই কখনো বিশ্বাস ছিল না। কিন্তু নিজেই এখন অতিপ্রাকৃত চরিত্র, বুঝতে পারছি না। কি করা উচিত? আমার ক্ষুধা লেগেছে প্রচন্ড, সুতরাঙ তত্ব র্চচা করে লাভ নেই।
“কিন্তু কী খাব?”
“তার থেকেও মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন কিভাবে খাব?”
“কোথায় খাবার পাব? কী পরিমাণে পাব এবং কখন কিভাবে পাব?”
“খাবার কি কিনতে হবে? বিনিময় মুদ্রা কী? কিনেই যদি খেতে হয়, তাহলে আর্থিক অবস্থাটাই বা কী ?” অনেক কিছু জানতে হবে। আমারতো মুখও নেই। কিযে ব্যারা চ্যারা অবস্থা। হঠাৎই একটু আলোর দিশা পেলাম। একটু গুগলিং করলেই পাওয়া যাবে।সো নো চিন্তা ডু ফুর্তি। দেখা যেতে পারে ফুড পান্ডাকে বললে হোম ডেলিভারি দিতেও পারে।
“কিন্তু ঠিকানা কী দিব?”
সে পরেও ভাবা যাবে। আগে জানতে হবে কী খেতে হবে? আর কিভাবে খেতে হবে? মোবাইলটা বের করি। ব্যাগেইতো রেখেছিলাম। কিন্তু ব্যাগ কই। মোবাইলইবা গেলো কই। আর আমি এখানেই বা কেন?
“আমি কি ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছিলাম?”
“নাকি অন্য কিছু?”
সারা শরীরে ব্যাথা, বিশেষ করে দুই উরুর সন্ধিস্থলে প্রচন্ড ব্যাথা। পরনের জামাটিও ছিড়ে গ্যাছে অনেক জায়গায়। ওড়নাটি খুঁজে পাচ্ছি না।
গাড় অন্ধকার, কিছুদূরের হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি চলে যাচ্ছে।গাড়িগুলির হেডলাইটের আলো যেনো আধিভৌতিকই করে ফেলেছে।
“কী অদ্ভূত, আলোটাকেই কেন ভৌতিক মনে হচ্ছে?”
মাথা নেই, চোখ নেই। “তবে আমি ভাবছি কী করে?” লম্বা মানুষের নাকি হাঁটুতে বুদ্ধি থাকে। হতেও পারে। আমার হাইট পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি ছিল। বাঙ্গালী মেয়ে হিসেবে যথেষ্টই লম্বা, “কি বলেন?” হাঁটুতে ছটাক খানেক বুদ্ধি থাকলেও থাকতে পারে।
“কিন্তু কিভাবে দেখছি?”
ওমা!!! আপনারা, সত্যিই বিশ্বাস করছেন, আমার হাঁটুতে বুদ্ধি। কি বোকা আপনারা!!! অতৃপ্ত আত্মাদের আপনাদের জৈবিক আকার দিয়ে ভুল ব্যাখ্যা করতে যাবেন না। আমাদের কাছে এই আকারের খুব একটা মূল্য নেই।
জায়গাটা বিশ্রী, শরীরের অনেক স্থানে চুলকাচ্ছে। এখান থেকে উঠা যাক। রাতটাও গভীর হয়েছে। চারদিকে শুনসান নিরবতা। অবশ্য হাইওয়ে দিয়ে চলে যাওয়া গাড়ি অবশ্য থেকে থেমে সেই নিরবতা ভেঙ্গে দিচ্ছে। গ্রামে বিদ্যুৎ থাকলেও রাস্তায় শহরের মতো স্ট্রিট লাইটিং নেই। সে অর্থে আমার চলাফেরার জন্য চমৎকার পরিবেশ আছে।ভুতুরে বৈদ্যুতিক আলোর ছড়াছড়ি নেই।
“আচ্ছা এখন কি জিজ্ঞেস করার জন্য কি কাউকেই পাওয়া যাবে?” গ্রামের অনেকেই অতিপ্রাকৃত বিষয়ে বেশ ধারণা রাখে। দেখা যাক না জিজ্ঞেস করে,
“আমার খানা কী?”
“কিভাবে খাব? কোথায় গেলে খানা পাব?”
কবি সুকান্তের ভাষায়,“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়,পূর্ণিমার চাঁদ যেনো ঝলসানো রুটি।”
আমার চিন্তা ভাবনাটা পুরোটাই ক্ষুধা কেন্দ্রিক। অন্য সবকিছুই এখন মূল্যহীন মনে হচ্ছে।
কিন্তু আমার কাছে পূর্ণিমার সৌন্দর্যের কোন মূল্য নেই। অমাবস্যাকেই বেশী মোহনীয় মনে হচ্ছে আমার কাছে। স্কন্ধকাটা আর মনুষ্য প্রভেদ বের করতে আমাকেতো রীতিমতো থিসিস করতে হবে।
উফফ, স্কন্ধ জীবনেও পড়ালেখা!!!
“এদের সিলেবাসটা কী?”
“কিভাবে মানুষকে ভয় দেখাতে হয়?”
“মানুষ ভক্ষণের রীতিনীতি, এরকম কিছু?”
“এদের মাঝেও কী ডাক্তার, প্রকৌশলী, লেখক, গায়ক, অভিনেতা, চিত্রকর আছে?” কিন্তু আমাদের মাথাইতো নেই।
দুষ্টু মাথা থাকার চেয়ে না থাকাটাই শ্রেয়তর।
“কি বলেন?”
“এরা মাথা খাটায় কী করে?”
ধুর, আমিই তো বলেছিলাম, অতিপ্রাকৃত চরিত্রকে জৈবিক আকার দিয়ে বিশ্লেষণ করাটা বোকামি। আমি স্কন্ধ কাটা হিসেবে এখনো পুরোপুরি মানিয়ে উঠতে পারি নি। সেই মিষ্টি মেয়েটিই রয়ে গেছি যেন।যে কি না আম্মুর বুকে মাথা রেখে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী প্রশান্তি পেয়ে থাকে।
জায়গাটা আমি চিনতে পেরেছি। ক্যানাল, আমার এক বন্ধুর বাসা এদিকে। আমার আজকের গল্পটা ওকে বলেছিলাম। ওইতো গল্পটা লিখছে। ক্যানাল যেটাকে বলা হয়, তাকে বঙ্গানুবাদ করে খাল করতে যাবেন না। এটা আদতে উঁচু একটা বাঁধ,বন্যার প্রকোপ থেকে রক্ষার জন্যে পাকিস্থান আমলে বাঁধটি নির্মান করা হয়েছিল। তবে এই অদ্ভুত নামটি কেন হলো গ্রামের লোক সেটা বলতে পারে না।
ক্যানালের এদিকটায় খুব একটা বসতি নেই। দুপাশ ঘনগাছে ছাওয়া। আমার কাছে মনে হচ্ছে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে অজস্র প্রহরী। আমার ভয় যে কোথায় দৌড়ে পালালো, ঠিক বুঝতে পারলাম না। এর থেকেও বড় কথা, আমার মধ্য ভয় নামক কোন বস্তুর অস্তিত্ব আছে কি?
অবশ্য আমি কিছুটা ভীতু ছিলাম, আম্মুকে ছাড়া কখনো রাতে একা বের হয়নি। খুব কষ্ট হচ্ছে, আম্মুটা একা কী করছে, কে জানে? আমাকে না পেয়ে তারতো পাগলপ্রায় হয়ে যাবার কথা। কিন্তু এভাবে আম্মুর সামনে দাঁড়াই কী করে?একটা দীর্ঘস্বাস বের হয়ে আসে নিজের অজান্তেই।
হাঁটতে হাঁটতে চৌরাস্তার মোড়ে পৌঁছে গিয়েছি।এর একটা রাস্তা পাশের দুটি গ্রামকে সংযুক্ত করেছে। আর উত্তরের রাস্তাটি গিয়েছে বাস্টপের দিকে। এখানে কিছু দোকান পাট থাকলেও সবগুলিই এখন বন্ধ। রাতটা আসলেই অনেক গভীর। কোন জনমানব নেই। হঠাৎ একটা শব্দ শুনতেই ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেলাম। বাহ বেশতো। আমি সহজেই ঘুরিয়ে ফেলতে পারি শরীরকে। কোন ভাঁজও পরে নি। জয়তু স্কন্ধ জীবন। আর আমি যে এতোক্ষণ পিছনের দিকে হেঁটে আসছিলাম, খেয়ালই করি নি।একটা কালো বিড়াল আমাকে দেখে দৌড়ে পালিয়ে গেল। ভয় পেয়েছে। পাশার দান উল্টে গেছে দেখছি। কাল্লু বিড়ালও আমায় দেখে ভয়ে পালায়!!!! হা হা আনমনেই হেসে উঠলাম।
“পুরো উলটোদিকে ঘুরে যাওয়ায় এখন কি আমাকে বড্ড বিশ্রী লাগছে?”
“কিম্বা বেশী ভয়ংকর কিছু?”
মাথা নেই, স্তন আর নিতম্ব দুটোও সামনের দিকে। কী করবো? আমার চোখ যে ঘাড়ে। আর এই যে আপনারা পুরুষরা, এ দুটোইতো দৃষ্টি দিয়ে গিলে ফেলতো চান। এখন দুটোই একসাথে দেখতে পাবেন- স্তন আর নিতম্ব।
“কি ভালো না?”
আরো বেশী সেক্সি মনে হওয়া উচিত, “কি বলেন?” পুরুষদের চোখতো সবসময়ই এর জন্য ছোক ছোক করে। সেটা কিশোর (যার গোঁফও গজায় নি) থেকে শুরু করে হাড় জিরজিরে বুড়ো সবাই।
ওমা, লজ্জায় দেখি আপনি লাল হয়ে গেছেন। আপনি পুরুষ- গুল্টু বাবু একটা, ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানেন না। ক্যানাল পেড়িয়ে কিছুটা উত্তরে গেলে বাপাশে একটা জেলে পাড়া পরল। “আমি কি পাড়াটিতে ঢুকব?” কেউ হয়তোবা সাহায্য করতেও পারে। নাহ,যাওয়াটা ঠিক হবে না। ছোট ছোট বাচ্চারা ভয় পেতে পারে। বরং সামনের দিকে কিছুটা এগোই। একটু হেঁটে গেলেই বাসস্টপ। ওখানে কিছু লোকজন পাওয়া যেতেও পারে।
জেলে পারা ছেরে বড় পুকুরটা যখন পার হয়েছি, তখন দূরে কিছু একটা আসতে দেখলাম। ছোট্ট খাট্ট গোলাকার ফুটবলের মতো গোলাকার বিশাল বপুর একজনকে এগিয়ে আসতে দেখছি। দেখি কিছু বলতে পারে কী না? ভদ্রলোকের মনে হয় বড্ড তারা। হন হন করে হেঁটে আসছে এদিকে।
কথা বলার জন্য যখনই প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখনই ওবাবাগো, ওমাগো বলে জ্ঞান হারালো। ধুস শালা, একটা মানুষ পেলাম, সেও কিছু বলার আগেই ঠুস। জ্ঞান নেই, কোন মানে হয়? এই ডিজিটাল যুগেও মানুষ যে কেন অতিপ্রাকৃত বিষয়ে এতো ভয় পায়? আমিইতো, সেই লক্ষ্মী মেয়ে।যে কিনা সামান্য রক্ত দেখলেই জ্ঞান হারাতাম।
“কয়লা ধুলে কি ময়লা যায়?”
“তো চাইলেই কি আমার চরিত্র চেঞ্জ করে ফেলতে পারব?” বোকা মানুষ, কেন যে বুঝতে চায় না। ধুর, উপকার তো হলোই না, বরং সমগ্র এলাকায় রটে যাবে এলাকায় একটা স্কন্ধ কাটা এসেছে। এবং আমি তাকে কিভাবে ভয় দেখিয়েছি তা নিয়ে আষাঢ়ে গল্প।
এদিকে প্রচন্ড ক্ষুধা, তীব্রতা যে বেড়েই চলছে।
“কী যে করি?”
“আচ্ছা আপনার জানা শোনা কোন স্কন্ধ কাটা আছে কি?” পাঠিয়ে দিন না আমার কাছে, আমার বড্ড উপকার হয়। আরো কিছুদুর এগোতেই আরো একটা মোড় পেলাম। রাস্তার পাশের বাসা থেকে আলো এসে কেমন যেন ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। রাস্তায় কয়েকটা কুকুর ছিল।আমাকে দেখেই কিউ কিউ করে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেলো।
“আমি কি এতোটাই বিভৎস?” একটা আয়নায় দেখতে পারলে বেশ লাগতো ।
এই রাস্তা দিয়ে হাঁটতে ভালো লাগছে এখানে অনেক বেশী, বাঁশ ঝারের কারনে অন্ধকার কিছুটা গাড় এখানে। পরিবেশটা তাই অনন্য, অনেক বেশী মোহনীয়। এগুতে থাকি সামনের দিকে।
“আচ্ছা দিনে আমি কোথায় থাকবো?”
“সুর্যের ভুতুরে আলো সহ্য করব কী করে?”
অবশেষে বাসস্টপে কাছাকাছি এলাম। কিন্তু বেশীমাত্রায় ভৌতিক আলোর ছড়াছড়িতে ওদিক দিয়ে পেরুনোর সাহস পেলাম না। তার মানে হচ্ছে, ভয় নামক বস্তু এখনো আমার মাঝে আছে। আলো এক প্রকার শক্তি। আর অন্ধকার আলোর অনুপস্থিতির মাত্রা।
“তাই কি? তাহলে, মনুষ্য জীবনের অনুপস্থিতিই কি স্কন্ধ কাটা জীবন, নাকি বোকা একটা তত্ব দিয়ে বসলাম?” তবে আর ভাবতে ইচ্ছে হচ্ছে না, প্রথম দিন হিসেবে চাপটা বড্ড বেশী হয়ে যায়।
আমি দোকানগুলির পিছনের অন্ধকার দিয়ে মহাসড়ককে কিছুটা দূরে রেখে ঢাকার দিকে হাঁটতে থাকলাম। কিছুদুর এগুনোর পরই মিষ্টি একটা খাবারের গন্ধে আমি মোহাবিষ্ট হয়ে গেলাম।অদ্ভুত সুন্দর একটা ঘ্রান। সত্যি বলতে খাবারের এতো চমৎকার সুঘ্রান আমি আমার মনুষ্য জীবনেও পাই নি। ক্ষুধাটা আরো বেশী চেগিয়ে উঠলো। আমি অন্ধের মতো ব্রিজের দিকে ছুটে চললাম। গন্ধটা আমি ওখান থেকেই পাচ্ছি, এখান থেকে প্রায় দুকিলোমিটার দূরে। আমি প্রায় উড়ে চললাম খাবারের দিকে। ক্ষিধেটা যে বড্ড জ্বালাচ্ছে।
“২”
মহাসড়কের ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে জল বিয়োগ করছে দুজন।কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে তাদের আরো দুজন সঙ্গী। রাত প্রায় একটা, মানুষজনের চলাচল প্রায় নেই বললেই চলে। গাড় অন্ধকারে এদের কোন ভয় নেই। বুক চেতিয়ে নির্ভীক ওরা আছে, সংখ্যায় চার। তবে এর থেকেও বড় কথা, ওরা পুরুষ। জন্ম সুত্রেই পেয়েছে শাসন করার অধিকার। প্রত্যেকের রয়েছে একটা করে রাজদন্ড। রাজদন্ডই ওদেরর পুরুষত্বের মুল দম্ভ। পরাশক্তির মুল উৎস।
রাফি এখন তার রাজদন্ডে মুক্ত আকাশে, এই ব্রিজে দাঁড়িয়ে একটু আলো বাতাস খাওয়ানো খাওয়াচ্ছে, মুক্ত আকাশে জলবিয়োগ। ফুসে উঠা এই সাপকে বসে আনতে তারা গ্যাং রেপ করেছে। ক্রুর হাসি ফুটে উঠল রাফির ঠোঁটে। জটিল মাস্তি করেছে। ধর্ষণ শেষে গলা কেটে ক্যানেলের পাশে ফেলে রেখেছে। কাক পক্ষিও টের পায় নি। আর চাইলেও চিনতে পারবে না। মাথাটা ফেলে দিয়েছে এই কালীগঙ্গায়।
তবে মনটা হঠাৎ খচ করে উঠল, ছিন্নভিন্ন কিছু পোষাক পড়নে রয়ে গেছে। এটাই না শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য কাল হয়ে উঠে।
“এই ভুলটা কী করে করল?”
রেপ করে তাকে পোষাক পড়তে দেয় তারা। খুব অনুনয়-বিনয় করছিল প্রানটা ভিক্ষা দেয়ার জন্যে। হয়তো চলে যেতে দিতো, কিন্তু রাফির মাথায় খেলা করল অন্যে এক সন্দেহ। এই মেয়ে চলে গেলে তাদের ফাঁসাবে। কঠিন ধাতের মেয়ে, সুযোগ পেলেই ছোবল মারবে।
তার হাতে চলে আসে কারুকার্য খচিত ছোরাটি। পিছন থেকে গিয়ে পোচ দিয়ে গলাটি নামিয়ে দেয়। ফিনকি দিয়ে বের হওয়া রক্তে ভেসে যায় সমস্ত শরীর। ছটফট করতে করত্র নিস্তেজ হয়ে যায় অবশেষে। পৈশাচিক হাসি দেখা যায় চারজনের ঠোঁটের কোনে। এখন খালটা পেড়িয়ে ক্যানালের পাশে বুনো ঝোপে ফেলে রাখলে কেউ টের পাবে না। সন্ধ্যার পর এদিকটায় কেউ আসে না। দিনেও খুব একটা মানুষজন এদিকে আসতে চায় না।
খুন করার পর থেকেই অদ্ভুত এক রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে রাফির। সুযোগ পেলেই ছুরিটা বের করে ঘুরাতে থাকে। এটা করলে নিজেকে হিরো হিরো লাগে। আজও জলবিয়োগ করার সময়ও ছোরাটা বের করে আনমনে ঘুরাতে থাকল রাফি। পাশেই দাড়িঁয়ে জল বিয়োগ করছে বদরুল। সে বলে উঠলো, “ভোদাই, আলগা পাঠ নেওয়া বাদ দেও। হাত থেকে ছোরা খসে পরলে তোর ওইটাও খইসা পরব। তখন শালা হিজরা হইয়া পাঠ নিতে হইব,” কথা শুনে খিক খিক করে হেসে উঠল দুলাল আর কামাল।
আমি ওই খচ্চর দুইটার মাঝে গিয়ে বসলাম। ওরা অবশ্য টের পায়নি এখনো, মনের সুখে গান গাইছে আর জলবিয়োগ করছে। ত্যাগেই সুখ। সুখে অবগাহন করতে থাক সোনারা। এখনই টের পাবে, আমি কে?
হেটলাইটের আলো দেখা যাচ্ছে, ব্রিজটা কেঁপে কেঁপে উঠছে কিছুটা। এক সাথে চলে আসছে কতগুলি নাইট কোচ আর ট্রাক। আলো এসে পরল আমার উপর, আমাকে দেখতে পেয়েছে এবার। ভয়ে স্থির গেছে চারজনই। যেনো জলজ্যান্ত চারটে স্ট্যাচু। ভয় পাবারই কথা। স্কন্ধ কাটা দেখে আনন্দ পাবার কিছু নেই। এর থেকেও বড় কথা,ওরাই আমাকে রেপ করে মেড়ে ফেলেছে। ভয়, তাই একটু বেশীই।
রাফির দিকে ঘুরে তাকাতেই ওর হাত থেকে ছোরাটা পরে গিয়ে ওর রাজদন্ডটা গোরা থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে গেলো নদীতে। জলের পরিবর্তে রক্তের ফোয়ারা বইতে লাগল। তীব্র যন্ত্রনায় চিৎকার দিয়ে উঠলো রাফি।উফফ কি যে পৈশাচিক আনন্দ লাগছে আমার, ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না।
আমি খপ করে ছোরাটা ধরেই ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেলাম। স্কন্ধ কাটা হওয়ায় এই এক বিশেষ সুবিধা হয়েছে। আমার ঘাড়ে যে চোখ আছে, গাধারাতো সেটা জানে না।
এবার বদরুলের দিকে তাকালাম, ভয়ে জলবিয়োগ থেমে গেছে। কিছু বোঝার আগেই ওর রাজদন্ডটাকেও শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলাম। একই রকম অমানুষিক চিৎকার করে উঠলো বদরুল।
আমি ভয়ংকর কন্ঠে (আমি নিজেই ইম্প্রেসড, এতোটা ভয়ংকর হবে আমি নিজেই বুঝতে পারি নি) বলে উঠলাম, “তোদের রাজদণ্ড কালীগঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে দিলাম, মাছের খাবার হবে কি বলিস?”
“তোরা আজ থেকে মুক্ত, চেতনাদন্ডের চাপে তোদের আর কোন মেয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পরতে হবে না,” গা হিম করা পৈশাচিক হাসি দিয়ে তাকিয়ে রইলাম তাদের দিকে। এবার দুলাল আর কামালের দিকে তাকালাম। ভয়ে দুজনেই কাপড় নষ্ট করে ফেলেছে। দেখে আনন্দে পৈশাচিক হাসি দিয়ে বললাম, “কিরে কাপড় নষ্ট করে ফেলেছিস? শোন এদের নিয়ে হাসপাতালে যা। হাসপাতালে ভর্তি করে সোজা চলে যাবি থানায়। ওখানে গিয়ে সব স্বীকার করবি। না হলে তোদের ওটাও শরীর থেকে আলাদা করে ফেলবো।”
বাধ্য ছেলের মতো ওরা রাফি আর বদরুলকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে রওনা হোল। পিছন দিক থেকে ডাক দিলাম, “শোন কামাল আর দুলাইল্যা, ভুলেও দন্ড বের করে হিসু করতে যেও না। তাহলে তোদের বন্ধুদের মতো একই পরিনতি হবে,” আবারো হি হি করে গা জ্বালানো একটা পৈশাচিক হাসি দিলাম। এখনো ওরা ভয়ে থর থর করে কাঁপছে। ওদের প্রতি কি মায়া করা উচিত?
ধুর, গোল্লায় যাক।
তৃপ্তির একটা ঢেকুর দিলাম। আমার পেট ভরে গেছে। একটু বেশীই খেয়ে ফেলেছি। এখন বুঝতে পারছি, কোন জৈবিক খাবারে আমার ক্ষুধা মিটবে না। ওদের ধর্ষণ যন্ত্র বিচ্ছিন্ন করার সময় ওরা যে যন্ত্রণায় চিৎকার করছিলো, ওটাই আমার খাবার। বাকী দুজন ধর্ষক ভয়ে কাঁপছিল, ওটা ছিল চাটনি।
আগামী তিন দিন কিছু না খেলেও চলবে। এর পর প্রথমে দুলালের যন্ত্র বিসর্যন করবো এই নাইফটা দিয়ে। একদিন পর কামালেরটা। আমি আবার সিরিয়াল মেইনটেইন করতে পছন্দ করি। সিরিয়াস বলে একটা তকমা পেয়েছিলাম, এই জীবনেও তার মায়া ছাড়তে পারলাম না।
আফসোছ।
“কিন্তু ভাবছেন, ওরা চারজন শেষ হয়ে গেলে আমি খাবার পাব কই?”
চিন্তার কারন নেই, গোপনে প্রকাশ্যে অনেক ধর্ষক ঘুরে বেড়াচ্ছে চারপাশে। সংখ্যায় কত? হাজার, লক্ষ নাকী কোটি? সব হায়েনার দল, সুযোগ পেলেই নষ্ট করে দেয় একটি নারীর সুন্দর জীবন।
এখন তোদের পালা। সময় এসেছে মূল্য বুঝিয়ে দেয়ার।
“হ্যা তুইই বলছি, ঠিকই শুনেছিস।”
নরকের কীট, তোরাতো এই “তুই” এরও যোগ্য নস। আর সে তোরা যে বয়সেরই হয়ে থাকিস না কেনো, তোদের এর থেকে খারাপ কিছু থাকলে সেভাবেই সম্মোধন করতাম। তোরা মানুষ সমাজের কলংক।
একে একে শেষ করে দিবো সব ধর্ষকদের। বিনাশ করে দিবো, ধর্ষকের ভিতরে লুকিয়ে থাকা পিশাচকে। সারাটা জীবন অনুশোচনা করেও মুক্তি নেই, মূল্য হবে পৈশাচিকতার। সৌভাগ্য হচ্ছে, বীর্য স্থলনের জন্য কামুক কুকুরের ন্যায় রাস্তায় ঘুরেতে হবে না আর।
যৌবনের জ্বালার চিরদিনের মুক্তি।
অতএব, সাধু সাবধান।
আমি আসছি।
(সমাপ্ত)

No comments:
Post a Comment
আপনার মতামত প্রদান করুন....