গায়ের ঘামের কোপ্তা
রানা জামান
তিন বছরের শিশু রাবিনার হাসি-ই জমিরের শক্তি ও সাহস। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম শেষে বাড়ি এসে রাবিনার শিশু-হাতের স্পর্শ ও নিস্পাপ হাসি মুছে দেয় ওর সকল ধকল। সারাদিন ভ্যান টেনে শাকসব্জি বিক্রি করা অনেক পরিশ্রমের না হলেও বেশ ধকলের। কোনোদিন এক ভ্যান শাকসব্জি বিকেলের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়; কোনোদিন রাত আটটা পর্যন্তও থেকে যায় কিছু-ঐ থেকে যাওয়া শাকসব্জি ঐ রাতের জন্য রান্না করা হয়।
গুড়ো মাছের সাথে হরেক পদের সব্জির সালুন অনেক মজার হয়ে থাকে। কম পরিমাণ মশলায় জুলিয়ার হাতের রান্না অনেক মজাই লাগে। মেয়েটাও ওদের সাথে গাপুসগুপুস খেয়ে ফেলে ওসব।
বরাবরের মতো জমির মিরপুর-১-এর শাকসব্জির আড়তে ফজরের আযানের সাথে সাথে এসে শাকসব্জির পরিমাণ অর্ধেকের কম থামায় বেকুব বনে মনে মনে বললো: আইজ এতো তাড়াতাড়ি শাকসব্জি শেষ হয়া গেলো! এক শাকের আড়তদারকে জিজ্ঞেস করলো, আইজ এতো তাড়াতাড়ি শাকসব্জি শেষ হয়া গেলো মহাজন ভাই?
শাকের মহাজন বললো, আইজ কম আইছে।
কম আইছে ক্যান মহাজন ভাই?
করোনা না ফরোনা নামের একটা ভাইরাস আইছে। এই ভাইরাস নাকি খুব ছোয়াছে। কাছে গেলেই ধইরা ফেলে। আর ধরলে জ্বর গলাব্যথা হইয়া মরা ছাড়া উপায় নাই!
কুনু অষুধ নাই? প্যারাসিটামলে এই জ্বর সারে না?
না রে জমির। দুনিয়া জুইড়া হাজার হাজার মানুষ মরতাছে। তুমি তাড়াতাড়ি শাকসব্জি লইয়া চইলা যাও। পরে পাইতা না।
জমির বরাবরের মতো ভ্যান বোঝাই করে বড় রাস্তায় এসে বেশ অবাক: কোনো বাস চলতে দেখা যাচ্ছে না, দুই একটা রিক্সা ছাড়া কোনো যানবাহনই নেই রাস্তায়। কী ব্যাপার! আচানক হরতাল শুরু হইলো নি? কোন্ পাট্টি ডাকলো হরতাল?
ভালোই হয়েছে। রাস্তা একদম ফাঁকা থাকায় সাঁইসাঁই করে ভ্যান চালিয়ে দশ মিনিটে চলে এলো এলাকার বাজারে। ও রাস্তার পাশেই থাকে ভ্যান নিয়ে। কিন্তু আজ ওর জায়গাসহ পুরো ফুটপাতে বসে গেছে মাছের বাজার। রাস্তায় কিছুদূর পরপর শাদা রঙের চক্র বানানো হয়েছে। একটা পুলিশের ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে। কয়েকজন পুলিশ ক্রেতাদের চক্রে দাঁড়িয়ে বাজার করার নির্দেশ দিচ্ছে। সবার মুখে রংবেরঙের মুখোশ দেখা যাচ্ছে। মুখোশ কেনো?
তাহলে জমির কোথায় দাঁড়াবে ভ্যান নিয়ে আজ? দৃষ্টি প্রসারিত করে দেখতে পেলো মাছ মহালের পরে শাকসব্জির মহাল দেয়া হয়েছে। জমির ভ্যান নিয়ে এগিয়ে গেলো ওদিকে।
নতুন শসকসব্জি মহালে একটা খালি জায়গায় ভ্যান লাগানোর সাথে সাথে এক পুলিশ এসে দাঁড়ালো ওর সামনে। পুলিশ সামনে এসে দাঁড়ানোর মানে জমির ভালো করেই জানে। সে খতি থেকে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট বের করে বাড়িয়ে ধরলো।
পুলিশ কনস্টেবল খানিকটা বিস্মিত হয়ে বললো, এটা কী?
চান্দা ছার! ক্যান? চান্দা কী বাইড়া গেছে অহন?
তোমার মুখে মাস্ক নাই কেনো?
মাস্ক? জমির তাকিয়ে দেখলো পুলিশের মুখেও মুখোশ আছে।
এদিকওদিক তাকিয়ে জমির বললো, সবার মুখেই মুখোশ দেখতাসি। ব্যাপার কী ছার?
করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে হইলে সবাইকে মাস্ক পইরা চলাচল করতে হইবো।
অহনই পিন্দতে হইবো ছার?
আঙ্গুল তুলে উত্তর দিকে দেখিয়ে কনেস্টবল বললো, ঐদিকে মাস্ক বিক্রি হইতাছে। ঘরে বৌ-বাচ্চা থাকলে ওদের লাইগাও একটা কইরা কিনিস। মাস্ক ছাড়া বাইরে আইলেই শাস্তি।
পুলিশ কনেস্টবল জমিরের হাত থেকে পঞ্চাশ টাকার নোটটা ছো মেরে নিয়ে উল্টো দিকে রওয়ানা দিলো। জমির মুচকি হেসে এগিয়ে গেলো মাস্ক কেনার জন্য।
পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে খদ্দের কম এলেও বিক্রি ভালোই হয়েছে। বিকেলেই ভ্যানের সকল শাক-সব্জি বিক্রি হয়ে গেছে। বেশ বেলা আছে। কিন্তু এখন আড়তে গিয়ে শাক-সব্জি এনে বিক্রি করা যাবে না। সে এদিকওদিক তাকিয়ে বেড়াতে বের হলো। ঢুকলো মাছ মহালে। কত মাছ বাজারে, কত রকমের মাছ! বড় মাছ, ছোট মাছ, মাঝারি মাছ। কত ইলিশ মাছ আজ বাজারে। কবে ইলিশ মাছ খেয়েছে বলতে পারবে না। কখনো কি ইলিশ মাছ খেয়েছে এ জীবনে? মনে পড়ছে না, একদম মনে পড়ছে না। মনে মনে আজকের মুনাফা হিসাব করছে জমির। শুনছে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের কোনো ঔষধ নেই। সবাই মিলে একবেলা ইলিশ মাছ খেলে কী এমন ক্ষতি হবে?
জমির খতিতে হাত দিয়ে আস্তেধীরে এগিয়ে গেলো ইলিশ মাছের দিকে। ইলিশ মাছের বেশ কয়েকটা ডালা এসেছে আজ। সে কোন দরদাম না করে দাঁড়ালো গিয়ে খদ্দেরদের পাশে। খদ্দেররা দাম করে ইলিশ মাছ কিনে নিচ্ছে আর ও শুনছে। ইলিশ মাছের দাম সম্পর্কে বেশ ধারনা হয়ে গেলো ওর। যখন একদিন খাবে, তখন বড়টাই খাবে। একবার ঢোক গিলে মনে মনে বললো: আইজ ইলিশ কিনতে খুব ইচ্ছা করতাছে! কিইন্যা ফেলি যা থাকে কপালে!
বাজারের বড় ইলিশ মাছটা কিনে ভ্যানের হাতলে ঝুলিয়ে ফিরে এলো ডেরায়।
ডেরা বলতে রূপনগর ওয়াসার ময়লা নিস্কাশন খালের উপর বাঁশের মাচার বস্তি। খালটা ময়লা জমে বদ্ধ হয়ে যাওয়ায় সর্বক্ষণ দুর্গন্ধ। এই ভয়ানক দুর্গন্ধ গা-সওয়া হয়ে গেছে ওখান যারা বসবাস করে ওদের।
জমির ওর ঝুপড়ির সামনে এসে ভ্যান থেকে নেমে ঝুপড়ির ভেতরে রাবিনার খিলখিল হাসি শুনে বেশ অবাক হলো। জুলিয়া আজ এতো সকালে চলে আসছে? অসুস্থ হয়ে গেছে নাকি? উদ্বিগ্ন হয়ে জমির ইলিশ মাছটা নিয়ে ঢুকলো ঝুপড়ির ভেতরে। জুলিয়া রাবিনাকে বুকে চড়িয়ে খেলা করছে।
জমির ইলিশ মাছটা দেখিয়ে বললো, তোমার কি অসুখ করছে নাকি রাবিনার মা?
জমির ইলিশ মাছটা একটা থালার উপর রেখে রাবিনাকে কোলে তুলে গালে কপালে চুমু দিতে লাগলো। শিশু রাবিনাও বাবাকে পেয়ে অনেক পুলকিত। ও বাবার গলা জড়িয়ে ধরে আদর নিচ্ছে খিলখিল হেসে।
জুলিয়া শোয়া থেকে উঠে বললো, করোনা না কী জানি আইছে দেশে। কাউরে ধরলে আর বাঁচে না। বিশ্বে নাকি অনেক লোক মরতাছে। হের লাইগ্যা গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ কইরা দিছে।
জমির জুলিয়ার পাশে বিছানায় বসে বললো, ঠিক কথা। বাইরে গেলে মাস্ক পইরা যাইতে হইবো। আমি আইজ সারাদিন মাস্ক পিন্দা বেচাবিক্রি করছি। তোমার ও মাইয়াডার লাইগাও দুইটা মাস্ক কিনছি।
প্যান্টের পকেট থেকে দুটো মাস্ক বের করে জুলিয়ার হাতে দিলো। জুলিয়া একটা নিজে পরে আরেকটা শিশু রাবিনাকে পরাতে পরাতে বললো, এতো বড় ইলিশ মাছ কিন্যা আনলা। ব্যাপার কী? আইজ কি বেশি লাভ হইছে?
জমির মুচকি হেসে বললো, হুনলাম করোনায় যারে ধরে, সে আর বাঁচে না। জীবনে ইলিশ মাছ খাইছি কিনা কইতে পারুম না। তাই বাজারের বড় ইলিশটা কিন্যা নিয়া আইছি।
জুলিয়া চৌকির নিচের একটা পোটলা দেখিয়ে বললো, আসার সময় লাইনে খাড়াইছিলাম। একটা টেরাক থাইকা রিলিফ দিতাছিলো, নিয়া আইছি।
কী আছে এই পোটলায়?
চাউল আছে, ডাউল আছে আর এক বোতল তেল।
জমির জুলিয়ার কাছে এসে কাঁধে হাত রেখে বললো, রাবিনার মা, আল্লায় আমাদের মেলা দিছে। আমি কামাই করতে পারি। আরো বেশি কামাই করুম। আমাদের অহন রিলিফের দরকার নাই। ল্যাংড়া সরুপা খালাকে দিয়া দিও।
কী কও! ল্যাংড়া খালা তোমার চাইতে অনেক ধনী! ভিক্ষা কইরা অনেক টাকা কামায়!
যতই কামাক তবুও হে ভিক্ষুক।
ঠিকাছে। আমি কী করুম? তোমার ঘাড়ে বইসা বইসা খামু?
না। তুমি আমার সাথে থাকবা। তাইলে দুই গুণ বেচাবিক্রি হইবো।
তা হইলে আরো ভালাই হইবো। এতো বড় ইলিশ আনতে গেলা ক্যান ছোট দেইখা আনলেই হইতো।
আর কবে ইলিশ আনতে পারুম জানি না। তাই বড়ডাই আনছি।
জুলিয়া বললো, বিয়ার আগে বাবায় মাঝে মইধ্যে জাটকা আনতো। বিয়ার পরে তুমি আনো নাই, খাইও নাই।
জমির বললো, দুই টুকরা ভাজি কইরো। ভাজা ইলিশ খুউব স্বাদের।
কোপ্তা করুম?
ইলিশের কোপ্তা? নাম শুনছি; কুনুদিন খাই নাই। তুমি করতে পারবা?
কুনু দিন করি নাই, তয় হুনছি কিভাবে করতে হয়। মাছ সিদ্ধ কইরা কাঁটা ফালায়া দিতে হয়। তারপর পিয়াজ মরিচ দিয়া ভর্তা মতো কইরা তেলে ভাজতে হয়।
বাহ! তোমার কথা শুইনা অহনই আমার জিব্বায় পানি আয়া পড়ছে!
জমির ইলিশ মাছটার দিকে তাকিয়ে ঢোক গিললো একবার।

No comments:
Post a Comment
আপনার মতামত প্রদান করুন....