মোহাম্মদ আতিকুল ইসলাম
প্রথম রাতের ঘটনা
পুরো ফ্ল্যাটে আমি একা। রাতটা যতোই গভীর হচ্ছে, নিঃসঙ্গতাও পেয়ে বসছে আমাকে। বৌ বাসায় নেই। ভাবলাম, করোনার মধ্যে একা ব্যচেলর লাইফটা একটু এনজয় করি। কিন্তু সে আশার গুড়ে বালি। প্রতি রাতেই শুরু হয়েছে উনাদের অত্যাচার। কিছুক্ষণ আগেও উচু ভলিয়ুমে টিভি ছেড়ে রেখেছিলাম। টিভি দেখার জন্য না, টিভির শব্দ শুনলে মনে হয় আশে পাশে কেউ আছে। তবে কিছুক্ষণ পর বিরক্তিকর অনুষ্ঠানের প্যানপ্যানানির কারণে টিভি বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু ঘুম আসছে না, অদ্ভূত এক অস্থিরতা পেয়ে বসেছে আমাকে। কিছুক্ষণ পর অকারণেই ভয় পেতে শুরু করলাম। রাতের সাথে পাল্লা দিয়ে ভয়টা বেড়েই চলছে। এটাচড বাথরুম থেকে টপ টপ করে পানি পরার শব্দ হচ্ছে। প্রথমে ভেবেছিলাম পানির ট্যাপের শব্দ, পাত্তা দিতে চাইনি । কিন্তু ভুলটা ভাঙ্গে হাসির শব্দ শুনে। না মানুষের হাসি না, ফ্যাচফ্যাচে কন্ঠের হাসি। মনে হচ্ছে শক্ত দুটো বাঁশ দিয়ে গলা চেপে ধরে রাখা হয়েছে, তবুও হেসে যাচ্ছে। এতো বিশ্রী হাসি জীবনে শুনিনি। রুমের ভিতরের বাতাসটা মনে হচ্ছে হঠাৎই ভারী হতে শুরু করেছে। ভ্যাবসা গরমে ঘামতে শুরু করি, যদিও মাথার উপরে ফুল স্পীডে ফ্যান ঘুরে চলছে। কিন্তু তবুও কাজ হচ্ছে না।
ভয় কাটাতে জানালা দিয়ে সামনের বিল্ডিংয়ের দিকে তাকাতেই দেখি পাঁচ তলার ফ্ল্যাটে একটি মেয়ে নাচছে। এখন গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে, এই আনন্দেই হয়তোবা অন্ধকারে নিজের নাচটা ঝালাই করে নিচ্ছে বারান্দায় এসে। লোডশেডিং, রাতটাও বেশ হয়েছে, হয়তো এই সুযোগটাই নিচ্ছে। বৌ থাকলে তো আর অন্য ফ্ল্যাটের দিকে তাকানো যায় না। আমার বৌয়ের যে রাগ, অন্য ফ্ল্যাটের দিকে তাকালেই চোখ গেলে দিবে সন্দেহ নেই, আর যুবতী মেয়ে হলে তো কথাই নেই। যে কারণে জানা হয়নি, দিনের বেলায় কখনো বারান্দায় এসে নৃত্য চর্চা করে কী না? বলতে দ্বিধা নেই, চেহারা বোঝা না গেলেও, ফিগারটা জোশ, তা আমি এখান থেকে দিব্যি বুঝতে পারছি, মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকি। বিপত্তিটা ঘটে কিছুক্ষণ পর, যখন দেখি মেয়েটি বারান্দা থেকে বের হয়ে এসে শূন্য চলে এসেছে। তার জ্বলজ্বলে চোখ, লাচচে চোখের মাঝে নীলাভ চোখের মনি, লালচে ঠোঁট, লম্বাটে নাক। কিন্তু সেখানে কোন ফুটো নেই। কান দুটি অস্বাভিক রকমের বড়, অনেকটা পিড়ামিডের মতো। ফ্যাকাসে কুঁচকানো গাল এবং জটা ধরা চুল। বুঝতে বাকী থাকে না, এরা পার্থিব জগতের কেউ নয়। হয়তো বা অশরী আত্মা বা ভুত প্রেত কিছু একটা। আমি জানালার পর্দাটা টেনে দিয়ে বিছানায় ফিরে আসি। ভয়টা আর এক প্রস্ত বেড়েই গেলো। তাই প্রচন্ড বাথরুম পেলেও, তা উপেক্ষা করে ঘুমানোর চেষ্টা করি। মনে পরে যায়, কিছুক্ষণ আগে এটাচড বাথরুম থেকে আসা ফ্যাচফ্যাচে কন্ঠের হাসি।
ঘুমানো চেষ্টা করি। লাভ হয় না, ভয়ে ছটফট করতে থাকি। অস্থিরতা বাড়তেই থাকে, মোবাইল হাতে নেই, কিন্তু মোবাইলে চার্জ নেই।
“তা হয় কী করে?”
অবাক হয়ে যাই, কিছুক্ষণ আগেইতো ৮০% চার্জ ছিলো! ঠিক এ সময় বিদ্যুৎ চলে যায়। শুরু হয় হুটোপটির শব্দ, সেই সাথে ফ্যাচফ্যাচে কন্ঠের হাসি। আমি ভয়ে আরো জড়সড় হয়ে যাই, তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন আমি এই ভয়ের মাঝেও একটা সময় ঘুমিয়ে পরি।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না, বড্ড শীত লাগায় ঘুম ভেঙ্গে যায়। মুষল ধারে বৃষ্টি হচ্ছে। খেয়াল করে দেখি জালালাটা খোলা, সেখান দিয়ে বৃষ্টির ছাট ঘরে আসছে।
“কিন্তু কীভাবে?”
নিজের মনেই প্রশ্ন করি। আমার স্পষ্ট মনে আছে ভয় পেয়ে জানালা ভালো করে বন্ধ করি ; এরপর পর্দাটা টেনে দিয়েই তো বিছানায় এসেছিলাম। অবশ্য ভুলও হতে পারে। আমি বিছানা থেকে নেমে জানালাটা বন্ধ করি। ভয়টা কাজ করছে না এখন। তাই নিজের অজান্তেই সামনের বিল্ডিংটার দিকে তাকাই। ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চমকে আলোকিত হয়ে যায়। আমার চোখ চলে যায় বিল্ডিংটার ছাদে। সেখানে ছাদের রেলিংয়ে এক পা রেখে বৃষ্টিতে লাল শাড়ী পড়া একটি মেয়ে। কোমর পর্যন্ত চুল কালো চুল খোলা, রেলিং এ পা তুলে রাখায় হাটু অবধি দেখা যাচ্ছে তার ফর্সা পা, বলতে আপত্তি নেই, নীচ থেকে দেখছি বিনা বাঁধায় দৃষ্টি চলে যাচ্ছে আরো একটু উপর অবধি, স্পর্ষকাতর অঙ্গের কাছাকাছি। কিন্তু সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই, তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ফ্যাকাসে মুখ, অদ্ভূত নীলাভ চোখ, টকটকে লাল ঠোঁট, সেখান থেকে গড়িয়ে পড়ছে টকটকে তাজা রক্ত। মুখে রয়েছে এক পৈশাচিক হাসি গলে বিকশিত হয়েছে সুচালো দাঁত। এবার নজর যায় হাদের আঙ্গুলের দিকে। প্রতিটি আঙ্গুলে রয়েছে কুঁচকঁচে কালী দীঘল কালো সুচালো নখ। আমার চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে আছে, কিন্তু আমি চোখ ফিরাতে পারছি না, কিছু একটা আছে তার মাঝে, আদ্ভূত এক মায়া বা অন্যকিছু। আমি সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে আছি। সে এবার ঘাড়টা কাত করে ঠোঁটের দুপাশে দু আঙ্গুল নিয়ে কিছু একটা ইঙ্গিত করে এক অট্ট হাসি দিয়ে উঠলো। হাসির দমকে কেঁপে উঠছে তার সমস্ত শরীর। ঠিক তখন মসজিদ থেকে আযানের শব্দ শুনতে পাই। তখনই ভোজবাজির মতো মিলেয়ে যায় সেই মেয়েটি।
আমি তাকিয়ে থাকি, আসলেই কি কেউ ছিলো ওখানে?
দ্বিতীয় রাতের ঘটনা
Morning shows the day বলে ইংরেজীতে একটা বহুল প্রচলিত কথা আছে। প্রথম রাতের ঘটনায় বুঝতে বাকী থাকে না, আমার ব্যচেলর লাইফের মজা শেষ। বৌয়ের অনুপস্থিতিতে তিনারা জ্বালাবেন। তবুও পরের দিন সকালে খুব ভালো করে বাথরুম ফিটিংসগুলি পরীক্ষা করেছি, বেশ ভালো আছে। সেখানে টিপ টিপ করে পানি পড়ার কোন লক্ষণ নেই। চারপাশে ভালোমতো খেয়াল করার চেষ্টা করি, অদ্ভূত শব্দ সৃষ্টি করতে পারে এমন কিছু আছে কী না? নাহ সেরকম কিছু চোখে পরেনি। সামনের দালানের পাঁচ তলার ফ্ল্যাটের দিকিয়ে তাকিয়ে মনে হলো সেখানে হয়তো কেউ থাকে না। এজন্য মিসির আলী হবার প্রয়োজন নেই, অন্যান্য ফ্ল্যাটের বারান্দায় কাপড় শুকাতে দেখলেও ওখানে সেরকমটা দেখিনি। জানালার দিকে তাকিয়ে মাকড়সার জঙ্গল দেখতে পেলাম। এছাড়া জানালায় পর্দা নেই; এমনকি ভিতরে কোন আসবাপ পত্র নেই। অবশ্য ওই বিল্ডিংয়ের দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলেই তথ্য পাওয়া যাবে। কিন্তু করোনার কারণে বাসা থেকে বের হওয়া হয় না। তবে অজানা কারণে এই ভুতুরে গল্পটা এখনো বৌকে এখনো বলিনি, বেচারী অহেতুক ভয় পাক সেটা চাচ্ছি না। এমনিতেই ভুতের ভয়ে সদা তটস্ত থাকে। মাঝে মঝে মনে হয় নিজের ছায়া দেখলেও ভয় পায় বেচারী।
দ্বিতীয় রাতে আমি বেনামী ফেসবুক আইডি থেকে একটা ভয়ংকর একটা ছবি পেয়ে গ্রুপে আপলোড করেছিলাম। মনে হয়নি কথাটা কেউ বিশ্বাস করেছে। প্রায় ৪১% পোস্টটিতে লাইক দিয়েছে, হেসেছে ৩৬%, অবাক হয়েছে ২০%, লাভ রিয়্যাকশন দিয়েছে ২% এবং মাত্র ১% স্যাড হয়েছে। বোঝাই যায় কেউ কথাটা বিশ্বাস করতে চায় নি। অবশ্য দোষটা আমার, মার্ক জুকারবার্গের ফেসবুক নিয়ে হালকা রসিকতা করা ঠিক হয়নি। তাই ভৌতিক আইডির কথা বিশ্বাস করেননি, ধরেই নিতে পারি। বলা হয়ে থাকে অর্ধ সত্য মিথ্যার চেয়েও ভয়ংকর।
সত্যি বলতে ছবিটা দেখে আমি বুঝতে পারিনি কী বোঝাতে চেয়েছে।
“এটা কি কোন এলিয়েনের ছবি?”
যে আশ্রয়িতার শরীর ভেদ করে বের হয়ে আসছে। যেখানে দ্বিখন্ডিত একটা মেয়ের মুখ ও মাথা ভেদ করে বের হয়েছে আরো একটি মেয়ে। প্রথম মেয়েটির ঠোঁট, চোখ এবং চুলযুক্ত খন্ডিত মাথা দিয়ে বের হয়ে এসেছে দ্বিতীয় মেয়েটির লম্বা তীক্ষ্ণ নখযুক্ত আঙ্গুল এবং মাথা ব্যবচ্ছিত হয়ে বের হয়েছে দ্বিতীয় মেয়েটির মুখমন্ডল। অবশ্য দ্বিতীয় মেয়েটির মাথায় কোন চুল নেই। মাথার রংটা গালের মতোই কিন্ত তা বড্ড এবরো খেবরো। আর মাথার শিড়াগুলি বিশ্রী ভাবে ফুলে কালচে নীল হয়ে রয়েছে, গোলাপির পাপড়ির মতো পাতলা লালচে কমলা ঠোঁট আর উন্নত নাসিকা; যার মাথাটা রক্তাভ।
কিন্তু পরক্ষণেই ভাবি এটা হয়তো কোন নাগীন। এর চোখগুলি সাপের মতো। কুচকুচে কালো চোখের মনিকে ঘিরে রয়েছে হলদেটে অংশ; একই সাথে মাথার দৃশ্যমান ফুলে উঠে শিরাগুলি তেমনটা মনে হয়েছিলো। কিন্তু সিধান্ত দ্রুতই বাতিল করে দেই। কারণ তেমনটা বোঝাতে চাইলে সাপের মতো জিহ্বা বের হচ্ছে এটা থাকতো ছবিতে। তো কি আর করা শেষ ভরসা, গুললিং করা। প্রায় আধা ঘন্টা চেষ্টা করে একটা ডার্ক সাইটে গিয়ে ছবিটি পাই। 'Depression'' by Tattooed Theory, আমি চমৎকৃত হই মূল ভাবনা বুঝতে পেরে। বলা হয়ে থাকে, হতাশা অনেকটা নব জন্ম। সময় নিজেকে ভেঙ্গে নতুন করে সৃষ্টি করা। এটা হচ্ছে এক ধরনের রুপান্তর, নব সৃষ্ট মানব, নতুন ব্যক্তিত্ত্ব এবং পরিবর্তন।
“কিন্তু যদি সেই হতাশাকে ওভারকাম করতে না পারি, তাহলে?”
জ্ঞানী কথা বাদ দেই। দ্বিতীয় রাতে আমি বাড়ির অন্য সব লাইটগুলি নিভিয়ে কেবল মাত্র মাথার কাছের টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে ঘুমাতে যাই। হাতে কঠিন একটা প্রবন্ধ বই। যতোটা না পড়ার জন্য, তার থেকে বেশী কঠিন লাইনের মাঝে হারিয়ে যাওয়ার আগেই যেনো ঘুমিয়ে যাই, এই উদ্দেশ্যে। কিন্তু ঘুম আসে না। অচেনা এক ভয় জেঁকে বসছে আমায়। দিনে একটা ব্যাখ্যা দিয়ে মনকে প্রবোধ দিতে পারলেও, রাতে কাজ হচ্ছে না।
এই ঘুমানোর চেষ্টা যখন করছি, ঠিক তখনই মনে হলো, দরজার পাশে কিছু একটা আছে। হালকা আলো আঁধারীতে মনে হলো কালো একটা ছাঁয়া সরে গেলো। খুব একটা পাত্তা দিলাম না। ভুল দেখেছি হয়তো বা। আমি পড়ায় মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু লাভ হলো না। এবার দরজাটা একটু নড়ে উঠে,
“কিন্তু তা হয় কী করে?”
বেশ ভারী কাঠের দরজা, এছাড়া বাসার অন্যসব দরজা জানালা বন্ধ। সুতরাং প্রচন্ড বাতাসে নড়ে উঠবে এমনতো না। এবার আস্তে আস্তে দরজাটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমি হাক দিয়ে উঠলাম,
“কে?
কে ওখানে?”
কোন শব্দ সারা পেলাম না। কিন্তু মনে হলো দরোজার পাশ দিয়ে দ্রুত সরে গেলো কালো ছায়ামুর্তি। ঠিক তখনই চোখ যায় টেবিলে রাখা মোবাইলের দিকে। কেউ একজন আমার মোবাইলটা আনলক করার চেষ্টা করছে। প্রথমে ভেবেছিলাম ভুল দেখছি, কিন্তু বারংবার আনলক করার চেষ্টা করতে থাকে। স্বপ্ন দৃশ্য কিনা পরীক্ষা করার জন্য মোবাইলের উপর পাউডারের গুড়া ছিটিয়ে দেই। এবার মোবাইলে আঙ্গুলের দাগ দৃশ্যমান হতে থাকে। মানে স্বপ্নদৃশ্য না, আমি জেগেই আছি। ভয়কে উপেক্ষা করে আমি যখন বিছানা থেকে নামতে যাবো, ঠিক তখনই মোবাইলে ম্যাসেজ আসার শব্দ পাই। মন্দের ভালোই বলতে হয়। এই গভীর রাতে ম্যাসেঞ্জারে কাউকে চ্যাট করার জন্য পেলে মন্দ হয় না। সময়টা ভালো যাবে আর ভয়টাও কেটে যাবে। অবশ্য ঘরে ঘরে বন্দি থাকতে থাকতে ডিজিটাল মাধ্যমের প্রতি সবারই কেমন যেনো বিতৃষ্ণা চলে এসেছে। তাই কেউ হু হা বলে আর কিছু বলতে চায় না, কপাল। অবশ্য আমি নিজেও একই কাজ করি, খুব দরকার না হলে আজকাল আর চ্যাটিং করা হয় না।
আমি মোবাইলটা হাতে নিয়ে থমকে যাই। এটা সেই 'Depression'' by Tattooed Theory পেইন্টিংয়ের একটা ইমেজ পাই। ছবিটা যথেষ্ট ভয়ংকর। এর থেকে বড় কথা, খেয়াল করে দেখি ম্যাসেজটার সেন্ডারের কোন আইডি নেই, মনে হচ্ছে ভোজবাজির মতো ছবিটি চলে এসেছে ম্যাসেন্জারে। কিন্তু তা হয় কী করে? হয়তো কেউ হ্যাক করেছে। কিম্বা জটিল কোন পোগ্রাম বানিয়ে নিছক মজা নিচ্ছে। তবে আমার আইটি নলেজ অনেকটা জিরো লেভেলের। তাই এই ভাবনার থেকে ভয় কাটাতেই আমি খুব দ্রুত কয়েকটা গ্রুপে পোস্ট দেই। উদ্দেশ্য ভয়টা কাটানো। ঘুরে ঘুরে গ্রুপের সদস্যদের রিয়্যাকশন আর কমেন্টস পড়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখা। কিন্তু ঠিক তখনই মনে পাশে রুম থেকে রিন রিনি চুড়ির আওয়াজ।
“কে কে বলে আমি ডেকে উঠি,”
সর্বান্তকরনে নিজের ভয়টা লুকিয়ে জিজ্ঞেস করি।
লাভ হয় না। এবার কিন্নর কন্ঠে একটা হাসি শুনতে পাই, সাথে নুপুরের রিম ঝিম শব্দ। শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের হীম শীতল ধারা নেমে যায়। আমি দুহাতে কান চেপে ধরি। কোন ধরনের শব্দ শুনতে চাইছি না। ঠিক তখনই নাকে এসে ধাক্কা মারবো তীব্র একটা মিষ্টি গন্ধ। উগ্র মিষ্টি এই গন্ধটা খুব পরিচিত মনে হলেও ঠিক এখন মনে করতে পারছি না। আমি আশে পাশে তাকাতে থাকি গন্ধের উৎসের খোঁজে। কখন উঠে হেটে জানালার কাছে চলে এসেছি, ঠিক খেয়াল নেই। নিজের অজান্তেই খুলে ফেলি জানালাটা। ঠিক তখন জানালায় সামনে দাঁড়িয়ে গ্রীলে কেউ বিকট একটা শব্দ করে উঠে। শুধু দেখতে পেলাম কুচকুচে কালো একটা ছায়ামুর্তি আর জ্বলজ্বল্ব একজোড়া চোখ। কিছু বোঝার আগেই জানালা দিয়ে হাত গলিয়ে প্রচন্ড শক্তিতে নিজের দিকে টেনে নেয়। আমার মাথা প্রচন্ডভাবে ধাক্কা খায় জানালার গ্রীলের সাথে।
আমি তলিয়ে যাই জমাট গাড় অন্ধকারে।
তৃতীয় রাতের ঘটনা
আমি দাঁড়িয়ে আছি পুরান ঢাকার সুয়ারী ঘাটে, জিঞ্জিরা যাব। ইচ্ছে করলে বাবু বাজার ব্রীজ দিয়েও যাওয়া যেত। কিন্তু আমাকে এদিক দিয়েই যেতে বলা হয়েছে। ঘাটে অনেকগুলে খেয়া নৌকা বাঁধা আছে। কিছুটা চোখ বোলাতেই পেয়ে গেলাম আমার জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা নৌকাটি। আমি সেদিকে এগিয়ে যাই। বুড়িগঙ্গার কুচকুচে কালো পানি থেকে বিশ্রী একটা গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা মারছে, আমি কোন রকমে সেটা হজম করে নৌকায় উঠে বসি। ভর দুপুর তবুও অদ্ভুত এক আঁধার ঘিরে আছে চারপাশকে, মেঘের আড়ালে সূর্য লুকায়নি। হয়তোবা সূর্যগ্রহণ বা অন্যকিছু, কারণটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। তবে এ নিয়ে মাঝির কোন বিকার আছে বলে মনে হচ্ছে না; নৌকায় উঠে বসতেই দ্রুত ছেড়ে দেয়। যেনবা বড্ড তাড়া। মাঝি দেখতে অনেকটা ছোট খাট, উচ্চতা পাঁচ ফুটেরও কম। মুখ ভর্তি সাদা দাড়ি আর মাথায় এলোমেলো লম্বা চুল। কুচকুচে কালো চোখ, ভালো করে খেয়াল করে দেখি সে চোখে কোন পলক পরছে না, ভাবলেশহীন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তাকে কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ হয় না। খেয়াল করে দেখি নৌকা থকে কিছুটা দূরে দুপাশে পানির মৃদু আলোরন, কিছু একটা অনুসরন করছে। পাঁচ মিনিটেই জিঞ্জিরা ঘাটে পৌঁছে যাই। তাই এ নিয়ে ভাবনার খুব একটা অবকাশ পাই না। নৌকা থেকে নেমে ভাড়া দেয়ার জন্য পকেটে হাত দেয়ার আগেই কালো রঙের একটা চিরকুট হাতে ধরিয়ে দিয়ে ধাতব জমাট এবং অস্বাবিক রকমের শীতল কন্ঠে বলে উঠে,
“ঘাটে একটা রিক্সা দাঁড়িয়ে আছে। এই কাগজটা দেখালেই জায়গামতো আপনাকে জায়গামতো পৌঁছ দিবে,”
তবে কিছু বলার আগেই ভোজবাজির মতো সে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। তবে ঠিকই বুঝতে পারছি কালো রঙের কোন ছায়া পানি থকে উঠে আমাকে ফলো করছে। ভয় তাড়াতে ছায়াটাকে ইগনোর করার চেষ্টা করি।
ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই রিক্সাওয়ালাকে দেখতে পেলাম। তবে এমন অদ্ভূত পোষাকের রিক্সাওয়ালা আমার আগে চোখে পরেনি। রংচটা কালো আলখাল্লার সাথে কালো রঙের লুঙ্গি পরনে। চিমসা লম্বাটে, চোখে যত্ন করে সুরমা দেয়া। গলায় সাদা ঝিনুকের মালা, দেখলেই মনে কু ডাক দেয়। ঠোঁটে ঝুলে রয়েছে অদ্ভূত এক হাসি। কাছে গিয়ে হাতের কাগজটা দেখাতেই ইশারায় রিক্সায় উঠতে বলেই রিক্সা ছেড়ে দেয়। মাঝির মতো এও ভাবলেশহীন, হয়তো অপ্রজনীয় কথা বলার অনুমতি নেই।
কিছুক্ষণ পড়েই তীব্র গতিতে ছুটতে থাকলো রিক্সা, মনে হচ্ছে আমি হুটখোলা কোন জীপে চড়েছি। গতীর তীব্রতায় থর থর করে কাঁপছে রিক্সাটি। থেমে থেমে রিক্সার বেল বাজাচ্ছে, তবে চিরায়ত টুংটাং শব্দের বদলে বেল থেকে পাতিলে চামচের আচড় দিলে যে শব্দ হয় প্রতিবার সেরকম শব্দ বের হচ্ছে। যে শব্দে আমার তীব্র এলার্জি। আমি দুহাতে কান চেপে ধরে রাখি, তবুও রক্ষা পাই না তীক্ষ্ণ ওই শব্দের অত্যাচার থেকে। আমি চিৎকার করে রিক্সাওয়ালাকে বেল বাজাতে নিষেধ করি, কিন্তু আমার গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হয় না। মাথাটা নীচু করে রাস্তার দিকে তাকাই, ঠিক তখন চোখ যায় রিক্সাওয়ালার পায়ের দিকে, মোমের মতো ধপধপে সাদা পা, প্যাডলে চাপ দিয়ে উঠা নামার সাথে সাথে মাঝে মাঝেই লম্বা হয়ে যাচ্ছে সে পা। আমি ভয়ে রাস্তার পাশের মানুষগুলির মুখের দিকে তাকাতে থাকি, অস্বাবিক লম্বাটে মুখ সবার, কুচকুচে কালো চোখ, মনির চারপাশে সাদা অংশটি হলদেটে, কানগুলি পিড়ামিডের মতো খাড়া, নাকের স্থানটি মসৃন ও সমতল, সেখানে দুটি ফুটো। ঠোটগুলি অস্বাভাবিক পাতলা এবং লম্বাটে, রংটা কুচকুচে কালো। বিচিত্র এক ভাষায় তারা কথা বলছে এবং এর থেকেও অবাক করা বিষয়, সবাই এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাচ্ছে। রাস্তায় রিক্সা ছাড়াও যান্ত্রিক বাহন থাকলেও তার আকারগুলি বড্ড বিচিত্র। সব থেকে অবাক করার বিষয় আমার রিক্সার সাথে অন্যকোন বাহন গতিতে কুলিয়ে উঠতে পারছে না, দূর থেকেই রিক্সাকে নির্ঝন্টা চলে যাবার জন্য পথ করে দিচ্ছে। নিজের অজান্তেই আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যায় ভয়ের শীতল ধারা, আমি চোখ বন্ধ করে ফেলি। দীর্ঘ একটা নিঃস্বাস নিয়ে শান্ত থাকার চেষ্টা করি। অস্বাভাবিক এই ঘটনাগুলি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছি; কিন্তু ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছি না। মাথা ঠিকমতো কাজ করছে না যেনো।
কতক্ষণ চোখ বন্ধ করে ছিলাম জানি না। রিক্সার গতি হঠাৎ কমে যাওয়ায় চোখ মেলে তাকাই। দেখতে পাই বেশ বড় একটা দিঘির পাশ দিয়ে রিক্সাটি যাচ্ছে এখন। দিঘিটির কাকচক্ষু জল, সব থেকে অবাক করার বিষয় দিঘির চার পাশটা বাঁধানো, এর এক পাশেই একটা মসজিদ। মসজিদের পাশেই চাপা গলি, সেই গলি দিয়ে রিক্সাটা ঢুকে গেলো। তবে গলিতে রিক্সা ঢোকার আগেই রিক্সাওয়াল আমাকে চুপ করে থাকার জন্য ইশারা করল। জানিনা মসজিদের কারণে এই বাড়তি সতর্কতা কীনা? এই গলিটা ভয়ংকর চাপা, কোনমতে একটা রিকশা ঢুকতে পারে। চাপা গলির সাথে লাগোয়া ঘরগুলিকে মনে হচ্ছে জীবন্ত, গলিতে রিক্সা ঢোকায় যেনো বিরক্ত চোখে তাকাচ্ছে। এই চাপা গলি দিয়ে রিক্সা আরো মিনিট পাঁচেক চলার পর থেমে গেলো, কারণ সামনের গলি দিয়ে রিক্সা যাওয়া সম্ভব না। ভর দুপুরেও গাড় অন্ধকার, দালানগুলি পরস্পরের গায়ে গা লাগিয়ে দাড়িয়ে আছে। অদ্ভূত এক সুনশান নিরবতা চারদিকে।
রিক্সাওয়ালা আমাকে নামিয়ে দিয়ে ফ্যাস্ফ্যাসে গলায় বলল, “বাকী পথটা নিয়ে যাবে তুরতাক। তাকে আপনার হাতের কাগজটি দেখালেই হবে,” কিছু বোঝার আগেই এই কথা বলে দ্রুত প্রস্থান করে রিক্সাওয়ালা।
রিক্সা থেকে থেকে নেমেই গলির মুখে বেঢপ ভুড়িওয়ালা একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেলো। এর পড়নেও কালো রঙের আলখাল্লা। বুঝতে বাকী রইল না এই হচ্ছে তুরতাক। ঠিক মানুষ বলা যায় কিনা জানি না, অন্যদের মতো এর নাকের স্থানিটি সমান্তারাল। কাছে আসতেই শুনতে পেলাম, কেউ যেনো মাথার ভিতর থেকে বলছে “আমার পিছে পিছে চলে আসুন। তবে আসে পাশে না তাকানোই আপনার জন্য ভালো।” আমি তুরতাকের দিকে তাকালাম। তার ঠোট নরছে না। সে সরাসরি আমার মাথার ভিতরে ঢুকে কথা বলে যাচ্ছে। অস্বস্থিকর এক অনুভতি, যা আগে কখনো হয়নি।
“কিন্তু আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে?”
“আপনাকে ঝা ঝার কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রথমে আপনার ডেলিভারির অনুমোদন নিতে হবে। আপনি খুব সৌভাগ্যবান, কজনার অর্ঘ্য দেয়ার সৌভাগ্য হয় বলুন?”
“কিন্তু কিসের ডেলিভারি আর কিসেরইবা অর্ঘ্য?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি।
এবার অবাক হলো তারতুক। তবে এর কোন ছাপ দেখা গেলেও না তার চেহারায়। বড্ড ভাবলেশহীন। সে আর কিছু বললো না। নিরবে পথ দেখিয়ে হেটে চলল।
“ঝা ঝা থাকে কোথায়?” আমি আবার জিজ্ঞেস করি।
“সে প্যালেসের হামহাম খানায় আছে,” মাথার ভিতর থেকে কথা বলে উঠে তারতুক। হাসিটা দিতে গিয়েও চেপে রাখি। বলা যায় না হয়তো আমার মনের কথাও পড়তে পারছে তুরতাক। এর পর খুব একটা কথা হয় না। একটা চাপা গলি দিয়ে ভঙ্গুর পরিত্যক্ত ভবনের সামনে দাঁড়াই।
“এই হামহাম খানায় গোসল করছে?” আমার এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার কোন আগ্রহ দেখায় না তুরতাক।
পরিত্যক্ত একটা ভবন এই হামহাম খানা, হয়তো কোন এক অতীতে প্রচন্ড এক জৌলুস নিয়ে মাথা উচু করে থাকতো। তবে এই জীর্ণ ভবন দেখে সুদুর অতীতের সেই জৌলুস কল্পনা করাও দুঃসাধ্য। এই জীর্ণ ভবনের চারপাশে ঠেস দিয়ে উঠে গেছে কালচে রঙের অন্য ভবনগুলি। বোঝা যায় ভবনের কিছু অংশ দখল করে অধুনা অবৈধ কিছু বিল্ডিং তৈরি হয়েছে। হয়তো আশেপাশের সব ভবনগুলি অবৈধভাবে জায়গা দখল করে তৈরি করা হয়েছে। আমি ভাঙ্গা ভবনটিতে ঢুকতেই হঠাৎই যেনো দৃশ্যপট বদলে যায়। আমি নিজেজে আবিষ্কার করি একটা কসাইয়ের দোকানের সামনে। বুঝতে পারি তুরতাক আমার কাগজ অনুমোদন করে নিয়ে এসেছে। ঝা ঝাকে দেখার ইচ্ছে থাকলেও হয়তো এবার আর দেখা হচ্ছে না। আশেপাশে তারতুককে দেখতে পাচ্ছি না এখন।
কাগজটা এগিয়ে দিতেই একটু অপেক্ষা করতে বলে। রক্তের বিশ্রী গন্ধের সাথে কাচা মাংসের গন্ধ যাচ্ছে। মাথার শুনতে পাই কসাইটি বলছে, “ মাংস তৈরি করে দিতে বলেছে। আপনার সামনেই কেটে মাংস তৈরি করে দিচ্ছি।” বোঝা যায় এও তুরতাকের মতো সরাসরি মস্তিষ্কের সাথে যোগাযোগ করছে।
কিছুক্ষণ পর ফুল দিয়ে সাজানো খুব সুন্দর একটা বেতের ঝুঁড়ি নিয়ে হাজির হয় কসাই। সুন্দর মখমলের কাপড় দিয়ে কিছু একটা ঢেকে রাখা হিয়েছে। যা এখানকার কুৎসিত পরিবেশের সাথে বড্ড বেমানান।
মখমলের কাপড়টি সরাতেই ফুটফুটে একটা মানব শিশুকে দেখতে পাই। কিছু বোঝার আগেই দুপায়ে উচু করে ধরে ধাঁরালো ছুঁড়ি দিয়ে দ্বিখন্ডিত করে ফেলে শিশুটিকে। শিশুটির তাজা রক্ত এসে পরে আমার মুখের উপর। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে আমার। আমি হাসফাস করতে থাকি। নিজের অজান্তেই আতংকে বিভৎস এক চিৎকার দিয়ে উঠি আমি।
চিৎকারের সাথে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়, বুঝতে পারি এতোক্ষণ দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম। ভয়ে সমস্ত শরীর ঘেমে উঠেছে। মুখের উপর আঠালো কিছু একটা লেগে আছে। হালকা আলো প্রবেশ করছে জানালা দিয়ে। ভালো করে তাকাতেই দেখতে পাই আমার বালিশের উপর দুপায়ে ভর দিয়ে বসে আছে নগ্ন এক নারী। লম্বা চুলে ঢাকা তার মুখ। সেই অদৃশ্য মুখ থেকে গড়িয়ে পরছে তাজা রক্ত। ফ্যাকাসে গায়ের রঙ, উৎকট গন্ধ বের হচ্ছে সেই নোংরা শরীর থেকে। হাতের নোংরা লম্বা আঙ্গুলের রয়েছে কুচকুচে কালো ধারালো নখ। সে জ্বলজ্বলে চোখ দিয়ে তাকিয়ে আছে, সেখান থেকে যেনো ঠিকরে আগুন বের হচ্ছে।
পুরুষালি আর ধাতব কন্ঠে বলছে, “দে, দে আমার জিনিসটা দে। দে দে আমার মাংস দে, বাচ্চার মাংস দে, মাংস দে, বাচ্চার মাংস...................”
আমি চিৎকার কওরে সাহায্য পাওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু জিহ্বাটি প্রচন্ড ভারী হয়ে গেছে। আমি নাড়াতে পারছি না। এর বদলে মুখ দিয়ে গোঙ্গানীর মতো একটা শব্দ বের হচ্ছে।
“হি হি…,” সেই ফ্যাসফ্যাসে গলার বিশ্রী হাসি শুনতে পাই।
“কীরে ভয় পেলি, তোর বাচ্চাটাকে আমার চাইই চাই। আমি ওর মাংস খাব। বড্ড ক্ষিদা। কি দিবি না? দে…………”
বুঝতে পারছি ধীরে ধীরে সে আমার কাছে চলে আসছে। তীব্র ফ্যাকাসে শরীর থেকে পঁচা মাংস গুলি যেনো খুলে খুলে পড়ছে। পঁচা লাশের বিভৎস গন্ধে বমি আসছে; সেই বমি মাঝপথে এসে গলার মাঝে আটকে আছে, বের হচ্ছে না। অসহ্য যন্ত্রনা আর আতংক নিয়ে তাকিয়ে আছি। এবার তার হাতদুটি ধীরে চলে আসছে আমার গলার কাছে। তীব্র আতংকে আমার সমস্ত শরীর যেনো প্যারালাইজড হয়ে গেছে। মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না। বড় বড় চোখে আমি তাকিয়ে আছি এই বিভৎস প্রাণী বা জিনিসটার দিকে দিকে। মনে হচ্ছে সময়টা যেন স্থির হয়ে গেছে, ভারী হয়ে আসছে আমার নিঃস্বাস।
পরিশিষ্ট
গত রাতের ঘটনার পর ব্যাচেলর লাইফের আনন্দ পুরোটায় ফিকে হয়ে যায়। আমি ল্যাপটপটা বগলদাবা করে শ্বশুর বাড়ির দিকে রওনা হই। এই করনাকালে ডিসটেন্স অফিস করছি, তাই মোবাইলে কয়েক জিবি এক্সট্রা নেট কিনে নিলেই হবে। কথায় বলে শ্বশুর বাড়ি মধুর হাড়ি। অনেক দিন সেদিকে পা দেয়া হয় না, সেই মধুর হাড়ির আস্বাদন পাওয়া যাবে; মন্দ কী। বাড়তি পাওনা, বৌয়ের মন রক্ষাও হবে। তবে সেখানে গিয়ে দেখি, আরও বড় একটি চমক অপেক্ষা করছিলো আমার জন্য; আমাদের অনাগত সন্তানের আগমন বার্তা পাই সেখানে গিয়েই। আমাদের প্রথম সন্তান, উচ্ছসিত হওয়া উচিত, কিন্তু অজানা আশংকায় কেঁপে উঠছে মন। ঠিক বুঝতে পারছি না, বৌকে কী বিগত তিন রাতের ঘটনা বলা উচিত? আচ্ছা, অনাগত সন্তানের সাথে কি তাদের আদৌ সম্পর্ক আছে? ঠিক জানি না, জানতেও ইচ্ছে হচ্ছে না।
(সমাপ্ত)

No comments:
Post a Comment
আপনার মতামত প্রদান করুন....