সাহিত্যের অঙ্গনে ।।পঞ্চম সংখ্যা।। ১০জুন২০২২
ছোটর গল্প
মোহাম্মদ আতিকুল ইসলাম
“বন্ধুর বিপদ হলে কি করতে ? আর সে যদি হয় বিশেষ কেউ ?”
আমিও অরনীর বিপদে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। উচ্ছল হাসি খুশি, চঞ্চল স্বভাবের অরনী- আমার খুব প্রিয় বন্ধু। সে এখন কথা বলছে ওর সাথে। এটা দেখেই আত্মারাম খাঁচা থেকে বের হবার অবস্থা। এখন সুযোগ পেলেই এফোর ওফোড় করে দিবে। বিপদের ঘন্টি বাজতে দেখলাম। আর বিপদটা দেখামাত্রই সতর্ক করার চেষ্টা করি। তারস্বরে চিৎকার করে পথরোধের চেষ্টা করি।বলতে চেয়েছি সামনে বিপদ,
“জলদি পালাও, ও তোমার ক্ষতি করবে।”
মাত্র কয়েক গজ দূরে থেকে তাকে সতর্ক করতে চাচ্ছি, কিন্তু আমার কথা শুনতে পারছে বলে মনে হলো না। আমি ছোটখাটো হতে পারি, কিন্তু আমার চিৎকারে কানে তালা লেগে যাবার কথা।
“বয়ড়া হয়ে গেল নাকি ?” মনে হচ্ছে সাময়িক লোভ সামলাতে সে দিকবিদিক শুন্য হয়ে গেছে। দ্রুত ছুটে যাচ্ছে তার কাছে।
হাতে সময় নেহাতই কম, কিছু একটা করতে হবে, সুপারসনিক বিমানের গতিতে তার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টার সাথে আবারও তাকে সতর্ক করতে চেষ্টা করলাম । এবার তার নাম-অরনী বলে আবারো চিৎকার করলাম। কিন্তু এবারো ফিরে তাকালো না।
আমি আরো কাছে গিয়ে চোখে চোখ রাখলাম, দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোন ভ্রুক্ষেপই নেই।
অভিমান, হয়তো।
না বলেই যে চলে যাওয়া। তবে চলে যাওয়া না বলে আমি বাধ্য হয়েছিলাম বলাটাই শ্রেয়তর। ইচ্ছে থাকলেও আসতে পারি নি। এখনতো এসেছি।
আমি ওকে সতর্ক করতে চাচ্ছি, চাইছি সম্ভাব্য প্রাণ সংহার থেকে তাকে বাঁচাতে। মনে হয় ওর অভিমান কমছেই না।
“নাকী আমাকে খেয়ালই করছে না ?”
হাতে খুব বেশী সময় নেই। ওকে বাঁচাতেই হবে। যা করার খুব দ্রুত করতে হবে। এবারে সমস্ত শক্তি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে সড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করলাম অরনীকে। তবে ফলশ্রুতিতে যা ঘটল তাতে অজানা এক আশংকায় আমার শরীর কেঁপে উঠল আমার। অতি প্রাকৃতিক বিষয়ে বিশ্বাস না থাকলেও নিজেকে অন্যভাবে ভাবতে হচ্ছে।
আমি অরনীর শরীর এফোর ওফোড় করে বেরিয়ে গেলাম। কিন্তু অরনী টের পর্যন্ত পেলো না।
“এর অর্থ কি দাঁড়ায় ?”
সে অরনীকে দুপায়ো শত্রুদের থেকে রক্ষা করেছে। এবার সে শুরু করবে নতুন চাতুরী। এই মূর্তিমান রাক্ষসের হাত থেকে কিভাবে রক্ষা করব ?
কিছুদিন আগের ঘটনা।
সময়টা খারাপ, গ্রীষ্মকাল,খাবারের খুব সংকট। সারাদিন হন্য হয়ে খাবারের খোঁজে ঘুরে বেড়াতে হয়। তবে খাবারের অভাবে সবসময়ই ত্রাহিত্রাহি অবস্থা থাকে। সবাই হন্য হয়ে ছুটে বেড়ায় খাবারের জন্য।
ঠিক এই সময়ে যদি কোন খাবার, জীভে জল আসবেই বইকি। আর অতি সুস্বাদু খাবার হলেতো লাজবাব। মাইরি বলছি অধুনা নাম শোনা যায় তোমাদের মুশকান জুবেরি রন্ধন শিল্পকে সে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। যার খাবারের লোভে দুরদুরান্ত থেকে মানুষজন সুন্দরপুর হাজির হয়। কিম্বা তোমরা দ্রৌপদী নাম শুনেছ, যে কিনা তার রান্না দিয়ে তার পঞ্চস্বামীকে বশ করে রাখত। তারাও এধরনের সুস্বাদু খাবার তৈরি করতে পারে কিনা সন্দেহ।
আমি সম্মোহিত হয়ে খাবারের দিকে ছুটে গেলাম। আশেপাশে কোনকিছুরই খেয়ালই ছিলো না। দিকবিদিকশুন্য হয়ে ছুটে গেলাম, আমি চাইছিলাম যেকোনভাবেই আমাকে পেতে হবে। কতদিন ঠিকমতো খাই না।
এসময়ই দৃশ্যপটে তার আগমন। মিয়াও রাক্ষস। ঘুটঘুটে কালো বিশাল ল্ম্বাটে আকারের।পিছল থিকথিকে শরীর। টকটকে লাল চোখ, লম্বাটে কালো দীর্ঘ দাড়ি। শয়তানটাকে দেখলেই পিলে চমকে যায়। ফরেন মাল, আফ্রিকা থেকে নাকি এই দেশে আগমন।
আমি পালাবো, নাকি খাবারটি খাব ভাবছি। চাচা আপন প্রাণ বলে প্রবাদ আছে। কিন্তু লোভনীয় খাবারটির লোভও ছাড়তে পারছি না।
তবে এবার মিয়াও রাক্ষসটির আচরণে অবাক হবার পালা।
ওই খাবারটি খেয়ো না। বিপদে পড়বে। আমার পুরাই তব্দা হবার পালা। ভুতের মুখে রাম নাম। মতলব কি? আমি অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাই তার দিকে। এতো দেখছি পুরাই ভোল পাল্টে, মিয়াও রাক্ষস, গিরগিটি হয়ে গেছে।
ওইটা কি খাবারটা বাগানোর ধান্দায় আছে? বৈচিত্র কিছু না। এখন সময়টা বড্ড খারাপ।
তীব্রতর খাবার সংকট।
গ্রীষ্মের তীব্রতর খরতাপে আমাদের বাসস্থান সংকুচিত হয়ে গেছে। একই সাথে দুপেয়ো সত্রুদের ক্রমাগত ভুগর্ভ্যস্ত পানি উত্তোলনের ফলে দুরাবস্থা আরো তীব্র হয়েছে।ক্রমবর্ধমান উন্নয়নে নদী, খাল, বিল, পুকুরসহ সকল জলাশয়ের অবস্থা সংকটাপন্ন এবং একইভাবে আমদের অবস্থাও। এসময়ে আমাদের খাবারের খুব সংকট থাকে।
আমার সামনে রয়েছে ভিনগ্রহের খাবার। যা রান্নার সাধ্যি স্বয়ং দ্রৌপদী আছে কি না সন্দেহ।
এখন আমার কি মিয়াও রাক্ষসের কথা শোনা উচিত?আমি পাত্তা দিলাম না। আমি মনে মনে একটা ফন্দি আটলাম। খাবারটি নিয়েই চম্পট দিবো। দ্রুত ঐ গর্তে/গুহায় ঢুকে যেতে পারলেই কেল্লাফতে। ঐ মিয়াও রাক্ষসের সাধ্য নেই কিছু করার। আমি মনে মনে খাবার ও গর্তটার মধ্যকার দুরত্ব হিসেব করে নিলাম। আমার বিশ্বাস ও আমাকে ধরতে পারবে না।
তবে রাক্ষসটা আমার মনের কথা বুঝতে পারল। আমার পথ রোধ করে দাঁড়ায়। এবং তখন সে বলল, “ভাই শোন, আমি তোমার ভালোর জন্যই বলছি। ঐ খাবারটি খেয়ো না।”
“কেন ?” আমি বেশ রাগত স্বরেই বললাম। আসলে আমি কোনভাবেই খাবারটি হারাতে চাচ্ছিলাম না। অগ্নিমূর্তি ধারণ করলাম, নিজের কাছেই মনে হোল আমার চোখ দিয়ে আগুনের হল্কা বের হচ্ছে।
“আহা রেগে যাচ্ছ কেন ?” মিয়াও রাক্ষসটা বলল। সে আরো বলল, “এই যে খাবারের জন্য তুমি হা পিত্যিস করছ। ভাবছ, আমাদের কারো সাদ্ধ্যি নেই এই খাবার তৈরী করার। এমনকি মুশকান জুবেরি বা দ্রৌপদীও তৈরি করতে পারবে না। রান্নাতো দুরের কথা, কখনই চোখে দেখেনি।”
উত্তরে আমি বললাম, “আমি ক্ষুদার্থ। ঐ আহারে আমি আমার উদোরপুর্তি করবো।”
“বোকা, ওটা খাবার না। ওটা একটা ফাঁদ। বাঁকানো একটা আংটায় খাবারটা ঝুলানো আছে, ওটাকে বর্শি বলে।
বর্শিটা দিয়ে একটা ছিপের সাথে বাধা আছে। আর ছিপটা ধরে আছে একটা দু'পায়ের দৈত্য। যদিওবা ওরা নিজেদের সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে দাবী করে থাকে। কিন্তু ওদের শুধু চাইই চাই। সমস্ত পৃথিবীর দখল নিয়ে আছে। কিন্তু তবুও তৃপ্তি নেই। আরো চাই। হেন অকাজ নেই যা তারা করতে পারে না।”
“হুহ”, আমি ঘোত করে একটা শব্দ করলাম। “এসেছে একজন সবজান্তা যুধিষ্ঠির। এতই যদি হবে, তবে এই পুঁচকে আমাকে নিয়ে কিইবা করবে ?”
“প্রথমেই বটি দিয়ে তোমার শরীরের আঁশটে ছাড়াবে। এরপরে কেটে তোমার নারিভুরি বের করবে। কাটাকুটি শেষ হলে লবন দিয়ে আচ্ছামত ধোলাই করে পানিতে পরিষ্কার করবে। পরিষ্কার করা হলে মসলা দিয়ে মেখে, ফুটন্ত চুলার উপর ফ্রাইপ্যানে ফুটন্ত তেলে ভাজবে। এরপর তোমাকে খেয়ে উদরপূর্তি করবে।”
“ফু, আষাঢ়ে গল্প না বলে তুমি তোমার কাজে যাও।” কেন জানি মিয়াও রাক্ষসটাকে এখন আর তেমন তেমন ভয় করছে না। যেনবা দন্ত নখ হীন সর্প। ঠিক যেন বাপুরাম সাপুড়ার সর্প বিশেষ। একটু একটু মায়াও হচ্ছে।আহা বেচারা।
“তুমি বিশ্বাস করলে না। একুটু অপেক্ষা কর। অন্যকাওকে খেতে দাও। দেখ কি হয়। ভয় নেই আমি এই খাবার খাচ্ছি না।”
আমরা অপেক্ষায় রইলাম। কিছুক্ষণ পরে ছোট্ট একটি মাছ যেই না খাবারটি খেতে গেল, চোখের নিমিষেই ভোজবাজীর মতো উপরে উঠে গেল। মনে হোল অদৃশ্য শক্তি দানবীয় শক্তিবলে উপরে তুলে নিল।
আমি মিয়াও রাক্ষসের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করলাম। তাকে ধন্যবাদ দিলাম।
তাকে বললাম, “কিছু মনে কোরো না, তোমরা সুদুর আফ্রিকা থেকে এসেছ বলে কতই না উপহাস করেছি। নাম দিয়েছি মিয়াও রাক্ষস। অযাচিত দুর্নাম ছড়িয়েছি, হেনো জিনিস নেই তোমরা খাও না। রাক্ষস হলেও তোমরা তেলাপোকা থেকে উন্নত কিছু না।”
আমি আরো আবেগে বলে ফেললাম, “বন্ধু তুমি আমার জীবন বাঁচিয়েছ। বলো কি চাই তোমার।”
কুটিল হিংস্র হাসির কেঁপে উঠল মিয়াও রাক্ষসের ঠোটটা। খুশিতে যেন টগবগ করে ফুটছে। নগ্ন লালসা যেন চোখ ঠিকরে বের হয়ে আসতে চাইছে। হা হা করে পৈচাসিক হাসি হেসে বলল, “ওরে বোকা মাছ, আমি এখন তোকে খাব।”
হতভম্ব আমি স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম। নড়াচড়ার শক্তিও রইলো না। ভয়েয় অদ্ভুত শিহরণ আমার মাথা থেকে লেজ অবধি নেমে গেলো। আমি বোকার মতো রাক্ষসের অনেকটা কাছে চলে গেছি। চাইলেও পালাতে পারব না। তাকিয়ে আছি, বিশাল একটা হা আমাকে গ্রাস করতে দ্রুত ধেয়ে আসছে। তীব্র ভয় নিয়ে আমি চোখ বন্ধ করলাম।
কিছুক্ষণ পরে তীব্র শব্দ ও উজ্জ্বল আলোর ঝলকানিতে জ্ঞান হারালাম। কতক্ষন অচেতন ছিলাম আমি জানি না, আমি আদৌ বেঁচে আছি কি না তাও ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। চারপাশের চিরচেনা জলজ পরিবেশ একেবারেই অনুপস্থিত। আরো অনেক পরে আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমি অদ্ভুত কোন কারনে স্থলভাগে চলে এসেছি। এর থেকেও বড় কথা, ধীরে ধীরে খেয়াল করলাম, আমি দুপায়ের রাক্ষস যা মানুষ নামে পরিচিত আমি তাদের কথা বুঝতে পারছি।পড়তে পারছি ওদের লেখাগুলি।
আমি মনে প্রানে চাই আমার গোত্রের সবাইকে সাহায্য করতে। কিন্তু আমি ওদের কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না। এমনকি কিছুতেই বুঝতে পারছিনা আমার এই অস্বাভাবিক পরিবর্তনের মূল কারন।
প্রথমে ভেবেছিলাম, আমি হয়তো ভুত হয়ে বিচরন করছি। হয়তোবা মৎস্য সমাজের প্রথম ভুত। কিন্তু কিছু ঘটনা প্রমাণ করে আমার এই ধারণা ভুল।
আমি মানব সমাজে ঘুরে বেরাই। ওদের জ্ঞান নিয়ে নিজেকে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ করছি। প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছি স্বগোত্রীয়দের সাথে যোগাযোগ করতে। কিন্তু মানুষ আজ অবধি আমাদের সাথে সফলভাবে যোগাযোগ করতে পারে নি। আমদের ভাষাটাও রপ্ত করতে পারেনি।
আমি অপেক্ষায় আছি, একদিন ঠিকই সফল হবো।
ইদানীং আমি গুগলিং করতে শিখছি।এখানে সময় দিচ্ছি। তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের আইডি খুলেছি। তোমরা কি আমার সাথে থাকবে ? আমাকে সাহায্য করবে ?
আমি জানি তোমরা আমাকে নিরাশ করবে না।

No comments:
Post a Comment
আপনার মতামত প্রদান করুন....